‘২০ টাকা বেশি চেয়েছে, তাই উঠিনি; আরেকটি গাড়ির অপেক্ষায় আছি’

চট্টগ্রাম নগরের শাহ আমানত সেতু গোলচত্বর এলাকা। এখান থেকে আন্তজেলা ও লোকাল বাস ছাড়ে। আজ দুপুরে তোলাছবি: প্রথম আলো

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর জলদি এলাকার বাসিন্দা আবু সালেহ চাকরি করেন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায়। তাঁর কর্মস্থল চট্টগ্রাম নগরের আন্দরকিল্লায়। বাড়ি থেকে নিয়মিত মোটরসাইকেলে যাতায়াত করেন। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন আর মোটরসাইকেল ব্যবহার করছেন না। বাসে করেই যাওয়া-আসা করছেন। তবে বাসভাড়াও বেড়ে গেছে।

আজ বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের শাহ আমানত সেতু গোলচত্বর এলাকায় আবু সালেহের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বাস কাউন্টারের সামনে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হাতে ছিল সদ্য কেনা টিকিট। জানান, গতকাল রাতে পেশাগত কাজে নগরেই থাকতে হয়েছে। আজ তাই একটু আগেভাগেই বাড়িতে চলে যাচ্ছেন। আগে বাসে ১২০ টাকা নেওয়া হলেও আজ টিকিটের জন্য নেওয়া হয়েছে ১৩০ টাকা।

রোববার রাতে দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করে সরকার। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। আর পেট্রলের নতুন দাম প্রতি লিটার ১৬০ ও অকটেন ১৬৫ টাকা। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দূরপাল্লা, রাজধানীসহ শহরের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ১৭ পয়সা বৃদ্ধি করা হয়।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে কী প্রভাব পড়েছে, জানতে চাইলে হতাশা প্রকাশ করে আবু সালেহ জানান, আগে গ্রাম থেকে শহরে নিজের মোটরসাইকেলেই যাতায়াত করতেন তিনি। কিন্তু অকটেনের দাম একলাফে ২০ টাকা বেড়েছে। ১৪৫ টাকার প্রতি লিটার অকটেন এখন ১৬৫ টাকা। অফিসে আসা-যাওয়ায় দুই লিটারের বেশি অকটেন লাগে। এখন মোটরসাইকেল ব্যবহার করলে অন্তত ৫০ টাকা বেশি লাগবে। যে টাকা বেতন পাই, তা দিয়ে এই বাড়তি খরচ পোষানো সম্ভব না। তাই মোটরসাইকেলের বদলে বাসে করে আসা-যাওয়া করছেন। কিন্তু সেখানেও ১০ টাকা করে ২০ টাকা ভাড়া বেড়েছে।

চট্টগ্রাম নগরের শাহ আমানত সেতু গোলচত্বর এলাকা থেকে আন্তজেলা ও লোকাল বাস ছাড়ে। এখান থেকে কক্সবাজার, বান্দরবানসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় বাস চলাচল করে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এসব বাসের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা।

গত রোববার রাতে দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করে সরকার। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। আর পেট্রলের নতুন দাম প্রতি লিটার ১৬০ ও অকটেনের দাম ১৬৫ টাকা। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দূরপাল্লা, রাজধানীসহ শহরের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ১৭ পয়সা বৃদ্ধি করা হয়।

এমনিতেই সবকিছুর দাম বাড়তি। এখন জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে। এতে গাড়িভাড়া থেকে শুরু করে সবজির দামও বেড়ে যাবে আবার। যে টাকা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হয়ে যায়। এখন যে বাড়তি খরচ হবে, তা কীভাবে জোগাড় করব, তা মাথায় ধরছে না।
আবদুর রহমান, ভ্রাম্যমাণ লবণ বিক্রেতা।

যাত্রীরা বলছেন, ভাড়া বেশি বাড়ানো হয়েছে, চালক–সহকারীর অস্বীকার

শাহ আমানত গোলচত্বর থেকে কিছুক্ষণ পরপর দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় লোকাল বাস। অন্যান্য দিন যাত্রীদের ভিড় থাকলেও বুধবার তা ছিল না। তাই যাত্রীদের কেউ এলে তাঁদের নিয়ে টানাটানি শুরু হয় চালক–সহকারীদের মধ্যে।

এ সময় কথা হয় ঈগল পরিবহনের একটি বাসের চালকের সহকারী মোহাম্মদ ফরিদের সঙ্গে। তিনি দাবি করেন, লোহাগাড়ার আমিরাবাদ ও সাতকানিয়ার কেরানিহাট পর্যন্ত তাঁরা বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন না। আগের মতো যথাক্রমে ১০০ ও ৮০ টাকা করে নিচ্ছেন। তাঁর দাবি, ডিজেলের দাম বেড়েছে। গাড়ি চালাতে এখন প্রতি ট্রিপে (একবার যাওয়া ও আসা) ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা করে ব্যয় বেড়েছে। তারপরও তাঁরা যাত্রীদের কাছ থেকে আগের মতো ভাড়া নিচ্ছেন। ক্ষতি পোষাতে তাঁরা মজুরি কম নিচ্ছেন এবং মালিককে টাকা কম দিচ্ছেন।

একই দাবি করেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী রুটে চলাচল করা একটি বাসের চালক মো. সাদেক। তিনি বলেন, বাঁশখালীর ভাড়া ১১০ টাকা। এখনো তা–ই নিচ্ছেন। মালিকপক্ষের কোনো নির্দেশনা পাননি। নির্দেশনা পেলে নতুন ভাড়া আদায় করবেন।

তবে চালক ও চালকের সহকারীদের বাড়তি ভাড়া না নেওয়ার বিষয়টি ঠিক নয় বলে দাবি করেন দুই যাত্রী আবদুর রহমান ও মো. জামাল। চন্দনাইশের বাসিন্দা আবদুর রহমান বলেন, ‘চন্দনাইশে আগে নিত ৮০ টাকা, এখন দাবি করছে ১০০ টাকা। ২০ টাকা বেশি চেয়েছে, তাই গাড়িতে উঠিনি, এখন আরেকটি গাড়ির জন্য অপেক্ষায় আছি।’

যাত্রী কম। প্রায় ফাঁকা হয়ে আছে বাস কাউন্টার। আজ সকালে নগরের শাহ আমানত সেতু এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

গোলচত্বর এলাকায় কথা হয় ভ্যানগাড়ি করে লবণ বিক্রি করা আবদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এমনিতেই সবকিছুর দাম বাড়তি। এখন জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে। এতে গাড়িভাড়া থেকে শুরু করে সবজির দামও বেড়ে যাবে আবার। যে টাকা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হয়ে যায়। এখন যে বাড়তি খরচ হবে, তা কীভাবে জোগাড় করব, তা মাথায় ধরছে না।’

কক্সবাজারের মহেশখালীর বাসিন্দা উজ্জ্বল দাশ গত শনিবার চট্টগ্রাম নগরে এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। বুধবার বাড়িতে ফিরছেন ওষুধের দোকানে চাকরি করা উজ্জ্বল। চট্টগ্রাম থেকে প্রথমে যাবেন চকরিয়ায়। তিনি বলেন, ‘শনিবার বাসভাড়া নিয়েছিল ২৬০ টাকা। আজ সেই ভাড়া হয়ে গেছে ২৮০ টাকা। ২০ টাকা বেড়ে গেছে।’

দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুতের পর গাড়িভাড়া বৃদ্ধি করায় চাপে পড়বেন বলে জানান উজ্জ্বল দাশ। তিনি বলেন, ‘আমাদের আয় সীমিত। সবকিছুর দাম বেড়ে চলছে। কিন্তু বেতন বাড়ছে না। যে টাকা পেতাম, ওই টাকা দিয়ে সংসার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এখন নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।’

কাউন্টার প্রায় ফাঁকা, গাড়ির জটলা নেই

বুধবার প্রায় দেড় ঘণ্টা শাহ আমানত সেতুর গোলচত্বর এলাকায় অবস্থান করে দেখা গেছে, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় গোলচত্বর এলাকায় বাসের পরিমাণ কম। আগে যাত্রী ওঠা-নামা নিয়ে হাঁকডাক চললেও এখন তা কিছুটা কম। বাস কাউন্টারগুলোতেও যাত্রীদের ভিড় নেই। প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে। বাস কাউন্টারের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কক্সবাজারের ভাড়া ১০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বান্দরবানের ভাড়া এখনো বৃদ্ধি করা হয়নি।

এলাকাটিতে রয়েছে এস আলম বাস সার্ভিসের কাউন্টার। এই কাউন্টার থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাসগুলোর টিকিট পাওয়া যায়। কাউন্টার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, টেকনাফে আগে ৬৫০ টাকা ভাড়া ছিল। এখন তাঁরা নিচ্ছেন ৭৫০ টাকা। জ্বালানি তেলের দাম যে হারে বেড়েছে, তাঁরা ভাড়া সেভাবে বৃদ্ধি করেননি।

কক্সবাজারগামী পূরবী বাস সার্ভিসের কাউন্টার ব্যবস্থাপক মো. ফয়সাল দাবি করেন, কক্সবাজারের ভাড়া মাত্র ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগে ৪৩০ টাকা নেওয়া হলেও এখন নেওয়া হচ্ছে ৪৫০ টাকা। কক্সবাজার রুটে চলাচলরত শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস সার্ভিস স্বাধীন ট্রাভেলসের কর্মকর্তা মো. আহাদ বলেন, তাঁরা মাত্র ১০০ টাকা ভাড়া বাড়িয়েছেন।

বাস কাউন্টারের কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় বাস চলাচলের পরিমাণ কমে গেছে। শাহ আমানত সেতু থেকে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার গাড়ি চলাচল করে। কিন্তু এখন চলাচল করছে ৬০০ থেকে ৭০০ গাড়ি। গাড়ি যেমন কমেছে, তেমনি যাত্রীর পরিমাণও কমেছে। কেননা, ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীরা এখন যাতায়াত করছেন না। তবে দু-এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চট্টগ্রামের পরিচালক শফিকুজ্জামান ভূঞা প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভাড়া বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘অনেক যাত্রী মৌখিকভাবে বাড়তি ভাড়ার নেওয়ার অভিযোগ করেন। কিন্তু লিখিতভাবে সুনির্দিষ্ট গাড়ির বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ দিচ্ছেন না। সরকারনির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বাড়তি ভাড়া নিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে কি না, তা তদারকির জন্য বিআরটিএর দল মাঠে রয়েছে।’