খানজাহান আলী দিঘির সেই কুমির এখন ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে, কেমন আছে কুমিরটি
বাগেরহাটের খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজারের দিঘি থেকে সরিয়ে নেওয়া মাদি কুমিরটি এখন রয়েছে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে। ১৩ আগস্ট কুমিরটিকে এই সাফারি পার্কে নেওয়া হয়।
ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পার্কে আনার পর থেকেই এখন পর্যন্ত কোনো খাবার গ্রহণ করেনি কুমিরটি। তবে খাবার না খেলেও শারীরিকভাবে কুমিরটি সুস্থ রয়েছে।
গত ১ জুন খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন দিঘিতে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে টেনে নিয়ে যায় ওই কুমির। ওই ঘটনায় শিশুটির মৃত্যু হলে জননিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আসে। পরদিন রাতে কুমিরটিকে দিঘি থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরে ৩ জুন জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বন বিভাগ কুমিরটি খুলনার বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে নিয়ে যায়। সেখানে দুই মাসের বেশি সময় রাখার পর কুমিরটিকে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে পাঠানো হয়।
ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের প্রথম সড়ক ধরে প্রায় এক কিলোমিটার ভেতরে গেলে বাঁ পাশে কুমিরের বেষ্টনী। বেষ্টনীর ওপর দিয়ে দর্শনার্থীদের চলাচলের জন্য একটি সেতু রয়েছে। এর দক্ষিণ পাশে লোনাপানির বেষ্টনী, উত্তর পাশে মিঠাপানির বেষ্টনী। পশ্চিম পাশেও রয়েছে লোনাপানির কুমিরের জন্য বেষ্টনী। উত্তরের মিঠাপানির বেষ্টনীতেই রাখা হয়েছে কুমিরটিকে।
খাবার না খেলেও নতুন পরিবেশের সঙ্গে কুমিরটি ভালোভাবেই মানিয়ে নিচ্ছে। তার চলাফেরা, রোদ পোহানো ও সাঁতার কাটাসহ স্বাভাবিক গতিবিধি দেখা গেছে।মোস্তাফিজুর রহমান, ভেটেরিনারি সার্জন, ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক
সরেজমিনে দেখা যায়, বেষ্টনী থেকে বেশ দূরে দাঁড়িয়েও কুমিরটির দেখা পাওয়া কঠিন। প্রায় ৫০০ ফুট দূরে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কুমিরটির দেখা মেলেনি। তবে তাকে দেখতে দর্শনার্থীদের বেশ আগ্রহ দেখা যায়। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে বেষ্টনীর কাছাকাছি কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।
কুমিরের বেষ্টনীর দায়িত্বে থাকা পার্কের কর্মী মোহাম্মদ মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘পার্কে আনার পরদিন কুমিরটিকে খাবার দেওয়া হয়। তবে সে খায়নি। প্রতি সোমবার পার্কে কুমিরের বেষ্টনীতে খাবার দেওয়া হয়। গতকাল সোমবারও খাবার দেওয়া হয়েছিল, তবে কুমিরটি খাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘পার্কে এখন ১৩টি কুমির রয়েছে। এর মধ্যে লোনাপানিতে রয়েছে আটটি এবং মিঠাপানিতে পাঁচটি ।
ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনজুর আলম বলেন, ‘কুমির বেষ্টনীর কাছে কারও যাওয়ার সুযোগ নেই। পার্কের উপদেষ্টা পরিষদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। শুধু একজন চিকিৎসক ও তাঁর সহকারী সেখানে যেতে পারেন।’ তিনি বলেন, ‘১৩ আগস্ট কুমিরটিকে পার্কে আনার পর আইসোলেট করে রাখা হয়েছে। বর্তমানে মিঠাপানির আলাদা একটি বেষ্টনীতে কুমিরটি রাখা হয়েছে। মাঝেমধ্যে কয়েক মিনিটের জন্য দেখা গেলেও বেশির ভাগ সময় কুমিরটি লুকিয়ে থাকে।’
ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘খাবার না খেলেও নতুন পরিবেশের সঙ্গে কুমিরটি ভালোভাবেই মানিয়ে নিচ্ছে। তার চলাফেরা, রোদ পোহানো ও সাঁতার কাটাসহ স্বাভাবিক গতিবিধি দেখা গেছে।’ তিনি বলেন, ‘কুমিরটির ওজন ওজন ৩০০ থেকে ৩৫০ কেজি হতে পারে। দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ থেকে ৮ ফুট।’
কুমিরের খাবার গ্রহণের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কুমির ঠান্ডা রক্তের প্রাণী। প্রয়োজনে নিজের শরীরে জমে থাকা চর্বি থেকেও শক্তি পায়। একটি কুমির খাবার ছাড়াই তিন থেকে পাঁচ মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
মাজারের দিঘি থেকে উদ্ধারের পর খুলনার বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকার সময়ও খাবার খায়নি কুমিরটি। খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘খাবার না খেলেও কুমিরটি পুরোপুরি সুস্থ ছিল। হয়তো দীর্ঘদিনের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অপরিচিত ও বন্দী পরিবেশে থাকার কারণেই কুমিরটি এখানে খাবার গ্রহণ করেনি।’
ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের কর্মীরা জানান, সাধারণত একটি কুমির সপ্তাহে একবার আড়াই থেকে তিন কেজি খাবার গ্রহণ করে। নতুন আনা কুমিরটি ধীরে ধীরে নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে চেষ্টা করছে। শিগগিরই খাবার গ্রহণসহ স্বাভাবিক আচরণে ফিরে আসবে কুমিরটি।