‘ছেলেদের লাশ কাঁধে নিতেই মনে হলো, পাহাড়টাই আমার কাঁধে উঠে গেছে’
২০১৭ সালের ১৩ জুন পাহাড়ধসে বৃহত্তর চট্টগ্রামে ১৫৮ জনের মৃত্যু হয়। রাঙামাটিতেই মারা গিয়েছিল ১২০ জন। এখনো পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি রয়ে গেছে।
রাতভর ভারী বর্ষণ। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সবাই। ভোর পেরিয়ে সকাল হচ্ছে হচ্ছে। এ সময় হঠাৎ বিকট শব্দ। ঘুম ভেঙে যায় বাদল দত্তের। ঘুম ঘুম চোখ মেলে যা দেখেছিলেন, এখনো তা তাঁকে তাড়া করে ফিরে। পাশের পাহাড় ধসে পড়েছে ঘরের ওপর। মাটির নিচে আটকে পড়েছিলেন স্ত্রী ও দুই ছেলেসহ।
সেনাবাহিনীর সহায়তায় শেষ পর্যন্ত বিধ্বস্ত ঘর থেকে কোনো রকম বের হয়ে এসেছিলেন বাদল দত্ত ও তাঁর স্ত্রী। তবে বড় ছেলেকে দুই দিন ও ছোট ছেলেকে তিন দিন পর পাওয়া যায়। যখন মাটির নিচ থেকে তাঁদের বের করে নিয়ে আসা হয়, তখন শুধু দেহটাই ছিল, প্রাণ ছিল না।
পাহাড়ধসের এ ঘটনা ঘটেছিল ২০১৭ সালের ১৩ জুন রাঙামাটির শহরের ভেদভেদী এলাকায়। আজ শনিবার সে পাহাড়ধসের ৯ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ওই দিনের এমন বিপর্যয়ে শুধু বাদল দত্ত নন, স্বজন হারিয়েছিলেন আরও অনেকেই। সবুজ পাহাড়ি শহর রাঙামাটিতে মাটির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ গিয়েছিল ১২০ জনের। আর বৃহত্তর চট্টগ্রামে ১৫৮ জন নিহত হয়েছিল।
পাহাড়ধসে সন্তান হারানোর বেদনা বুকে চেপে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন বাদল দত্ত। কিন্তু তাঁর স্ত্রী ভুলু রানী নাড়িছেঁড়া ধন দুই ছেলেকে হারিয়ে এখনো যেন শোকের নিচে চাপা পড়ে আছেন। ছেলেদের এমন করুণ মৃত্যুতে এখনো পাগলপ্রায় এই মা। সময় ও পরিবেশ সব স্বাভাবিক হয়ে এলেও ভুলু রানীর জীবন আটকে আছে ৯ বছর আগের সেই সকালে।
সময় আর কত হবে, ভোর সাড়ে পাঁচটা কী সকাল ছয়টা। হঠাৎ এক ভয়ানক শব্দ। মুহূর্তে ঘুম ভেঙে যায়। যা দেখি, তাতে হাত–পা ঠান্ডা হয়ে আসে। পাশের পাহাড়টা এসে পড়েছে আমার ঘরের ওপর। এখনো সে দৃশ্য ভুলতে পারিনি।বাদল দত্ত, বাসিন্দা, ভেদভেদী বাজার, রাঙামাটি।
রাঙামাটি শহরের ভেদভেদী বাজারে জরাজীর্ণ মাচাংঘরে স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন বাদল দত্ত। এক পাশে ভাতের দোকান, আরেক পাশে থাকার ঘর। এখনো পাহাড়ধসের আতঙ্ক তাঁদের তাড়া করে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন বাদল দত্ত, ‘ছেলেদের লাশ দুটো যখন কাঁধে নিলাম, মনে হলো পাহাড়টাই আমার কাঁধে উঠে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘টানা বৃষ্টি হচ্ছিল। এর মধ্যে রাতের খাবার খেয়ে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। পরের দিন, সময় আর কত হবে, ভোর সাড়ে পাঁচটা কী সকাল ছয়টা। হঠাৎ এক ভয়ানক শব্দ। মুহূর্তে ঘুম ভেঙে যায়। যা দেখি, তাতে হাত–পা ঠান্ডা হয়ে আসে। পাশের পাহাড়টা এসে পড়েছে আমার ঘরের ওপর। এখনো সে দৃশ্য ভুলতে পারিনি।’
ওই দিনের পাহাড়ধসে রাঙামাটি পরিণত হয়েছিল এক বিধ্বস্ত জনপদে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল প্রায় ছয় হাজার ঘরবাড়ি। কোথাও সড়ক ভেঙেছিল, কোথাও সড়কে পড়ে ছিল পাহাড়ের ধসে পড়া মাটি। দুর্যোগের ব্যাপকতা এত বেশি ছিল যে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর মতো পরিস্থিতি স্থানীয় প্রশাসনের ছিল না।
