সন্ধ্যা হতে আর বেশি দেরি নেই। বশভাঙ্গা কালীমন্দিরের পাশে চায়ের দোকানে জনা দশেক মানুষের চলছে আড্ডা। আড্ডায় চলছে তর্কবিতর্ক। তর্কবিতর্কের বিষয় সংসদ নির্বাচন; কোন মার্কার প্রার্থী জিতবে—ধানের শীষ নাকি দাঁড়িপাল্লা। একজন বললেন, এই আসনে যে–ই জিতুক, তাঁর সংখ্যালঘুদের ভোট লাগবেই। আর একজন বললেন, সে কারণেই তো সংখ্যালঘুদের ভোট নিয়ে চলছে টানাহেঁচড়া। পাশ থেকে আরেকজন বললেন, ‘এ কারণেই তো আমরা ভয়ে আছি।’
এই প্রতিবেদককে দেখে থমকে গেলেন সবাই, একপর্যায়ে ভেঙে গেল আড্ডা। পুলিন চন্দ্র নামের এক ব্যক্তি জানালেন, ‘এখানে সাধারণত নৌকা জেতে। এবার নৌকা নেই। অ্যালা হামার (সনাতনী সম্প্রদায়) ভোট নাকি সবারই নাগে। দিন-রাত ধানের শীষ আর দাঁড়িপাল্লার লোক এইঠে আসছে। ভোট চাহেছে। কাক ভোট দিম, তা নিয়া হামরা বিপদে আছু।’
এলাকাটি পড়েছে ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসনে। এ আসনে বিএনপি থেকে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রার্থী হয়েছেন। আর জামায়াতে ইসলামীর থেকে প্রার্থী হয়েছেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি দেলাওয়ার হোসেন। মাঠে আছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী খাদেমুল ইসলামও।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এ আসনে এবার বিএনপি ও জামায়াতের লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আসনটিতে মোট ভোটার ৫ লাখ ৭ হাজার ২০৩টি। এর মধ্যে সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। তাঁরা আওয়ামী লীগের ‘ভোটব্যাংক’ বলে প্রচার আছে। তাঁদের ভোটেই নির্ধারিত হয় এই আসনের জয়-পরাজয়। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের প্রভাবিত করতে নানা কৌশল নিয়েছে দল দুটি।
বিএনপির প্রার্থী দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর সব কটি নির্বাচনী সভায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের নিরাপত্তার বিষয়টির গুরুত্ব দিয়ে বক্তব্য দেন। ৩১ জানুয়ারি হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আপনাদের সঙ্গে আছি। আপনাদের জন্য যদি প্রথম শহীদ হতে হয়, আমি হব।’
জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনও হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট টানতে খুলি বৈঠক, পথসভায় বক্তব্য দিচ্ছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তাঁর পক্ষে ভোট চেয়ে খুলনা-১ আসনের জামায়াত প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দীর একটি ভিডিও বার্তা ফেসবুকে ছেড়েছেন। সম্প্রতি সদর উপজেলার দেবীপুরে এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে অভয় দিয়ে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, ‘কেউ যদি আপনাদের একটা রে শব্দ বলে, কেউ যদি আপনাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলে, আমি দেলাওয়ার আপনাদের দায়িত্ব নিয়ে গেলাম। আপনাদের পাশে থাকব।’
গতকাল রোববার ও আজ সোমবার এ আসনের যেসব জায়গা সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত, সেখানে এই প্রতিবেদক তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের কথাবার্তায় ভোট–পরবর্তী শঙ্কার বিষয়টি উঠে এসেছে। সদর উপজেলা বেগুনবাড়ি ইউনিয়নের বাশভাঙ্গা গ্রাম। গ্রামটির ভোটকেন্দ্র বাশভাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ওই কেন্দ্র ১ হাজার ১৫১টি ভোট। ভোটারদের ৯৫ শতাংশ সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের। ওই এলাকার একজন হিন্দু সম্প্রদায় ভোটার বললেন, ‘আমরা ভোট দিতে গেলেও দোষ হবে, আবার না গেলেও দোষ হবে। যে দল হারবে, সেই দল ভোটের পরে এসে, “তোরা ভোট দিসনি ক্যান” বলে হামলা করবে কি না, এই ভয়ে আছি।’
