অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে বিজয় সরকারের বসতভিটা, হতাশ দর্শনার্থীরা

নড়াইলে বসতভিটায় অবস্থিত ‘বিজয় সংসদ’ কার্যালয়ের দেয়ালে বিজয় সরকারের ছবি। সম্প্রতি সদর উপজেলার ডুমদি গ্রামেছবি : প্রথম আলো

‘তুমি জানো না রে প্রিয়, তুমি মোর জীবনের সাধনা’, ‘এ পৃথিবী যেমন আছে, তেমনই ঠিক রবে, সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে’, ‘আমার পোষা পাখি উড়ে যাবে সজনী, একদিন ভাবি নাই মনে’—কালজয়ী এসব গানের রচয়িতা চারণ কবি বিজয় সরকারের ১২৩তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯০৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদর উপজেলার ডুমদি গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার ও গায়ক ছিলেন।

প্রকৃত নাম বিজয় অধিকারী হলেও সুর ও সংগীতে অবদানের তিনি জন্য ‘সরকার’ উপাধি লাভ করেন। তাঁর বাবার নাম নবকৃষ্ণ অধিকারী ও মা হিমালয়া দেবী।

স্থানীয় মানুষের মতে, ‘মুক্তিযুদ্ধের গানসহ প্রায় ১ হাজার ৮০০ গান লিখেছেন তিনি। ১৯৮৫ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তাঁর মৃত্যু হয়। এর ২৮ বছর পর ২০১৩ সালে শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মরণোত্তর একুশে পদক পান তিনি।

বিজয় সরকারের গানের সংরক্ষণ ও প্রচার-প্রসারে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো উদ্যোগ নেই বলে জানান স্থানীয় শিল্পী ও ভক্তরা। বিজয় সরকারের গানের চর্চা করেন প্রতুল হাজরা। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির অন্যতম ধারক–বাহক কবিয়াল বিজয় সরকার। তাঁর গান প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে আমরা বা এই দেশ কতটা ভূমিকা রেখেছে, আমি ঠিক জানি না। তবে ব্যাপক ভূমিকা রাখা উচিত বলে মনে করি।’

বিজয়ভক্ত ফরহাদ খান বলেন, ‘বিজয় সরকারকে যতটা গবেষণা বা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিজয় সরকারের চেতনা-আদর্শ নিয়ে যতটা কাজ করা প্রয়োজন, সেই দিকটা বেশ খানিকটা পিছিয়ে আছে। সরকার বা শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে বিজয় সরকারকে নিয়ে গবেষণা ও তাঁর গানকে যুগ থেকে যুগান্তরে বাঁচিয়ে রাখতে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে আরও কাজ করা প্রয়োজন।’

এদিকে বিজয় সরকারের মৃত্যুর পর থেকে অযত্ন–অবহেলায় পড়ে আছে ডুমদিতে অবস্থিত বসতভিটা। সম্প্রতি সরেজমিনে এক বিকেলে দেখা যায়, ফাঁকা বিলের মধ্যে অবস্থিত বসতভিটার চারপাশে কোনো সীমানাপ্রাচীর নেই। অনেকটা অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে বসতভিটা। উত্তর পাশে দুই কক্ষবিশিষ্ট ছোট ঘরটির সামনে একটা মন্দির, সেখানে বিজয় সরকারের ছবিতে মালা দিয়ে পূজা–অর্চনা করেন ভক্তরা।

ঘরের বারান্দায় গিয়ে দেখা যায়, একটি কক্ষের দরজা খোলা পড়ে আছে। দরজাটি উইপোকায় ধরেছে। কক্ষের ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায়, কেউ সেখানে ধান রেখেছেন। মাকড়সার জাল সরিয়ে আরেক কক্ষে তাকাতে চোখে পড়ে একটি খাট ও বাক্স, অযত্নে পড়ে নষ্ট হচ্ছে।

বসতভিটার দক্ষিণ পাশে ‘বিজয় সংসদ’ নামে ছোট একটি কার্যালয়, তার সামনে বিজয় সরকারের একটি ছবি রয়েছে। পাশেই চারপাশ খোলা আধা পাকা একটি দোচালা ঘর। এটি নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। তবে তাতেও বিভিন্ন জিনিসে ঠাসা। স্থানীয় এক যুবক প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিজয় সরকারের বাসস্থান অবহেলিত, নাজুক অবস্থায় পড়ে আছে। দেখভাল করার কোনো ব্যক্তি নেই। কেউ গুরুত্বসহকারে দেখে না।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এখানে মানুষ এসে হতাশ হয়। এখানে একটু বসার ব্যবস্থা নেই, পানির ব্যবস্থা নেই। আমি প্রশাসনের প্রতি সবিনয় নিবেদন করব, যেন তারা এটা গুরুত্বসহকারে দেখে।’

বিকেল গড়াতেই সেখানে আসেন কয়েকজন দর্শনার্থী। তাঁরা গুণী চারণ কবির বসতভিটার এমন পরিণতি দেখে হতাশা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তাঁরা সরকারের কাছে নানা দাবি তুলে ধরেন। দর্শনার্থী শুভ সরকার ও কৃপাচার্য বিশ্বাস বলেন, ‘বসতবাড়িতে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করে সুরক্ষিত করতে হবে। সরকারের তরফ থেকে দেখভালের লোক রাখাও প্রয়োজন। এ ছাড়া একটি স্মৃতি সংগ্রহশালা নির্মাণ করা গেলে দূরদূরান্তের মানুষ এসে তা দেখতে পাবে।’

বিজয় সরকারের বাড়িতে যাওয়ার একমাত্র সড়কটি বেহাল। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘বিজয় সড়ক’ নামে পরিচিত। স্থানীয় এক ভ্যানচালকসহ কয়েকজন বলেন, সড়কটি ভেঙে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে রাস্তাটি তলিয়ে যায় পানিতে। এতে ভুগতে হচ্ছে দর্শনার্থীসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের।

এ ব্যাপারে নড়াইলের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল ছালাম বলেন, ‘এখানকার জন্য আলাদা করে মন্ত্রণালয়ের কোনো বরাদ্দ আমাদের কাছে নেই। কিছুদিন আগে আমরা বিজয় সরকারের বাড়িতে গিয়েছিলাম। ওখানে একটু জায়গা আছে, তাতে পুরোনো একটি ঘর আছে। সেটাকে সংস্কারের উদ্যোগ নিচ্ছি। কিছুদিনের মধ্যে বাড়ির চারপাশে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিজয় সরকারের স্মৃতি ধরে রাখতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেষ্টা করছি।’