সেদিনের জনপদ তছনছ করে দেওয়া সে পাহাড়ধসকে তখন অতিবৃষ্টির দুর্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে গবেষণায় বের হয়ে আসে, পাহাড়ধসের এমন ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল আরও আগে থেকে। আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যার বাড়তি চাপ, অপরিকল্পিতভাবে বসতি স্থাপন, পাহাড় কেটে সড়ক ও ঘরবাড়ি নির্মাণ, নির্বিচার বন ও পাহাড় উজাড়—এসব কারণে ভয়াবহ দুর্যোগ ঘটে।
দুর্যোগের সে সকালে রাঙামাটিতে ১৪২ স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছিল। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল রাঙামাটি পৌরসভার ১৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা। ৮৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফসল নষ্ট হয়েছিল তিন কোটি টাকার। আর্থিকভাবে মোট ক্ষতির পরিমাণ ২০০ কোটি টাকা।
এমন প্রাণঘাতী ঘটনার পরেও কেউ যেন শিক্ষা নেননি। এখনো পাহাড়ি এই জেলায় চলছে পাহাড় কাটা। পাহাড়েই নির্মাণ করা হচ্ছে ঘরবাড়ি, অফিসসহ বিভিন্ন স্থাপনা। মামলা–জরিমানা করেও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ পাহাড়ের ঢালে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থামেনি।
যা ক্ষয়ক্ষতি
৯ বছর আগের ওই দুর্যোগে রাঙামাটির ১২০ জনের মধ্যে শহরেই প্রাণ গিয়েছিল ৭৩ জনের। আহত হয়েছিল অন্তত ৮৮ মানুষ। রাঙামাটি সদর ছাড়া বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল কাউখালী ও কাপ্তাই উপজেলায়। এ ছাড়া ওই দিন পাহাড়ধসে চট্টগ্রামে ২৯ জন, বান্দরবানে ৬, কক্সবাজারে ২ ও খাগড়াছড়িতে ১ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগের সে সকালে রাঙামাটিতে ১৪২ স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছিল। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল রাঙামাটি পৌরসভার ১৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা। ৮৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফসল নষ্ট হয়েছিল তিন কোটি টাকার। আর্থিকভাবে মোট ক্ষতির পরিমাণ ২০০ কোটি টাকা।
রাঙামাটির ইতিহাসে নজিরবিহীন পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ৩ হাজার ৪৯০ জনের ঠাঁই হয়েছিল ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে। প্রথম দুই সপ্তাহে আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটে তাদের। এরপর নিজ এলাকায় ফিরতে শুরু করেছিল তারা। অনেকের ফিরতে ফিরতে ছয় মাসের বেশি সময় লেগে যায়।
পাহাড়ধসে রাঙামাটির সঙ্গে দেশের অন্য জেলাগুলোর সড়কপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের অধীনে থাকা রাঙামাটির সঙ্গে যুক্ত তিনটি সড়কের ১১৩টি স্থান ভেঙে যায়। এসব সড়কের ১৪৫টি স্থানে পাহাড়ধস হয়েছিল।
রাঙামাটি–চট্টগ্রাম মহাসড়কে অন্তত ৫০টি স্থান হয় ভেঙে গিয়েছিল, নয়তো পাহাড়ধসের মাটি এসে পড়েছিল। কিছু কিছু স্থানে ফাটলের সৃষ্টি হয়েছিল। আট দিন পর হালকা গাড়িগুলো চলতে পারলেও মূল সড়ক দিয়ে ভারী যান চলাচল শুরু হতে সময় লেগেছিল দুই মাসের বেশি। অন্য সড়কগুলো সচল হতে সময় লেগেছিল দুই থেকে চার সপ্তাহ। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে থাকা রাঙামাটি–আসামবস্তি–কাপ্তাই সড়কের ৩২টি স্থানে ভাঙন ও দুটি স্থানে বড় ফাটলের সৃষ্টি হয়েছিল।
