দোকানটিতে মিষ্টি পরিবেশন করা হয় কলাপাতায় 

শুরুর সময় থেকেই ইন্দ্রমোহন সুইটসে মেলে মাত্র পাঁচ পদের মিষ্টি—রসগোল্লা, পানতুয়া, সন্দেশ, চমচম ও দানাদারছবি : সাদ্দাম হোসেন

অসংখ্য দোকানপাটের ভিড়ে ‘ইন্দ্রমোহন সুইটস’ নামটি যেন সময়কে অতিক্রম করে টিকে থাকা এক স্মৃতি। ১৩৬ বছর আগে গোলপাতার একচালা ঘরে যাত্রা শুরু করা এই মিষ্টির দোকান ধরে রেখেছে নিজস্ব স্বাদ, গন্ধ আর রীতি। শহর বদলেছে, মানুষের জীবনযাপন বদলেছে, বাজারের ধরন পাল্টেছে; কিন্তু ইন্দ্রমোহনের রসগোল্লা, পানতুয়া কিংবা সন্দেশের স্বাদ বদলায়নি।

খুলনার বড় বাজারের হেলাতলা রোডে ‘ইন্দ্রমোহন সুইটস’ এর অবস্থান। কুমিল্লার রসমালাই বা বগুড়ার দইয়ের মতো কোনো ভৌগোলিক পরিচয় নেই এই মিষ্টির সঙ্গে। তবু খুলনার নাম উচ্চারণ হলেই ইন্দ্রমোহন সুইটসের কথা আসে 

দীর্ঘ চার দশক যশোর জেলার অধীনে মহকুমা থাকার পর খুলনা আলাদা জেলার মর্যাদা পায় ১৮৮২ সালে। তখন ধীরে ধীরে বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করে বড় বাজার এলাকা। ভৈরব নদ ছিল শহরের প্রাণ। নদীর ঘাটে হাটবাজারের কোলাহল, পাশেই সাহেবদের তৈরি বড় বাজার—সব মিলিয়ে এলাকাটি হয়ে ওঠে ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু।

খুলনা জেলা সদর হওয়ার কাছাকাছি সময়ে ১৮৯০ সালের দিকে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থানার ধূলসরা গ্রামের তরুণ ইন্দ্রমোহন দে জীবিকার সন্ধানে চলে আসেন খুলনায়। বড় বাজারের হেলাতলা রোডে ভাড়া নেন একটি ছোট গোলপাতার ঘর। সেখানেই শুরু করেন মিষ্টির দোকান। নিজের নামেই দোকানের নাম রাখেন—ইন্দ্রমোহন সুইটস।

এরপর সময় গড়িয়েছে বহু দূর। বড় বাজার কখনো জমজমাট হয়েছে, কখনো বাণিজ্যিক মন্দা দেখেছে। ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়েছে, পাকিস্তান আমল পেরিয়ে জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর কেটে গেছে আরও পাঁচ দশকের বেশি সময়। কিন্তু ইন্দ্রমোহন দে যে মোলায়েম, নির্ভেজাল মিষ্টির যাত্রা শুরু করেছিলেন, তার ধারাবাহিকতা আজও অটুট—প্রায় ১৩৬ বছর পরেও।

পাঁচ পদের ঐতিহ্য

শুরুর সময় থেকেই ইন্দ্রমোহন সুইটসে মেলে মাত্র পাঁচ পদের মিষ্টি—রসগোল্লা, পানতুয়া, সন্দেশ, চমচম ও দানাদার। সংখ্যাটি কখনো বাড়েনি। দোকানটির দর্শন ছিল স্পষ্ট—কম কিন্তু উৎকৃষ্ট।

শুরু থেকেই এখানে কিছু কঠোর নিয়ম চালু ছিল। গরম, টাটকা ও নির্ভেজাল মিষ্টি পাওয়া গেলেও তা খেতে হতো হাত দিয়েই। চাইলেও মিলত না চামচ। পরিবেশনের জন্য ব্যবহার করা হতো কলাপাতা। কেজি দরে নয়, মিষ্টি বিক্রি হতো সংখ্যা হিসেবে। প্রতিদিন যত মিষ্টি তৈরি হতো, ওই দিনই সব বিক্রি হয়ে যেত। বাসি মিষ্টির কোনো জায়গা ছিল না এখানে। শহরের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, শ্রমিক—সব শ্রেণির মানুষই ভিড় করতেন এই দোকানে। ইন্দ্রমোহন সুইটস হয়ে উঠেছিল খুলনার এক সামাজিক মিলনকেন্দ্র।

প্রজন্ম বদলেছে, বদলায়নি রুচির ধারাবাহিকতা

১৯৭২ সালে ৯৩ বছর বয়সে ইন্দ্রমোহন দে মারা যান। এরপর ব্যবসার দায়িত্ব নেন তাঁর ছেলে বেণীমাধব দে। পরবর্তী সময়ে তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে বেণীমাধবের ছেলে সঞ্জয় দে দোকানটি দেখভাল করেন। বর্তমানে দোকানটির দায়িত্বে আছেন দীর্ঘদিনের প্রধান কারিগর কমলচন্দ্র সরকার। তবে দোকানে এখনও শুরুর নায়ক ইন্দ্রমোহনের ছবি টাঙানো আছে।

কমলচন্দ্র সরকারের সঙ্গে ইন্দ্রমোহন সুইটসের সম্পর্ক ৪৫ বছরেরও বেশি সময়ের। তাঁর হাতেই এখনো টিকে আছে ইন্দ্রমোহনের মিষ্টির আসল স্বাদ। দোকানের আরেক কর্মচারী কমল ঘোষ প্রায় একই সময় ধরে এখানে কাজ করছেন। সময় বদলালেও কাজের ধারা বদলায়নি। এখনো প্রতিদিন ভোরে শুরু হয় দুধ গরম করা, ছানা কাটা আর রস জ্বালানোর কাজ।

কমলচন্দ্র বলেন, ‘আমাদের মিষ্টিতে কোনো শর্টকাট নেই। ময়দা বা সুজি মেশানো হয় না। দুধ থেকেই ছানা বানাই। দুধ আর চিনিই মূল কাঁচামাল। তাই রসগোল্লা বা পানতুয়া মুখে দিলেই গলে যায়।’ তিনি জানান, প্রতিদিন ১২০–১৬০ কেজি দুধ লাগে মিষ্টি তৈরিতে। আগে ডুমুরিয়া, তেরখাদা ও ফুলতলা থেকে দুধ আসত। এখন শহরের আশপাশের খামার থেকেই দুধ সংগ্রহ করা হয়।

কলাপাতার পিরিচে বাঙালিয়ানা

ইন্দ্রমোহন সুইটসের মিষ্টি খাওয়ার আলাদা এক রীতি আছে। এখনো দোকানে বসে মিষ্টি খেলে তা পরিবেশন করা হয় কলাপাতার ওপর। অবশ্য রস যাতে গড়িয়ে না যায়, সেজন্য ইদানীং স্টিলের পিরিচের ওপর কলাপাতা বিছিয়ে মিষ্টি পরিবেশন করা হচ্ছে। চামচের ব্যবহার নেই।

কমলচন্দ্র বলেন, বাঙালির অভ্যাস হাত দিয়ে খাওয়া। আমরা সেই ঐতিহ্যটাই ধরে রেখেছি। বাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দাম বাড়ানো নয়, বরং গুণ ও মান ধরে রাখাই ছিল ইন্দ্রমোহনের দর্শন।

এখানেও কেজি দরে মিষ্টি বিক্রি হয় না—সংখ্যাই মূল হিসাব। প্রতিদিন যত মিষ্টি তৈরি হয়, দিনের শেষে সব বিক্রি হয়ে যায়। সন্দেশ ছাড়া অন্য কোনো মিষ্টি পরদিন রাখা হয় না। সন্দেশ বিক্রি হয় কেজি দরে—কেজি ৫০০ টাকা। রসগোল্লা ও পানতুয়ার দাম ২০ টাকা, চমচম ও দানাদার ১০ টাকা করে।

খুলনার বড় বাজারের হেলাতলা রোডে ‘ইন্দ্রমোহন সুইটস’ এর অবস্থান
ছবি : প্রথম আলো

পুরোনো ঠিকানা ছেড়ে নতুন আশ্রয়

প্রায় ১৩০ বছর ধরে দোকানটি ছিল হেলাতলা রোডের ১০ নম্বর বাড়িতে। ছোট চারকোনা নীল টিনের সাইনবোর্ডে সাদা অক্ষরে লেখা ‘ইন্দ্রমোহন সুইটস’ ছিল খুলনার মানুষের চেনা দৃশ্য। ২০১৯ সালের জুনে জমির মালিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেন। দীর্ঘ ১৮ বছরের মামলা শেষে আদালতের রায়ে জায়গা ছাড়তে হয় দে পরিবারকে।

এক মাসের মধ্যেই স্থানীয়দের সহায়তায় দোকানটি সরিয়ে নেওয়া হয় কাছেই—হেলাতলা জামে মসজিদের পাশে ১৭ নম্বর হেলাতলা রোডে।

কমলচন্দ্র বলেন, পুরোনো জায়গাটা ছেড়ে আসা কষ্টের ছিল। কিন্তু দোকানটা টিকিয়ে রাখাই ছিল আসল কথা। এখানেও ক্রেতারা খুঁজে খুঁজে আসে। স্বাদ তো বদলাইনি, তাই মানুষও মুখ ফেরায়নি।

ইন্দ্রমোহন সুইটসের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো—সব মিষ্টি তৈরি হয় দোকানের ভেতরেই, ক্রেতাদের চোখের সামনে। দুধ ফোটানো, ছানা গড়া, গোলা পাকানো—সবকিছুই চলে নিরবচ্ছিন্ন দক্ষতায়। সময় আর রসের হিসাব সামান্য এদিক-ওদিক হলেই স্বাদে ফারাক পড়ে। কমলচন্দ্রের ছেলে আশীষ সরকার এখন বাবার পাশে দাঁড়িয়ে এই কাজ শিখছেন। প্রজন্ম বদলালেও হাতে হাতে চলছে দক্ষতার উত্তরাধিকার।

শহরের স্মৃতি, শহরের গর্ব

ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে উপমহাদেশের অনেক নামী ব্যক্তি ও রাজনীতিবিদ এই দোকানের মিষ্টির স্বাদ নিয়েছেন। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার খুলনা সফরে এসে ইন্দ্রমোহন সুইটসে গরম পানতুয়া খেয়ে প্রশংসা করেন। সেই ছবি প্রকাশ পায় ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের ফেসবুক পাতায়। শহরের বহু পুরোনো পরিবার আজও অতিথি আপ্যায়নে ইন্দ্রমোহন সুইটসের মিষ্টিকেই বেছে নেয়।

নগরের বাগমারা এলাকার বাসিন্দা কিংশুক রায় বলেন, এই মিষ্টির সঙ্গে খুলনা শহরের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের সম্পর্ক। একবার যে খেয়েছে, তার পক্ষে এই স্বাদ ভোলা কঠিন। পানতুয়াটা এতটাই নরম যে মুখে দিলেই গলে যায়।