কীর্তনখোলার তীরে গাছের ছায়ায় ‘আমাদের পাঠশালা’
শান্ত, ধীর ও নিশ্চুপ স্রোতে বয়ে চলেছে কীর্তনখোলা নদী। বরিশাল শহরের ব্যস্ততা, হর্নের শব্দ আর দৈনন্দিন ছুটে চলা জীবনকে পেছনে ফেলে নদীর তীরেই যেন খুলে যায় আরেকটি জগৎ—মুক্তিযোদ্ধা পার্ক।
ওই পার্কের গাছের ছায়ায় মাটির ওপর পাতা মাদুরে বসে আছে ৪০–৫০ জন শিশু। বয়স ৮–১২ বছরের মধ্যে। পোশাকে দারিদ্র্যের ছাপ; কিন্তু সেই ছাপ মুছে দেয় তাদের বই-খাতা ও কলম। যেন অন্ধকার ভেদ করে আলো ছোঁয়ার এক নীরব কিন্তু দৃঢ় সংকল্প নিয়ে বসে আছে তারা।
ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে শিশুরা পড়ছে। প্রতিটি দলে একজন করে শিক্ষক—তাঁরা সবাই নগরের বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থী। তাঁরা ধৈর্য আর মমতায় শেখাচ্ছেন অক্ষর, সংখ্যা আর জীবনের সহজ পাঠ। কোথাও বর্ণমালা, কোথাও যোগ-বিয়োগ, কোথাও আবার গল্পের ভেতর দিয়ে শেখানো হচ্ছে মানবিকতার পাঠ। পাশে টাঙানো একটি ব্যানার ‘আমাদের পাঠশালা’।
‘আমাদের পাঠশালা’ একটি ভ্রাম্যমাণ শিক্ষা উদ্যোগ। এখানে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা নয়; সমান গুরুত্ব পায় নৈতিকতা, আচরণ আর মানবিকতার শিক্ষা। প্রতি শুক্রবার ছুটির দিনে অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে বসে এই পাঠশালা। পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ফর ডিজঅ্যাডভান্টেজড চিলড্রেন (এসএনডিসি) নামে একটি অলাভজনক সামাজিক সংগঠন। সংগঠনটি সুবিধাবঞ্চিত ও ঝরে পড়া শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে কাজ করে। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটির স্বেচ্ছাসেবীরা একটি উন্মুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবকদের বেশির ভাগই বরিশালের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী।
উদ্যোগের শুরুর গল্প বলতে গিয়ে সংগঠনের উদ্যোক্তা তানজিল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এখানে শুধু সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াই না, চেষ্টা করি মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে শিক্ষা ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। নিজেরা যতই ব্যস্ত থাকি, সপ্তাহের একটি দিন আমরা ওদের জন্য রাখি। কারণ, আমরা বিশ্বাস করি শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, সঠিক মূল্যবোধই একটি শিশুর ভবিষ্যৎ তৈরি করে।’
নগরের বরফকল এলাকার শিশু আফিয়া আক্তার এই পাঠশালায় নিয়মিত আসে। তার বাবা দিনমজুর। পড়াশোনার ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হয় না বলে স্কুলে অনিয়মিত। ‘আমাদের পাঠশালা’র সদস্যরা তাদের বাসায় গিয়ে বিনা মূল্যে লেখাপড়া শেখানোর কথা বললে আফিয়ার মা–বাবা রাজি হন। সেই থেকে প্রতি শুক্রবার সকালে পার্কে পড়তে আসে আফিয়া। সে জানায়, ‘এখানে পড়তে আমাদের অনেক ভালো লাগে। পাঠশালার স্যার-ম্যাডামরা আমাদের খুব আদর করেন।’
একই এলাকার ৯ বছরের শিশু আবু বকর সিদ্দিক জানায়, এখানে লেখাপড়া করে সে বাংলা-ইংরেজি অক্ষর, স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ ও ১ থেকে ১০০ পর্যন্ত শিখেছে। এখানকার শিক্ষকেরা পাঠদানের পাশাপাশি ছড়া ও গান শেখান। সে কোনো ক্লাস বাদ দেয় না। তার মতো নগরের লঞ্চঘাট, ভাটারখাল ও অন্য এলাকার অনেকে পড়তে আসে এখানে।
সংগঠনের সহসভাপতি সানজিদা আক্তার বলেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশু, নারীশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করছেন। ‘আমাদের পাঠশালা’ সেই উদ্যোগের একটি অংশ। বরফকল কলোনির শিশুদের পড়ান স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এতে একদিকে স্বেচ্ছাসেবীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, অন্যদিকে শিশুরা শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।
ভাটারখালের সুবর্ণা শীল ও মহুয়া শ্রমিক পরিবারের সন্তান। দিন আনে দিন খাওয়া পরিবারের যেখানে দুই বেলা খাবার জোটানোই দায়, সেখানে পড়াশোনা করানোর ব্যয় মেটানো দুরূহ। এ জন্য তারা স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে। এখন এই পাঠশালায় পড়াশোনা করছে। সুবর্ণা বলে, ‘আমার এখানে পড়তে খুব ভালো লাগে।’
শিশুদের জন্য স্বপ্ন দেখেন স্বেচ্ছাসেবীরাও। তাঁরা চান এই শিশুরা শুধু চাকরির পেছনে ছুটবে না; বরং নিজেরা স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। নিজেরাই গড়ে নেবে নিজেদের ভবিষ্যৎ। পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের জন্য বই, খাতা, কলম, এমনকি ব্যাগের ব্যবস্থাও করা হয় এখানে। ভবিষ্যতে বৃত্তির ব্যবস্থা করা, দেশের আরও প্রান্তিক এলাকায় উদ্যোগ ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়েও তাঁরা ভাবছেন।
স্বেচ্ছাসেবী সুমাইয়া খান বলছিলেন, ‘ওদের মধ্যে শেখার আগ্রহটা অসাধারণ। ক্লাসের সময় হলে অনেক আগে এসে বসে থাকে। আমরা একটু দেরি করলে ওরাই এসে জিজ্ঞেস করে—কেন দেরি হলো। এই কৌতূহলই ওদের এগিয়ে নিয়ে যাবে।’