রাঙামাটিতে এই দুর্যোগের এমন ভয়াবহতা ও ব্যাপকতা ছিল যে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর সক্ষমতা পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসনের ছিল না। ঘটনার পরদিন এমনটাই প্রথম আলোকে বলেছিলেন রাঙামাটি ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা। পরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় উদ্ধার তৎপরতা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। এতে যোগ দিয়েছিল চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের ৬০ উদ্ধারকারী দল।
রাঙামাটিতে পাহাড়ধসের পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে মানিকছড়িতে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে উদ্ধারকাজ শুরু করে সেনাবাহিনী। এ সময় আবার পাহাড়ধস হয়। এর মাটি এসে পড়লে দুই কর্মকর্তাসহ পাঁচ সেনাসদস্য নিহত হয়েছিলেন। আহত হয়েছিলেন ১০ সেনাসদস্য।
যে কারণে ঘটেছিল দুর্যোগ
রাঙামাটির সে পাহাড়ধসের ঘটনা নিয়ে গবেষণা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের দুই অধ্যাপক মো. ইকবাল সরোয়ার ও মোহাম্মদ আবু তৈয়ব চৌধুরী। তাঁদের ‘চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধসের ঝুঁকি ও পূর্বাভাস মানচিত্র: জিআইএস প্রযুক্তিতে রাঙামাটি পৌরসভা নিয়ে গবেষণা’ শীর্ষক গবেষণা নিবন্ধ ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা স্প্রিংগার নেচার সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত বইয়ে একটি অধ্যায় হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এ গবেষণায় রাঙামাটি পৌরসভায় পাহাড়ধসের কারণ উপস্থাপন করা হয়েছিল।
এ গবেষণায় বলা হয়েছে, রাঙামাটিতে সেদিনের পাহাড়ধসের পেছনে অতিবৃষ্টি ছিল তাৎক্ষণিক কারণ। কিন্তু এটিই একমাত্র কারণ নয়। রাঙামাটির পাহাড়ি ঢাল, বালুময় ও সূক্ষ্ম কণাযুক্ত দুর্বল মাটি, জলাশয়ের কাছাকাছি বসতি, সড়ক নির্মাণ, ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন, বন ও পাহাড় নিধন, গাছপালা কমে যাওয়া ও জনসংখ্যার চাপ—সব মিলিয়েই ওই দুর্যোগ ভয়াবহ রূপ নেয়।
গবেষণায় রাঙামাটি পৌর এলাকার ভূমিধস ঝুঁকি নিরূপণে ১৫টি কারণ বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চতা, ঢাল, ঢালের দিক, ভূমির বাঁক, জলপ্রবাহ ক্ষমতা, জলাশয়ের দূরত্ব, বৃষ্টি, ভূতাত্ত্বিক গঠন, ফল্ট লাইনের দূরত্ব, উদ্ভিদ আচ্ছাদন, ভূমি ব্যবহার, সড়কের দূরত্ব, জনসংখ্যা ও আগের ভূমিধসের অবস্থান। পাহাড়ধসের আগে রাঙামাটিতে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছিল। ওই সময় তিন দিনে প্রায় ৫৯০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এই বৃষ্টিতে পাহাড়গুলোর মাটি নাজুক হয়ে পড়েছিল।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকের গবেষণায় বলা হয়েছে, রাঙামাটির ভয়াবহ পাহাড়ধসের পটভূমি ছিল বর্ষা মৌসুমের বৃষ্টি। অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ের ঢালে মাটির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পড়েছিল। আবার পার্বত্য অঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ ভূমি বালু ও কণাযুক্ত মাটির সমন্বয়ে গঠিত। এ ধরনের মাটি ভারী বৃষ্টিতে সহজে দুর্বল হয়ে যায়।