আকচা ইউনিয়নের রাংরাই পুকুর শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ২ হাজার ৩০টি ভোট। তাঁদের ৮১ শতাংশ সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের। বিদ্যালয়টির পাশে পালপাড়া। সেখানে কথা হয় একদল নারীর সঙ্গে। তাঁরা ভোট নিয়ে মুখ খুলছিলেন না। একপর্যায়ে তাঁদের একজন বললেন, ‘ভোট দেওয়ার তো ইচ্ছা আছে। কিন্তু ভয়ও পাচ্ছি।’ কেন ভয় পাচ্ছেন, জানতে চাইলে ওই নারী বলেন, ‘এখানে বেশির ভাগই আমাদের সম্প্রদায়ের। আমরা কাকে ভোট দিছি, তা কিন্তু বোঝা যাবে। ভোটে যে হারবে, তাঁরা যদি আসে আমাদের ধরে। আমরা হয়ে গেছি ফুটবলের মতো, যেদিকে যাই সেদিকে লাথি খাই।’
ফাড়াবাড়ি উচ্চবিদ্যালয় ও আকচা আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রের আশপাশের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনও একই শঙ্কার কথা বলেন। পাশের ঢোলারহাট ইউনিয়নে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেখানে একটি গ্রাম ধর্মপুর। ওই গ্রামের ভোট সব সময় ঝলঝলিপুকুর উচ্চবিদ্যালয়ে গ্রহণ করা হয়। ধর্মপুর গ্রামের ভোটার নির্মল বর্মণ জানালেন, তাঁদের কেন্দ্রে ৩ হাজার ২২৬টি ভোট। তাঁদের বেশির ভাগই হিন্দু সম্প্রদায়ের। নিরাপত্তার কথা থেবে অনেকেই ভোট দিতে যেতে চান না। তাঁদের কথা, ভোটের পরে যাতে নির্যাতনের শিকার না হতে হয়, এ জন্য তাঁরা প্রার্থী ও দলের কাছে প্রতিশ্রুতি চান।
জগন্নাথপুর ইউনিয়নের গৌরীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ১ হাজার ২৬৩টি ভোট রয়েছে। ওই কেন্দ্রটি গৌরীপুর উত্তর গ্রামের ভোটারের জন্য। আর ধন্দোগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ধন্দোগাঁও এবং গৌরীপুর দক্ষিণের ভোটাররা ভোট দেন। ওই কেন্দ্রে রয়েছে ৯৩৯টি ভোট। এই দুই কেন্দ্রের অধিকাংশ ভোটারই হিন্দু সম্প্রদায়ের। নির্ভয়ে তাঁরা ভোট দিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে ভাবনায় আছেন। ওই এলাকার ভোটর গোবিন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘নির্বাচনে যে-ই জিতুক আর হারুক, মার খেতে হয় সংখ্যালঘুদের। বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়। এবার যে কী হইবে কহিবা পারছু না।’
জগন্নাথপুর ইউনিয়নের সিঙ্গিয়া, আকচার ফাড়াবাড়ি, শুখানপুকুরীর রাংরোট, মোহাম্মদপুরের রামপুর, বড়গাঁওয়ের ক্ষেনপাড়া, গড়েয়ার গোপালপুরের ভোটাররাও একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।
জেলার হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইন্দ্রনাথ রায় বলেন, ‘নির্বাচন ঘিরে সংখ্যালঘুরা সব সময় শঙ্কার মধ্যে থাকেন। এবারো তাঁদের মধ্যে শঙ্কা কাজ করছে। অবশ্য সবাই সমানভাবে উদ্বিগ্ন নন। রাজনৈতিক নেতারা সক্রিয়ভাবে সংখ্যালঘুদের ভোট চেয়েছেন ও তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমরা ভোট দেব, কিন্তু একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আশা করছি।’
ঠাকুরগাঁও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা বলেন, ভোট নিয়ে আশঙ্কা নেই। নির্বাচনে জনগণ যেন ভীতিমুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে পারেন, সেই জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কঠোর অবস্থানে থাকবেন। শুধু ভোটের দিন নয়, ভোটের পরেও তারা এলাকায় অবস্থান করবেন। ভোটারদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব প্রশাসনের।
জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা চাই হিন্দু ভাই-বোনেরা সবাই শঙ্কা থেকে মুক্ত হয়ে ভোটকেন্দ্রে যাক। ভোটের আগে ও পরে তাঁদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমি নিয়েছি।’ একই ভাষ্য বিএনপির প্রার্থী দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। তিনি বলেন, ‘সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটারদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। এই দেশে তাঁদেরও সমান অধিকার রয়েছে। আমি সব সময় অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করি। সংখ্যালঘুদের ভোটারের ব্যাপারে আশাবাদী। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তায় শুধু সরকার সেনাবাহিনী, প্রশাসন নয়, আমরাও তাঁদের পাশে আছি। তাঁদের নিরাপত্তার দায়িত্বটা আমি নিচ্ছি।’