মহাসড়কে চলাচলকারী মোটরসাইকেল আরোহী বেসরকারি চাকরিজীবী মো. আবদুল্লাহ বলেন, ঝড়বৃষ্টির কারণে সড়ক নরম হয়ে গেছে। চাকা দেবে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে মোটরসাইকেলের চাকা পিছলে যাচ্ছে। দুর্ঘটনার শঙ্কা নিয়ে তাঁর পথ চলতে হচ্ছে।

ভোলা সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বরিশাল-ভোলা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ভোলা অংশের ১৬ কিলোমিটার এবং পরান তালুকদার-ভোলা-চরফ্যাশন বাবুরহাট আঞ্চলিক মহাসড়কের ৯৪ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্ত করার কাজ চলছে। এসব সড়কের প্রস্থ ছিল ১৮ ফুট। দুই পাশে ৬ ফুট করে ১২ ফুট বাড়িয়ে ৩০ ফুটে উন্নীত করার কথা রয়েছে। বরিশাল-ভোলা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ভোলা অংশের ১৬ কিলোমিটার প্রশস্ত করার কার্যাদেশ হয়েছে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৪ কোটি টাকা। দ্বিতীয় মেয়াদে কাজ শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরের জুনে। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ২ বছর ৮ মাস যাওয়ার পর কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৪০ শতাংশ।

সড়ক নির্মাণের কাঁচামালের দাম কয়েক গুণ বাড়ার দোহাই দিয়ে ব্যয় বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন ঠিকাদারেরা। 
মো. নাজমুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী, ভোলা সড়ক বিভাগের 

এদিকে পরান তালুকদার-ভোলা-চরফ্যাশন-চরমানিকা বাবুরহাট আঞ্চলিক মহাসড়কের মোট দৈর্ঘ্য ১১৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৯৪ কিলোমিটারের সংস্কারকাজ চলছে। সড়কের দুই পাশ প্রশস্ত করা ছাড়াও ৪৩টি কালভার্ট ও চারটি সেতু পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে। ৮টি প্যাকেজে মোট ৮৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কারকাজ চলছে। এর মধ্যে কালভার্ট ও সেতু পুনর্নির্মাণের কাজ অন্তর্ভুক্ত আছে। এসব কাজের কার্যাদেশ হয়েছে ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে। কাজ শেষ হওয়ার মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বর। সরকারি হিসাবে কাজ শেষ হয়েছে ৫৫ শতাংশ। ধীরগতিতে এসব কাজ চলায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

মোটরসাইকেলে নিয়মিত চলাচলকারী উন্নয়নকর্মী মো. মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মোটরসাইকেলে চলতে চলতে হঠাৎ ধুলার মধ্যে হারিয়ে গেলাম। চারপাশ তো দূরে থাক, নিজেকে নিজে দেখা যায় না।’

ভোলা-চরফ্যাশন সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী সরকারি চাকরিজীবী রাবেয়া বেগম। তিনি বলেন, সড়কের বেহালের কারণে সোয়া এক ঘণ্টার পথ আড়াই ঘণ্টা লেগে যায়। এ কারণে দুই ঘণ্টা আগে ঘর থেকে বের হতে হচ্ছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে বরিশাল-ভোলা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ভোলা অংশে দেখা যায়, সড়কের দুই পাশে গর্ত করে ইট-বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। এখনো কার্পেটিং হয়নি। পাথর-বালুর মিশ্রণ (ম্যাকাডম) সড়কে ফেলা হয়েছে। কোথাও কোথাও গর্ত আছে।

গত শুক্রবার ও গতকাল শনিবার চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ আইচা থেকে লালমোহন পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার সড়কের পিচের কার্পেটিং তোলা হয়েছে। সেখানে পাথর বালুর মিশ্রণ (ম্যাকাডম) ফেলা হয়েছে। পাথর-বালুর সমানুপাত না হওয়ায় ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের আঘাত ও বৃষ্টির পানিতে সড়কের মধ্যে বড় বড় গর্ত হয়ে গেছে। কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু কাঁদা-মাটির সড়কের মতো অবস্থা। কোথাও কোথাও সড়কের পাড় ভেঙে গেছে। প্রায় দেড় বছর ধরে সড়কের ওপরের ভালো কার্পেটিং তুলে পাথর ও বালু ফেলে রাখা হয়েছে। এতে সড়কের অবস্থা হয়েছে বেহাল। ঝড় ও বৃষ্টির পানিতে গাড়ির চাকা দেবে যায়।

নিয়মিত চলাচলকারী মো. শামীম, মাহাবুবা বেগম, মনিরুল ইসলাম ও জান্নাতুল ফেরদৌস জানালেন, সড়ক বেহালের কারণে ঝাঁকুনি ও গাড়ির শব্দে কানে তালা লেগে যায়। ধুলাবালু ও প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ তাঁরা।

বাসচালক মো. হিরণ, মো. বাচ্চু, মো. বাপ্পি জানিয়েছেন, রাস্তা ভাঙার কারণে গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় বেশি লাগার পাশাপাশি তেল খরচ বেশি লাগছে। দুর্ঘটনার ভয় থাকে। যাত্রীদের গালাগালও শুনতে হচ্ছে।

সড়ক সংস্কারের বেশির ভাগ কাজ পেয়েছে হাসান টেকনো এম এ ইঞ্জিনিয়ারিং নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান মো. আকতার হোসেন বলেন, যখন তাঁরা ভোলা-চরফ্যাশন-বাবুরহাট আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্ত করার কাজ পেয়েছেন, তখন রড, সিমেন্ট, পাথর, বালু, বিটুমিনের দর যা ছিল, কাজ শুরু করার পর তা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। তাই ব্যয় আরও ৪০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।

ভোলা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, করোনার প্রাদুর্ভাব, মামলা, সড়কের দুই পাশের গাছ বিক্রি, বৈরী আবহাওয়া ও বিদ্যুতের খুঁটি সরানোর কারণে কাজের মেয়াদ ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সড়ক নির্মাণের কাঁচামালের দাম কয়েক গুণ বাড়ার দোহাই দিয়ে ব্যয় বাড়ানো দাবি জানিয়েছেন ঠিকাদারেরা। বিষয়টি অধিদপ্তরে জানানো হয়েছে। তবে শুষ্ক মৌসুমে কাজ শেষ হওয়ার আশা করছেন তিনি।