গবেষণা নিবন্ধে আরও বলা হয়, পাহাড়ি এলাকায় কোনো ঢাল জলাশয়ের যত কাছাকাছি থাকে, ধসের ঝুঁকি তত বাড়তে পারে। কারণ জলাশয়, নদী ও খালের কাছাকাছি এলাকায় মাটির ক্ষয়, পাদদেশ দুর্বল হওয়া ও ঢালের স্থিতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। রাঙামাটি শহরই গড়ে উঠেছে কাপ্তাই হ্রদের পাশে।
গবেষণায় রাঙামাটির পাহাড়ে গাছপালা কমে যাওয়া ও ভূমি ব্যবহার বদলে যাওয়াকে পাহাড়ধসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, রাঙামাটির পাহাড়ে জনসংখ্যার চাপ বেড়েছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ সেখানে বসবাস করছে। এতে ভূমির ওপর চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছিল। এ ছাড়া সড়ক যোগাযোগের জন্য পাহাড় কাটা হয়েছে। এতে পাহাড়ের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।
পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, ৬৪ দশমিক ৭২ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে রাঙামাটি পৌরসভা গঠিত। এর মধ্যে ৩২ বর্গকিলোমিটারই কাপ্তাই হ্রদ ও বসবাসের অনুপযোগী অঞ্চল (পাহাড়ের ঢাল)। ২০০১ সালে এই শহরে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৬৭ হাজার। যে বছর পাহাড়ধস হয়েছিল, সে সময় বসবাসরত জনসংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। এখন তা আরও বেড়েছে।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, রাঙামাটি পৌর এলাকার ৪ দশমিক ১০ শতাংশ এলাকা উচ্চ ভূমিধস ঝুঁকিতে। ১৯ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ এলাকা মাঝারি ঝুঁকিতে আছে। আর ৩৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ এলাকা নিম্ন ঝুঁকিতে। বাকি এলাকা মূলত জলাশয় বা কাপ্তাই হ্রদের অংশ।
বিভীষিকার সেই দিন ভুলতে পারেননি বাসিন্দারা
২০১৭ সালের জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ। টানা বৃষ্টি। থেমে থেমে কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি, বেশির ভাগ সময় ভারী বর্ষণ। যেন আকাশ ভেঙে পড়েছিল ওই সময়। এমন বৃষ্টিতে পৌরসভার ভেদভেদী, ভেদভেদীর পশ্চিম মুসলিম পাড়া, শিমুলতলী, নতুন পাড়া, মোনঘর, যুব উন্নয়ন—পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা বসতিগুলো এক রাতেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
ভেদভেদী পশ্চিম মুসলিম পাড়ায় মারা গিয়েছিল ৯ জন। পৌরসভার এই এলাকার বাসিন্দা মো. আলীম উদ্দিন বলেন, ওই দিনের ঘটনা এখনো ভুলতে পারেননি তাঁরা। বৃষ্টির তীব্রতা বাড়লেই মনে আতঙ্ক তৈরি হয়।
এই পাড়ার বাসিন্দা ৫১ বছর বয়সী আবদুল কুদ্দুস স্ত্রী রুমি আক্তারকে সেদিন হারিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘বর্ষার সময় টানা বৃষ্টি হলেই কখন আবার পাহাড়ধসে, সে আতঙ্ক কাজ করে। তারপরও ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাই না। নিজের ঘরের মতো শান্তি ওখানে পাই না। আবার আশ্রয়কেন্দ্রে গেলে ঘরের জিনিসপত্র চুরি হয়ে যায় কি না, সেই ভয়ও থাকে।’
ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে থামেনি বসতি
জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার তথ্য বলছে, রাঙামাটি পৌরসভায় ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল রয়েছে ২৯টি। চম্পানির মার টিলা, পশ্চিম মুসলিম পাড়া, চেংগির মুখ, আবদুল আলী একাডেমি–সংলগ্ন ঢাল, এসপি অফিস–সংলগ্ন ঢাল, মাতৃমঙ্গল এলাকা, কাঁঠালতলী মসজিদ কলোনি ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস–সংলগ্ন ঢাল উল্লেখযোগ্য। এসব পাহাড়ে কী পরিমাণ মানুষ বসবাস করে, তার তথ্য জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।
দুর্যোগ মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিস মিলিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র আছে ২৩টি। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসের শঙ্কা তৈরি হলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাসিন্দাদের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হয়। তবে অধিকাংশ লোক নিরাপদ স্থানে যায় না।
পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে থাকা শহরের পশ্চিম মুসলিম পাড়ার নুরুন্নাহার বেগম বলেন, ঘর–সংসার ফেলে কোথায় যাবেন? তাই ঝুঁকি জেনেও ঘরে থেকে যান। একই এলাকার বাসিন্দা চাকরিজীবী আলিম উদ্দিন জানান, ২০১৭ সালের আগে তাঁদের পাড়ায় পরিবার ছিল ২০টি। এখন হয়েছে ৬০টি। পাহাড় কেটেই ঘর তৈরি করা হচ্ছে। মানুষের বসবাস বাড়ছে। ঝুঁকি বাড়ছে। শহরের দক্ষিণ শিমুলতলী, নতুন পাড়া ও লোকনাথ মন্দির এলাকার চিত্র একই।
পাহাড়ধস রোধে যা করতে হবে
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক মো. ইকবাল সরোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, এত বড় একটি দুর্যোগ হওয়ার পরেও পাহাড় কাটা বন্ধ হয়নি। এখনো অবৈধভাবে পাহাড়ে ও পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে, যা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাহাড়ধস প্রতিরোধে করণীয় প্রসঙ্গে এই গবেষক বলেন, অবশ্যই পাহাড় কাটা ও বন উজাড় বন্ধ করতে হবে। যেসব পাহাড় আছে, সেখানে সবুজের আচ্ছাদন বৃদ্ধি করতে হবে। পাহাড়ের পাদদেশে ছোট জলাধার ও সিল্ট ট্র্যাপ (বালুর ফাঁদ) তৈরি করে তা নিয়মিত পরিচর্যা করতে হবে।
পাহাড়ধসকে জাতীয় দুর্যোগ নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে অধ্যাপক মো. ইকবাল সরোয়ার বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে পাহাড়ধসের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ে পানি চলাচলের পথ সব সময় বাধাহীন রাখতে হবে। পাহাড় ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত তদারকি দল গঠন করতে হবে।
ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় পরিকল্পনা প্রণয়ন করে সেগুলো বাস্তবায়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন গবেষক মো. ইকবাল সরোয়ার। তিনি বলেন, বৃষ্টি ও পাহাড়ধসের পূর্বাভাস যথাসময়ে দিতে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিতে হবে এবং পাহাড়ে পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে।