ময়মনসিংহের ১১টি সংসদীয় আসনের সব কটিতে বিএনপি ও পাঁচটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে জামায়াতে ইসলামী। এর মধ্যে আটটিতে বিএনপির ও একটিতে জামায়াতের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁরা জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ১১টি আসন থেকে ১৯ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। এদিন বিএনপির বিদ্রোহী ছয় প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করলেও এখনো মাঠে আছেন আটজন। অন্যদিকে জামায়াতের বিদ্রোহী একজন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। সব মিলিয়ে ১১টি আসনে ৬৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন। আজ বুধবার তাঁদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনে ছয়জন, ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনে সাতজন, ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আসনে পাঁচজন, ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনে নয়জন, ময়মনসিংহ-৫ (মুক্তাগাছা) আসনে পাঁচজন, ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) আসনে পাঁচজন, ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনে ছয়জন, ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনে চারজন, ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল) আসনে ছয়জন, ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনে নয়জন, ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনে পাঁচজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
৮ আসনে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবার ভোটে না থাকায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াত জোটের প্রার্থীদের মধ্যে। তবে দলীয় কোন্দলে আটটি আসনেই বিএনপির চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা।
ময়মনসিংহ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ। এখানে দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সালমান ওমর। নির্বাচনী বিরোধে ১৬ জানুয়ারি এই প্রার্থীর এক কর্মীকে হত্যার ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে এলাকায়।
ময়মনসিংহ-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদার। এ আসনে বিএনপি-দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) শাহ্ শহীদ সারোয়ার স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। ২০২৪ সালে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে দল থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হামলার ঘটনায় হওয়া মামলায় আসামি হয়ে তিনি এখন কারাগারে। কারাগারে থেকেই তিনি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
ময়মনসিংহ-৩ আসনে দলীয় প্রার্থী বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য এম ইকবাল হোসেইন। এখানে মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন গৌরীপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আহাম্মদ তায়েবুর রহমান। মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পর দল থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়।
ময়মনসিংহ-৬ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. আখতারুল আলম। তাঁর বিপক্ষে প্রার্থী হয়েছেন এ আসনের বিএনপি-দলীয় সাবেক এমপি শামসুদ্দিন আহমেদের স্ত্রী আখতার সুলতানা। তিনি উপজেলা মহিলা দলের সাবেক সভাপতি ছিলেন।
ময়মনসিংহ-৭ আসনে দলীয় প্রার্থী দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মো. মাহাবুবুর রহমান। এখানে বিএনপির সাবেক এমপি আবদুল খালেকের ছেলে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আনোয়ার সাদাত স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। আনোয়ারের বিএনপিতে কোনো পদ না থাকলেও স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের একটি অংশ তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন বলে স্থানীয় নেতা-কর্মীরা জানিয়েছেন।
ময়মনসিংহ-৯ আসনে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইয়াসের খান চৌধুরী দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। তাঁর বাবা আনোয়ার হোসেন খান চৌধুরীও এ আসনের সাবেক এমপি ছিলেন। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন ইয়াসের খানের চাচা আসনের সাবেক এমপি খুররম খান চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা খান চৌধুরী। ভাতিজার বিরুদ্ধে চাচির প্রার্থী হওয়া নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা চলছে।
ময়মনসিংহ-১০ আসনে দলীয় প্রার্থী দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান। তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ার পর বঞ্চিত প্রার্থীদের একটি অংশ অসন্তোষ প্রকাশ করে। এ আসনে শেষ সময়ে বিএনপির তিনজন নেতা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করলেও দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান ভোটের মাঠে আছেন।
ময়মনসিংহ-১১ আসনে ভালুকা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফখর উদ্দিন আহমেদ দলীয় প্রার্থী। তাঁর বিপক্ষে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম।
বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মো. রোকনুজ্জামান সরকার বলেন, ময়মনসিংহ-৬ ও ৭ আসনে যে দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, দলে তাঁদের প্রাথমিক সদস্যপদও নেই। ময়মনসিংহ-১০ ও ১১ আসনের দুজন দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হয়েছেন। তাঁদের বিষয়ে দল সিদ্ধান্ত নেবে।
তবে যাঁরা বিএনপির সাবেক এমপি ছিলেন বা পরিবারের সদস্য কিংবা দল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন, তাঁদেরও বিদ্রোহী হিসেবে দেখছেন উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এনায়েত উল্লাহ। তিনি বলেন, এসব প্রার্থী ভোটের মাঠে থাকায় দলীয় প্রার্থীদের ওপর কিছুটা প্রভাব পড়বে। দলের চেয়ারম্যান অনেককে ডেকে প্রত্যাহার করতে বললেও প্রত্যাহার করেননি। এখন দলের যেসব পদধারী নেতা-কর্মী ওই প্রার্থীদের হয়ে কাজ করবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জামায়াতের ‘বিদ্রোহী’ একটিতে
ময়মনসিংহ-৬ আসনে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির কামরুল হাসান। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন জেলা জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক জসিম উদ্দিন। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তিনি ১৯৮৮, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছিলেন। এবার বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দলীয় প্রার্থীর জয়ে প্রভাব পড়তে পারে।
জেলার ১১টি আসনের মধ্যে ময়মনসিংহ-১ ও ২ আসন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ময়মনসিংহ-৩ আসন নেজামে ইসলাম পার্টি, ময়মনসিংহ-৮ আসন এলডিপি, ময়মনসিংহ-৯ আসন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, ময়মনসিংহ-১১ আসন এনসিপিকে ছেড়ে দিয়েছে জামায়াত।
জামায়াতের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা ময়মনসিংহ-৬ আসনে আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান সফর করার কথা আছে। জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে আমিরের এই সফর কাজে দেবে বলে মনে করছেন দলীয় নেতা-কর্মীরা। জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মোজাম্মেল হক আকন্দ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলেও জয়ের ক্ষেত্রে তেমন সমস্যা মনে করছি না। আমাদের ১০–দলীয় জোটের প্রতি জনগণের যে ফ্লো তৈরি হয়েছে, তাতে স্বতন্ত্র প্রার্থী ভোটের হার কিছুটা কমাতে পারে; কিন্তু আমরা বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।’