রিসোর্টে আগুনের পর কক্সবাজারের পর্যটন পরিস্থিতি কেমন, পর্যটকেরা কি আসছেন

কক্সবাজার সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে পর্যটকের ভিড়। রোববার বিকেলে।ছবি: প্রথম আলো

দুর্গাপূজার ছুটিতে কক্সবাজারের শহরের হোটেল, গেস্টহাউস ও কটেজগুলোতে অতিথির চাপ থাকলেও উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতের টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর মেরিন ড্রাইভ এলাকার রিসোর্ট-কটেজে পর্যটকদের উপস্থিতি কমেছে। বাঁশ ও কাঠের তৈরি এসব স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থেকে অনেক পর্যটক শহরের হোটেল বেছে নিচ্ছেন।

হোটেলমালিকেরা বলছেন, টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর পর্যটক আসা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু গত দুই দিনের সেই শঙ্কা কেটে গেছে। পর্যটকের ভিড় বেড়েছে। দুর্গাপূজা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি মিলিয়ে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ১০ দিনে কক্সবাজারে অন্তত ১০ লাখ পর্যটকের সমাগম হতে পারে। এ সময়ে পর্যটনসংশ্লিষ্ট খাতে ৯০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসার আশা করছেন তাঁরা।

১৭ অক্টোবর সকালে টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। পরে সেখান থেকে ১০ জনের পোড়া মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। এ ঘটনায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে ওই দিন রাত ১১টার দিকে উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশীষ সূত্রধর ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করে ১৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

মামলার চার নম্বর আসামি জাহিদ হোসেনকে গ্রেপ্তারের পর গত রোববার বিকেলে কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ। তবে সোমবার পর্যন্ত এ আবেদনের শুনানি হয়নি।

রিসোর্টে পর্যটক কমেছে

মেরিন ড্রাইভের ইনানী সৈকতে দোতলার সালমান রিসোর্টে কক্ষ আছে ৯টি। শনিবার সকাল পর্যন্ত এ রিসোর্টে সাতটি কক্ষে অতিথি ছিল। পরদিন থেকে রিসোর্টে কোনো অতিথি নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রিসোর্টের একজন কর্মী জানান, আগুনের ঘটনায় পর্যটকেরা রিসোর্টে থাকা নিরাপদ মনে করছেন না। ২১ অক্টোবর পর্যন্ত যেসব কক্ষ অগ্রিম বুকিং ছিল, তা–ও বাতিল হয়ে যাচ্ছে।

পাশের পালকি রিসোর্ট, বিচ ভিউ, ফাইন ডাইনেও একই অবস্থা। তিনটি রিসোর্টে ৬০ পর্যটক থাকার ব্যবস্থা থাকলেও গতকাল সোমবার ছিলেন মাত্র সাতজন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জানান, এক রিসোর্টের আগুনে পুড়ে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় মেরিন ড্রাইভের পরিবেশবান্ধব অর্ধশতাধিক ইকো রিসোর্ট কটেজের ব্যবসায় ধস নেমেছে। এমন পরিস্থিতির কখন স্বাভাবিক হবে, জানা নেই।

তবে প্যাঁচারদ্বীপের পরিবেশবান্ধব মারমেইড বিচ রিসোর্টে তেমন প্রভাব পড়েনি বলে জানান ব্যবস্থাপক মো. রিসাদ। এ রিসোর্টের ৩৩টি কটেজে ৯০ জনের থাকার সুযোগ রয়েছে।

কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান প্রথম আলোকে বলেন, অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় মেরিন ড্রাইভ এলাকার ৮০টির বেশি রিসোর্ট-কটেজের প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষ খালি পড়ে আছে। অন্যদিকে শহরের হোটেল-গেস্টহাউসে পর্যটকের চাপ বেড়েছে। সোমবার শহরের হোটেল-গেস্টহাউসগুলোতে ৯০ হাজারের বেশি পর্যটক অবস্থান করছেন।

অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় মেরিন ড্রাইভ এলাকার ৮০টির বেশি রিসোর্ট-কটেজের প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষ খালি পড়ে আছে। অন্যদিকে শহরের হোটেল-গেস্টহাউসে পর্যটকের চাপ বেড়েছে।
মুকিম খান, সাধারণ সম্পাদক, কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতি

শহরের হোটেলে চাপ

পূজার ছুটিতে পর্যটকের ভিড় বেড়েছে। রোববার সুগন্ধা পয়েন্টে
ছবি: প্রথম আলো

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা আসছেন। গত ১৫ অক্টোবর থেকে পর্যটকদের আগমন শুরু হয়েছে। হোটেলমালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার—টানা তিন দিনের ছুটিতে অন্তত তিন লাখ পর্যটক সৈকত ভ্রমণ করেছেন।

রোববার থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ দিনের পূজার ছুটি। এরপর ২৩ ও ২৪ অক্টোবর সাপ্তাহিক ছুটি এবং ২৫ অক্টোবর লক্ষ্মীপূজার ছুটি মিলিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে টানা ১০ দিনের ছুটি চলছে। এ ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

কক্সবাজার হোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার প্রথম আলোকে বলেন, ২১ অক্টোবর বিকেলে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে প্রতিমা বিসর্জন উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। এ উৎসবের আগে-পরে তিন দিনে অন্তত চার লাখ মানুষের সমাগম হতে পারে। সব মিলিয়ে ১০ দিনের ছুটিতে অন্তত ১০ লাখ পর্যটক আসবেন বলে তাঁরা আশা করছেন।

আবুল কাশেম সিকদার জানান, তারকা মানের ২০টির বেশি হোটেলে প্রায় ৯৫ শতাংশ কক্ষ এবং মাঝারি আকারের হোটেল, গেস্টহাউস ও কটেজের প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়েছে। অবশিষ্ট কক্ষগুলোও এক-দুই দিনের মধ্যে বুকিং হয়ে যেতে পারে। এবার কক্ষভাড়ায় কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে প্রশাসন তদারক করছে। শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউসে একসঙ্গে ১ লাখ ৬৮ হাজার মানুষের রাতযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে।

সোমবার দুপুরে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় এক কিলোমিটার সৈকতজুড়ে পর্যটকদের ভিড়। কেউ সাগরের পানিতে গোসল করছেন, কেউ বালুচরে ছাতা-চেয়ারে বসে সমুদ্র দেখছেন। অনেকে ঘোড়ার পিঠে বা বিচবাইকে চড়ে ঘুরছেন। দক্ষিণের সুগন্ধা ও কলাতলী সৈকতেও ছিল উপচে পড়া ভিড়।

বিকেলে সুগন্ধা পয়েন্টে কথা হয় ঢাকার কমলাপুর এলাকার ব্যবসায়ী মাহবুবুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ইনানী সৈকতের একটি রিসোর্টে থাকার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর রিসোর্টের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মেরিন ড্রাইভ এলাকার অধিকাংশ রিসোর্ট বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি হওয়ায় সেখানে থাকতে আর নিরাপদ মনে হচ্ছে না।

কক্সবাজারের ইনানীতে আগুনে পুড়ে যাওয়া রিসোর্ট
ছবি: প্রথম আলো

ঢাকার ফরাসগঞ্জের ব্যবসায়ী সোহরাব মিয়া স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে শনিবার রাতে কক্সবাজার আসেন। কলাতলীর একটি হোটেলে ওঠার পর সকালে সুগন্ধা সৈকতে যান। সেখানে মানুষের ভিড় দেখে পরিবার নিয়ে চলে আসেন লাবণী পয়েন্টে। ৪৫ বছর বয়সী সোহরাব বলেন, লাবণী পয়েন্টেও হাজারো মানুষের সমাগম দেখেছেন।

পাশের চেয়ারে বসা গাজীপুরের বাসিন্দা কেরামত উল্লাহ বলেন, স্ত্রীর চাকরি ও নিজের ব্যবসার কারণে কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এবার পাঁচ দিনের জন্য কক্সবাজারে এসেছেন। ২১ অক্টোবর সৈকতে প্রতিমা বিসর্জন দেখে বাড়ি ফেরার ইচ্ছা তাঁর।

তারকা মানের হোটেল কক্স টুডের মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব জানান, তাঁদের হোটেলের ৮৫ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়েছে। ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত অতিথির চাপ থাকবে বলে আশা করছেন তাঁরা।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুল শুক্কুর বলেন, ১০ দিনের ছুটিতে ১০ লাখ পর্যটকের সমাগম হলে হোটেল-রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট খাতে ৯০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, দুর্গাপূজার ছুটিতে সর্বোচ্চসংখ্যক পর্যটক আসতে পারেন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিমা বিসর্জন উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের হয়রানি বন্ধ ও সেবা নিশ্চিত করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে রয়েছেন।

পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

৪০০ প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি

কক্সবাজার জেলায় এবার ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে ১৫৫টি প্রতিমাপূজা এবং ১৬৯টি ঘটপূজা। চকরিয়া উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ৭১টি মণ্ডপ রয়েছে। এ ছাড়া কুতুবদিয়ায় ৪৪টি, রামুতে ৩৭টি, কক্সবাজার সদরে ৩১টি, ঈদগাঁওয়ে ২৯টি, মহেশখালীতে ২৮টি, কক্সবাজার পৌরসভায় ২৬টি, চকরিয়া পৌরসভায় ২৫টি, পেকুয়ায় ৯টি, উখিয়ায় ৯টি, মহেশখালী পৌরসভায় ৬টি ও টেকনাফে ৬টি মণ্ডপ রয়েছে।

২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে সৈকতে অন্তত ৪০০ প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হবে। আয়োজকদের আশা, এ উৎসব দেখতে আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ মানুষের সমাগম হবে।

আরও পড়ুন

কক্সবাজার জেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো মণ্ডপে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। শান্তিপূর্ণভাবে দেশের সর্ববৃহৎ প্রতিমা বিসর্জন উৎসব আয়োজনের আশা করছেন তাঁরা। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বৈঠক করে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনও প্রস্তুত রয়েছে।

জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি দোলন ধর বলেন, দুর্গাপূজার আগের জৌলুশ এখন আর নেই। নানা সংকটে সনাতন সম্প্রদায়ের মানুষের আনন্দও কমেছে। তারপরও শারদীয় দুর্গোৎসব তাঁদের মনে নতুন করে শক্তি জোগায়।

উখিয়া ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অজিত দাশ বলেন, কক্সবাজার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শহর। সৈকতে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে প্রতিমা বিসর্জনের যে আয়োজন হয়, তা দেশের অন্য কোথাও দেখা যায় না। মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এ উৎসব উপভোগ করেন। কক্সবাজারের সম্প্রীতির এই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

আরও পড়ুন