রংপুরে যুবক হত্যাকাণ্ডের পর হিন্দুদের দোকানপাট ও বাড়িঘরে হামলা, পুলিশ বলছে ‘ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা’

মাছুয়াপাড়া মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আজ শনিবার সকালেছবি: প্রথম আলো

রংপুরে যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় দোকানপাট ও বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল শুক্রবার রাতে এ ঘটনা ঘটে। হামলার শিকার অধিকাংশ দোকানপাট ও বাড়িঘর হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের। ঘটনার পর রাত থেকেই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে তৃতীয় পক্ষ এই ভাঙচুর চালিয়েছে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে রংপুর নগরের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কামাল কাছনা দাসপাড়া (মাছুয়াপাড়া) মোড়ে রাকিব হাসান (২০) নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। রাকিব পাশের বৈরাগী পাড়া এলাকার আবদুস সামাদের ছেলে। স্থানীয়দের ভাষ্য, পাশের তাঁতিপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. মমিন (৪২) মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাঁর সঙ্গে রাকিবের দ্বন্দ্বের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গতকাল সন্ধ্যার পর রাকিবের লাশ রংপুর নগরের নূরপুরে দাফন করা হয়। এরপর রাত ৮টার দিকে ৪০–৫০ জন যুবক লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মাছুয়াপাড়া মোড়ে গিয়ে স্থানীয় দোকানপাট ও বাড়িঘরে হামলা চালায়। এতে অন্তত ২০টি দোকানের শাটার, বারান্দা এবং কমপক্ষে ১০টি বাড়ির গেট, জানালা ও বেড়ার টিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্থানীয় ব্যক্তিদের ভাষ্য, দাসপাড়া বাজারসংলগ্ন এলাকায় শতাধিক হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করেন। দোকানপাটের অধিকাংশও তাঁদের। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অভিযোগ, রাকিব হত্যাকাণ্ড দাসপাড়া বাজার এলাকায় ঘটলেও হত্যাকাণ্ডের পর তারা কেন সাক্ষী দেয়নি—এমন অভিযোগ তুলে এই হামলা চালানো হয়।

আজ শনিবার দুপুরে দাসপাড়া মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, হামলা-ভাঙচুরের শিকার দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর ও দোকানের সামনে হিন্দু সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এবং নিরাপত্তাহীনতার কথা বলছেন। মাছুয়াপাড়া মোড়ে চায়ের দোকান করেন বিনোদিনী দাস। তিনি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘ছেলেগুলো হিড়হিড় করি আসি চোটাচোটি শুরু করল। এক্কেবারে ভাঙচুর। আমাদের গ্রামে অষ্টপ্রহর ছিল। সবাই সেখানে গেছে। গ্রামে কোনো লোক ছিল না। আমার দোকানের ঝাপ ভাঙছে। দরজা ভাঙতে ধরছিল। আমি ঠাসি ধরছি। কোনো শব্দ করি নাই। শব্দ করলে আমাকে চোটাই তো।’

আরেক বাসিন্দা সুর্বনা দাস বলেন, ‘ওরা ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চলে গেছে। ওদের ফেস আমরা দেখতে পাইনি। ওরা সবগুলো দোকান ভাঙছে। আবার মন্দিরের দিকে গেছে। মন্দিরের দানবাক্সে চোট মারছে। হিন্দুদের ঘরে-গেটে বউ-বেটিদের জঘন্য ভাষায় বাজে গালি দিছে।’

হামলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দাসপাড়া বাজারের মুদি দোকানদার আরিফ হাসনাত অভিযোগ করেন, ‘সন্ধ্যার পর থেকে ওরা অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করেছে। কিন্তু পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’ স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, ‘মার্ডার হওয়ার পরে প্রশাসনকে বলা হয়েছিল, আপনারা আমাদের দিকে একটু সুদৃষ্টি রাখবেন, যেন পরবর্তী সময়ে কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হয়। কিন্তু আমরা প্রশাসনের সহযোগিতা তখন পাই নাই। ছেলেপেলে অস্ত্র নিয়ে ঘুরতেছে, তখনো প্রশাসনকে কয়েকবার ফোন দেওয়া হয়েছিল। ৯৯৯-এও ফোন দিছিলাম। কিন্তু ৯৯৯-এ বা ফোন দিয়ে ডিটেইলস বলতে যে সময়টা লাগে, তাতে ওই রকম দুই-চারটা এলাকা তামা করা কোনো ব্যাপার না।’

আজ বেলা ১১টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. মজিদ আলী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘যাঁরা মার্ডার করেছে, তাঁদের শনাক্ত করা হচ্ছে। যাঁরা ভাঙচুর করেছে, তাঁদেরও আমরা শনাক্ত করেছি। গতকাল রাতের ঘটনাস্থলের সিসি টিভির ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা করা হবে।’ পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের বিষয়ে তিনি বলেন, পুলিশকে তথ্য দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে গেছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে সুবিধা নেওয়ার জন্য যাঁরা এটা করেছে, তা তাঁদের নজরে আছে।’

এদিকে রাকিব হাসান হত্যার ঘটনায় আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে তাঁর পরিবার। শুক্রবার রাকিবের বাবা আবদুস সামাদ (৪৪) বাদী হয়ে সাতজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও তিনজনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলায় রংপুর নগরের রবার্টসনগঞ্জ তাঁতিপাড়ার মো. মমিন (৪২), তাঁর স্ত্রী সুইটি বেগম (৩৫), লিটন মিয়া (৩০), লিখন মিয়া (২৮), আবদুর খালেক (৩০), আবদুল মজিদ (৩১) ও হাসান আলীকে (৩২) আসামি করা হয়েছে।

আজ দুপুরে মমিনের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় দোকানদারেরা জানান, ঘটনার পর থেকে পুরো পরিবার পলাতক। ফলে তাঁদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

রাকিবের মা নূর জাহান বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কালকে কে কী করল, না করল, সেগুলো আমাদের ঘাড়ে চাপাতে চাইছে। আমরা তো সন্তানহারা। আমরা তো সন্তানকে মাটি দেওয়া নিয়ে ব্যস্ত। আমরা কেন যাব হিন্দুদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব করতে। হিন্দুদের সঙ্গে আমাদের কী সমস্যা। মমিনের জামাই এটা করেছে, যাতে কেসটা হালকা হয়।’