‘সবাই এখন ভোট নিয়ে ব্যস্ত, কৃষকের কথা শোনার কেউ নাই’

জেমিনি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হলদে হয়ে গেছে বেগুনখেত। ২৮ জানুয়ারি দুপুরে ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

সামনেই পবিত্র রমজান। রমজানে ইফতারে বেগুনির চাহিদা থাকে সব সময়। এই বিবেচনায় দুই একর জমিতে বেগুন চাষ করেন ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার ভেলাতৈড় গ্রামের রনি ইসলাম। কিন্তু গাছ সবুজ হয়ে বেড়ে ওঠার পর হঠাৎ তাঁর বেগুনখেত হলুদ হয়ে গেছে। গাছের পাতা কুঁকড়ে গেছে, বৃদ্ধিও কমে গেছে আর ফলনও তেমন হচ্ছে না। খেতে কীটনাশক প্রয়োগেও কাজ না হওয়ায় এক বিঘা জমিতে বেগুনগাছ রেখে বাকি অংশে ভুট্টার চাষ শুরু করেছেন তিনি। শুধু রনি ইসলাম নন, জেলার প্রায় সব বেগুনখেতেই এখন এমন অবস্থা। এতে কৃষকেরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় তিন হাজারের বেশি চাষি বেগুন চাষ করেন।

গত রবি ও সোমবার ঠাকুরগাঁও সদরের পাটিয়াডাঙ্গী, বালিয়াডাঙ্গীর ভানোর, রানীশংকৈলের নেকমরদ এবং পীরগঞ্জের ভেলাতৈড় গ্রামের বেগুনখেত ঘুরে দেখা গেছে, খেতের পর খেত বেগুনগাছ হলদে হয়ে গেছে। কোনো কোনো খেতের বেগুনে পচন ধরেছে। কৃষি বিভাগ বলছে, বেগুনখেত হলদে হয়ে যাওয়া রোগ পোকার আক্রমণ বা পুষ্টির ঘাটতির লক্ষণ হতে পারে। চাষিরা বলেন, রমজানে বাজার ধরতে অনেকেই বেগুন আবাদ করেছেন। গাছে বেড়ে ওঠার সময় খেতের কিছু গাছের পাতায় হলুদ ও গাঢ় সবুজ ছোপ ছোপ দাগ দেখা দেয়। আক্রান্ত পাতা কুঁকড়ে হলদে হয়ে যায়। কীটনাশক প্রয়োগেও কাজ হচ্ছে না। দ্রুত এ রোগ পুরো খেতে ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্ত গাছের কচি ও বয়স্ক পাতায় হালকা ও গাঢ় সবুজ এবং হলুদ রঙের মোজাইক বা ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়। পাতা সাধারণত বিকৃত হয়ে ভেতরের দিকে কুঁকড়ে যায়। আক্রান্ত গাছটি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক খাটো বা বামনাকৃতির, ফল আকারে ছোট হয় এবং অনেক সময় বিকৃত হয়ে যায়।

পীরগঞ্জ উপজেলার ভেলাতৈড় গ্রাম বেগুন চাষের জন্য বিখ্যাত। এ গ্রামের বেগুনচাষি আবুল হোসেন সাড়ে তিন বিঘা জমিতে বেগুন আবাদ করেছেন। বেগুন চাষ করতে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা। এই খরচ মেটাতে তাঁকে দেড় লাখ টাকা ঋণ নিতে হয়েছে। তাঁর বেগুনখেতও হলদে হয়ে গেছে। খেতের বেগুন কুঁকড়ে পচে যাচ্ছে। খেত রক্ষায় ২৫ হাজার টাকার কীটনাশক ছিটিয়েও কোনো লাভ হয়নি। তিনি বলেন, ‘রমজানে বেশি দামে বিক্রির জন্য বেগুন আবাদ করেছিলাম। কিন্তু খেতের বেগুনগাছ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলনও পাচ্ছি না। এখন ঋণের টাকা পরিশোধ করব কীভাবে, বুঝতে পারছি না।’

একই গ্রামের বেগুনচাষি আনারুল ইসলাম এক বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করছেন। এ পর্যন্ত তাঁর খরচ হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। বাড়ির গরু বিক্রি করে তিনি খরচ জোগান দিয়েছেন। বর্তমানে পুরো খেত হলুদ হয়ে ফলন কমে গেছে। খেতের ফসল নিয়ে এখন তিনি দিশাহারা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, গাছ সুস্থ থাকলে এক সিজনে ৪০ মণ বেগুন পাওয়া যেত। কিন্তু এখন পর্যন্ত পাঁচ মণ বেগুনও পাওয়া যায়নি। তাই বেগুনখেত ফেলে রেখেছেন।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ভানোর গ্রামের চাষি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘ধারদেনা করে আড়াই বিঘা জমিত বেগুন নাগাছু। গাছ দেখিয়া মনে হচ্ছিল, ভালোই লাভ হইবে। অ্যালা বেগুনগাছের পাতা হলুদ হয়ে কোঁকড়া নাগি শুকি যাচে। ওষুধ দিয়াও কাম হওচে না।’

ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া বেগুনগাছ দেখাচ্ছেন কৃষক আবুল হোসেন। ২৯ জানুয়ারি দুপুরে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার ভেলাতৈড় এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

রানীশংকৈল উপজেলার কুমারপুর গ্রামের বেগুনচাষি আবদুল মজিদ এক বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করেছেন। হলদে হয়ে যাওয়া বেগুনখেত পরিচর্যা করছিলেন তিনি। কেমন ফলন পেয়েছেন, জানতে চাইলে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘রোজায় বেশি দাম পাওয়ার জন্য বেগুন আবাদ করার চিন্তা করি। কিন্তু এখন পুঁজিই তোলা যাচ্ছে না। সবাই এখন ভোট নিয়ে ব্যস্ত, কৃষকের কথা শোনার কেউ নাই।’

সদর উপজেলার পাটিয়াডাঙ্গী এলাকার চাষি পরিতোষ রায় বলেন, ‘কৃষকের ফসলের দাম বাড়লে সরকার কত কী করে। ফসলের দাম ধরে দেয়, জরিমানা করে। কিন্তু আমাদের ফসল নষ্ট হলে কেউ খোঁজ নেয় না।’

পীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হাসান বলেন, বেগুনখেত হলদে হয়ে যাওয়া রোগ পোকার আক্রমণ বা পুষ্টির ঘাটতির লক্ষণ হতে পারে। তবে জেলার বেগুনখেতগুলো জেমিনি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এমনটি হয়েছে। এ রোগের আক্রমণে গাছে হলুদ ও গাঢ় সবুজ ছোপ ছোপ পাতা দেখা দেয়। একসময় তা গোটা গাছে ছড়িয়ে পড়ে। গাছের পাতা কুঁকড়ে যায়। কিছু গাছ গোড়াসহ বিবর্ণ হয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ফলন কমে যায়। সাদা মাছি এই ভাইরাসের অন্যতম বাহক। সাধারণত শীতকালে মেঘলা ও কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া এই পোকার বংশবৃদ্ধি ও আক্রমণের প্রধান সময়। এদের দমনে ইমিডাক্লোপ্রিড বা অ্যাসিটামিপ্রিড গ্রুপের কীটনাশক এক মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ছিটাতে হবে। জমিতে কোনো আক্রান্ত গাছ দেখামাত্র তা শিকড়সহ তুলে মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে বা পুড়িয়ে দিতে হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) মো. আলা উদ্দীন শেখ জানান, জেলার প্রায় সব বেগুনখেতেই জেমিনি ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা সরেজমিন পরিদর্শন করে চাষিদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত বেগুনচাষিদের আগামী খরিপ-১ মৌসুমে প্রণোদনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে কিছুটা হলেও চাষিদের ক্ষতি পূরণ করা যায়।