শেখপাড়া লোহাপট্টি আর পল্লীমঙ্গল স্কুলের পাশের ড্রেনে সবচেয়ে বেশি লোহা পাওয়া যায়। তাই ওই দুই এলাকার ড্রেনগুলোর পাশে তাঁকে বেশি দেখা যায়। সেখানকার প্রায় নিয়মিত মুখ হওয়ায় আশপাশের মানুষ আলমগীরের নাম দিয়েছেন ‘ড্রেনের বাদশা’।

নাম জানতে চাইলে বললেন, তাঁর নাম ‘বোচা’। যদিও তাঁর মা–বাবার দেওয়া নাম আলমগীর। তবে ছোটবেলায় এক কবিরাজ বোচা নামটি রেখেছিলেন। এর পর থেকে বোচা নামটি চাউর হয়ে যায়। আলমগীরের বয়স এখন পঁয়তাল্লিশের মতো। ১০-১২ বছর বয়স থেকে তিনি ড্রেনের ভেতর থেকে চুম্বক দিয়ে ধাতব বস্তু সংগ্রহের কাজ করছেন। দেশ স্বাধীনের অনেক আগে বরিশাল থেকে তাঁর বাবা খুলনা শহরে আসেন। বাবা ছিলেন বাবুর্চি। তাঁর আয়ে ভর করে সাত সদস্যের পরিবার চলত। অভাব–অনটনে পড়াশোনা করা হয়নি আলমগীরের।

কাদাপানিতে শরীর লেপ্টে থাকলেও আলমগীর হাসিখুশি থাকেন। নগরের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের বানরগাতি মেটেপোল এলাকায় আলমগীর একা থাকেন। স্ত্রীর সঙ্গে কয়েক বছর আগেই বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৯টা-১০টার দিকে ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। একেক দিন একেক এলাকায় যান। এরপর খোলা নালা পেলেই চুম্বক নিয়ে ধাতব বস্তুর সন্ধানে নেমে পড়েন।

আলমগীর বলেন, প্রতিদিন ১৫ থেকে ২৫ কেজি ধাতব বস্তু সংগ্রহ করতে পারেন তিনি। ভাঙা প্লেট, লোহার টুকরা, চামচ, পেরেক, পয়সা, লোহা, ধাতুর তৈরি কৌটা, তারকাঁটা—এসব উঠে আসে তাঁর চুম্বকে। ভাঙারির দোকানে এগুলো ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। এতে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয় তাঁর।

default-image

শহরের প্রায় সব ড্রেনেই আলমগীরের দেখা মেলে। তবে শেখপাড়া লোহাপট্টি আর পল্লীমঙ্গল স্কুলের পাশের ড্রেনে সবচেয়ে বেশি লোহা পাওয়া যায়। তাই ওই দুই এলাকার ড্রেনগুলোর পাশে তাঁকে বেশি দেখা যায়। সেখানকার প্রায় নিয়মিত মুখ হওয়ায় আশপাশের মানুষ আলমগীরের নাম দিয়েছেন ‘ড্রেনের বাদশা’।

খুলনার বিভিন্ন খালে চুম্বকে দড়ি বেঁধে লোহা খোঁজার লোক এখনো বেশ কিছু দেখা যায়। তবে হাতে চুম্বক নিয়ে লোহার খোঁজার লোক খুলনা শহরে তিনজন আছেন। একসময় অন্তত ১৬-১৭ জন এই পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে জানালেন আলমগীর।

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এ কাজে ঝুঁকি থাকলেও আলমগীরের কিছু করার নেই। আলমগীর বলেন, ‘কোমর-পায়ে ব্যথা হয়ে যায়। আর হাতের অবস্থা তো খারাপই থাকে। একবার কাচে কেটে পা প্রায় পচে গিয়েছিল। এখনো বছরে বহুবার হাসপাতালে যাওয়া লাগছে। অন্য কাজ তেমন শিখিনি। কারে বলব যে একটা কাজ দেন। আজ দেবে কাল হয়তো বসে থাকতে হবে। কাজ না করলে তো না খাইয়ে মরে যাইতে হবে। আমার এটা পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ কাজ। তারপরও এ কাজ করলে না খেয়ে মরার সম্ভাবনা নাই। ৫০ টাকা হলেও আয় হবে। স্বাধীনতাও আছে।’

আলমগীরের চুম্বকে কখনো দামি কোনো বস্তু ওঠেনি। তবে একদিন সেটা ঘটতেও পারে, এমন আশা করে আলমগীর বলেন, ‘বলা তো যায় না। ওপরওয়ালা যদি কোনো দিন মিলায়ে বসে। তাহলে ভালো একটা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পরতাম। এ কাজে স্বাধীনতা আছে। পেটটাও চলে যায়। তবে এতে আমি যতই ইনকাম করি, আমার চার আনার মূল্য নাই মানুষের কাছে। ব্যবসা করতে পারলে মানুষ দামও দিত আবার সংসারও ভালো চলত।’

‘একজনের সংসারে খরচ তো তেমন নেই’, এ কথা বলতেই আলমগীর আপত্তি জানালেন। ঘরভাড়া, পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি খরচ, খাওয়া, বাজার খরচের বিস্তর হিসাব দিলেন। আবার নতুন করে সংসার করার ইচ্ছাও জানালেন তিনি।

আলমগীর বলেন, ‘সারা দিন কাজ শেষে ফিরে রান্না করে খাওয়া কষ্ট হয়ে যায়। একটা ব্যবসা শুরু করে সংসার পাতা দরকার। তবে টাকা জমানো হচ্ছে না। মাসে একটু করে টাকা জমাই। তবে যখন কিছু টাকা জমে, তখনই কেন জানি হাত–পা কেটে বড় ধরনের অসুস্থতা চলে আসে। তখন জমানো টাকা খরচ হয়ে যায়।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন