নিজে রান্না করে ক্যাম্পাসের অভুক্ত কুকুর–বিড়ালকে খাওয়ান সালাহউদ্দীন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস তখন প্রায় নিস্তব্ধ। ক্লাস নেই, হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের কোলাহল নেই। প্রায় নিস্তব্ধতার এই কারণ, এখন ঈদের টানা ছুটি চলছে।
এমন ক্যাম্পাসে হাতে খাবারের থলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন, নাম মো. সালাহউদ্দীন মামুন (নীল)। তাঁর চারপাশ ঘিরে আছে একদল ক্ষুধার্ত কুকুর-বিড়াল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষণাগারে চাকরি করেন তিনি। বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার সমসাদীপুর এলাকায়।
সালাহউদ্দীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন। পরে তিনি ঢাকায় আইসিডিডিআরবি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ও ব্র্যাকের প্রধান কার্যালয়ে চাকরি করেছেন। ২০১৭ সালে তিনি যোগ দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ মার্চ থেকে ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে। চলবে ২৯ মার্চ পর্যন্ত। সালাহউদ্দীন মামুন প্রতিদিন দুই শর বেশি অভুক্ত কুকুর-বিড়ালকে খাবার দিচ্ছেন। এক দিন পরপর তিনি প্রায় ২৫ কেজি খাবার রান্না করেন। এর মধ্যে ১৫ কেজি কুকুরের জন্য (চাল ও মুরগির অংশ) এবং ১০ কেজি বিড়ালের জন্য (চাল ও মাছ)।
সালাহউদ্দীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭টি হলের গার্ডদের মাধ্যমে বিড়ালের খাবার পৌঁছে দেন। আর নিজে ঘুরে ঘুরে ২০–২৫টি স্পটে কুকুরদের খাবার বিতরণ করেন। পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁর সময় লাগে কয়েক ঘণ্টা।
প্রায় আট বছর আগে একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে সালাহউদ্দীন মামুনের এই পথচলার শুরু। কাটাখালী পৌরসভার দেওয়ানপাড়ায় এক কোণে একটি মা কুকুরের মৃতদেহ পড়ে ছিল। সেখানে দুধ খাচ্ছিল তার চারটি ছোট শাবক। আশপাশ দিয়ে অনেক মানুষ গেলেও কেউ এগিয়ে আসেননি।
সালাহউদ্দীন বলেন, ‘ওই দৃশ্যটা আমি সহ্য করতে পারিনি। মনে হয়েছিল, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা পরীক্ষা। সেদিনই লাশটি মাটিচাপা দিই, বাচ্চাগুলো বাসায় নিয়ে গিয়ে লালন-পালন করি। সেখান থেকেই শুরু।’ এর পর থেকে থেমে থাকেননি তিনি। কখনো আহত কুকুর, কখনো অসুস্থ বিড়াল, আবার কখনো বিদ্যুৎস্পৃষ্ট চিল—যে প্রাণীই বিপদে পড়েছে, তিনি চেষ্টা করেছেন পাশে দাঁড়াতে। নিয়মিত করে থাকেন সাপের রেসকিউ।
নিজে ভেটেরিনারি চিকিৎসক না হলেও প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারেন সালাহউদ্দীন মামুন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রাথমিক চিকিৎসা দিই। পাউডার, ভায়োডিন—যা পারি করি। প্রয়োজনে ক্লিনিকে নিয়ে যাই।’ বর্তমানে তাঁর বাসায় তিনটি চিল পাখি চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া দোয়েল, মাছরাঙা, বকসহ নানা পাখিকেও তিনি সুস্থ করে আবার প্রকৃতিতে ছেড়ে দেন। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলে তাঁর কাজ আরও বেড়ে যায়। কারণ, তখন হোটেল-রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকায় প্রাণীগুলো খাবার পায় না।
রান্না থেকে শুরু করে আহত প্রাণীর চিকিৎসা—সবই হয় সালাহউদ্দীন মামুনের বাড়িতে হয়। বাড়ির ছাদে গড়ে তুলেছেন ছোট একটি পাখির রেসকিউ সেন্টার। প্রথম দিকে পরিবারের সদস্যরা আপত্তি করলেও এখন তাঁরাই বড় সহায়। তাঁর ছোট ভাই খাবার রান্না ও বিতরণে সাহায্য করেন। স্ত্রী, মা ও শাশুড়িও রান্নার কাজে হাত লাগান।
এই কাজের জন্য শুরুতে কারও কাছে সাহায্য চাননি সালাহউদ্দীন। নিজের আয়ের একটি অংশ থেকে খরচ চালিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, তাঁর একটি সাদা ইঁদুরের খামার আছে, যেখান থেকে গবেষণার জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সরবরাহ করা হয়। সেই আয়কে তিন ভাগে ভাগ করেন—এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ খামারের জন্য, আরেক ভাগ প্রাণীদের জন্য।
তবে সম্প্রতি প্রথমবারের মতো সালাহউদ্দীন মামুন সহায়তা চেয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৫ জন মানুষের সহযোগিতা চেয়ে পোস্ট দেন। সাড়া দিয়েছেন মাত্র তিনজন। পাশাপাশি কিছু কাছের মানুষও সহায়তা করেছেন।
নারী শিক্ষার্থীদের আবাসিক মুন্নুজান হলের নিরাপত্তা প্রহরী আবদুর রাজ্জাক বলেন, লম্বা ছুটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কুকুর–বিড়ালগুলো বেশি বিপদে পড়ে। এবার তো আবাসিক হলও বন্ধ। এ সময়ে খাবারের খোঁজে বিড়ালগুলো হলের গেটের কাছে চলে আসে। সালাহউদ্দীন নিয়ম করে খাবার দিয়ে যান। এতে প্রাণীগুলো কিছুটা হলেও খেতে পারছে।
শাহ মখদুম হলের নিরাপত্তা প্রহরী মো. আবদুল মালেক বলেন, ‘এটা খুব ভালো উদ্যোগ। এটা না করলে তো অনেক জীবজন্তু মরে যেত। বিশ্ববিদ্যালয় যত দিন বন্ধ থাকে তত দিন খাবার দেন। এখানে তাঁর প্রচুর টাকা খরচ হয়। গত বছর থেকে এটা আমি দেখছি যে তিনি দিচ্ছেন।’
সালাহউদ্দীন মামুনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তো দূরের কথা, পুরো শহরেই নেই কোনো প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্র। তিনি বলেন, একটা আহত পাখি বা প্রাণীকে কোথাও রেখে চিকিৎসা দেওয়ার জায়গা নেই। তাই বাসায় নিয়ে আসতে হয়। তাঁর স্বপ্ন শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পুরো রাজশাহী শহরের জন্য একটি শেল্টার হোম গড়ে তোলা। প্রাণীদের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই পৃথিবী সবার। মানুষ মানুষের পাশে থাকুক, মানুষ প্রাণীর পাশেও থাকুক। তাহলেই একটা শান্তির পৃথিবী হবে।
সালাহউদ্দীন খাবার দেওয়া শেষ করেন বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন বিনোদপুর গেটের কাছে। সেখানে তিনি ১০-১৫টি কুকুরকে খাবার দেন। সেখানে কুকুরকে খাবার দেওয়ার দৃশ্য দেখে এগিয়ে আসেন রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মতিহার জোনের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম। তিনি এই কাজের প্রশংসা করে সালাহউদ্দীনকে উৎসাহ দেন।