অযত্ন–অবহেলায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে পাবনার বেড়া উপজেলার জমিদারদের প্রাচীন নিদর্শনগুলো। হাটুরিয়া গ্রামে সম্প্রতি
ছবি: প্রথম আলো

পাবনার বেড়া উপজেলার প্রত্যন্ত এক গ্রাম হাটুরিয়া। একসময় এ গ্রামে একসঙ্গে ১৩ জন জমিদার বাস করতেন। বৃহত্তর পাবনা জেলার বাইরেও বিস্তৃত ছিল তাঁদের জমিদারি। একসময় এ গ্রামটি ছিল বর্ণাঢ্য। তবে জমিদারদের নির্মাণ করা অট্টালিকা, পুকুরসহ নানা স্থাপনা এখন কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে। অল্প কিছু স্থাপনা টিকে থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো বিলীন হওয়ার পথে। 

বেড়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত এলাকায় হাটুরিয়া গ্রামের অবস্থান। স্থানীয় ইতিহাসবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১০০ বছর আগে এই গ্রাম ও এর পাশের এলাকা ছিল বৃহত্তর পাবনা জেলার অন্যতম অভিজাত এলাকা ও বাণিজ্যকেন্দ্র। সুদূর কলকাতাতেও ছিল যমুনাপারের এই গ্রামের সুখ্যাতি। গ্রামের পাশের নাকালিয়া নৌবন্দর থেকে কলকাতার মধ্যে সরাসরি স্টিমার যাতায়াত করত। তা ছাড়া এ গ্রাম থেকে নৌপথে দেশের বিভিন্ন স্থানে খুব সহজে যাতায়াত করা যেত। ফলে এসব কারণে শুধু জমিদারেরাই নন, সম্ভ্রান্ত ও বিত্তশালী ব্যক্তিরা এখানে বাস করতেন। 

বেড়া মনজুর কাদের মহিলা কলেজের ইতিহাস বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন জানান, তাঁর বাবা মমতাজ উদ্দিন সিরাজগঞ্জের চৌহালী এলাকার এক জমিদারের নায়েব ছিলেন। তাঁর মুখে হাটুরিয়ার জমিদারদের অনেক কাহিনি তিনি শুনেছেন। এ ছাড়া তিনি নিজেও জমিদারদের কিছু কিছু তথ্য সংগ্রহ করছেন। এ এলাকায় একসঙ্গে এতজন জমিদারের বাস করার বিষয়টি দেশের অন্য কোথাও ছিল বলে তাঁর জানা নেই।

■ ১৯০০ সালের পর থেকে গ্রামটিতে বাড়তে থাকে জমিদারের সংখ্যা। 

■ জমিদারদের অট্টালিকাগুলো কালের আবর্তে ধ্বংস ও বিলীন হয়ে গেছে।

স্থানীয় ইতিহাসবিদদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, ১৯০০ সালের পর থেকে গ্রামটিতে বাড়তে থাকে জমিদারের সংখ্যা। একপর্যায়ে গ্রামে বসবাসকারী জমিদারের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১৩ জনে। তাঁরা হলেন প্রমথনাথ বাগচী, কাঞ্চিনাথ বাগচী, উপেন্দ্রনাথ বাগচী, ভবানীচরণ বাগচী, কালীসুন্দর রায়, ক্ষীরোদ চন্দ্র রায়, সুরেণ চন্দ্র রায়, সুধাংশ মোহন রায়, শক্তিনাথ রায়, বঙ্কিম রায়, ক্ষুদিরাম পাল, যদুনাথ ভৌমিক ও যতীন্দ্রনাথ ভৌমিক। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিদের মতে এসব জমিদারদের একসঙ্গে হাটুরিয়া গ্রামে বসবাসের সময়টা ছিল ১৯১৫ সালের পর থেকে। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা এ গ্রাম থেকেই পরিচালনা করতেন তাঁদের জমিদারি।

 জমিদারদের প্রত্যেকেই বাস করতেন প্রাচীর ঘেরা অট্টালিকায়। অট্টালিকার পাশে বেশির ভাগেরই ছিল সান বাঁধানো বড় পুকুর অথবা দিঘি। গ্রামটি ঘুরে দেখা যায়, সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে কয়েকটি পুকুর ভরাট হয়ে গেলেও এখনো রয়েছে পাঁচ-ছয়টি পুকুর। তবে দখল ও দূষণের কারণে সেগুলোর অবস্থা করুণ। 

পুকুরগুলোর চেয়েও জমিদারদের অট্টালিকাগুলোর অবস্থা আরও বেশি খারাপ। কালের আবর্তে সেগুলোর বেশির ভাগই ধ্বংস ও বিলীন হয়ে গেছে। মালিকানা বদলের পর কিছু অট্টালিকা ভেঙে ফেলা হয়েছে। তবে কালের সাক্ষী হিসেবে গ্রামে এখনো রয়ে গেছে দুই তিনটি অট্টালিকার অংশবিশেষ। বসবাসের অনুপযোগী হওয়ায় জরাজীর্ণ এসব অট্টালিকা এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। জমিদারদের অট্টালিকার জরাজীর্ণ অংশসহ জায়গাগুলো অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে ইজারা নিয়ে বসবাস করছেন কয়েকজন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বেশির ভাগ অট্টালিকার জায়গায় গড়ে উঠেছে নতুন ঘরবাড়ি। জমিদার ক্ষীরোদ চন্দ্র রায়ের সুদৃশ্য প্রধান ফটক ও ভবনটি ধ্বংসের মুখেও জরাজীর্ণ অবস্থায় টিকে রয়েছে। অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে ইজারা নিয়ে সেখানে বংশপরম্পরায় বসবাস করছেন দীপক গোস্বামী (৫০)। তিনি জানান, এখন আর এসব ভবনে বসবাসের উপায় নেই। তাই ভবনের পাশে ঘর তুলেছেন তাঁরা। অনেকেই জমিদারের প্রাচীন নিদর্শন দেখতে আসেন। তবে এর ধ্বংসাবশেষ দেখে হতাশ হয়ে ফিরে যান তাঁরা। তাই এই গ্রামে জমিদারদের যতটুকু প্রাচীন নিদর্শন আছে, তা সংরক্ষণের দাবি জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, অট্টালিকার এক স্থানে জমিদার ক্ষীরোদ চন্দ্র রায়ের বাবা উমেশ চন্দ্র রায়ের নাম ও এ ভবনের নির্মাণকাল ১৯১১ সাল খোদাই করা ছিল। ছেলেবেলায় তিনি এখানে সুপরিসর জলসাঘরসহ আরও অনেক কক্ষ দেখেছেন। কিন্তু এখন আর সেগুলো কিছুই নেই। 

হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুল হামিদ সরকার বলেন, ১৩ জমিদারের প্রাচীন নিদর্শনের বেশির ভাগই ধ্বংস ও বিলীন হয়ে গেছে। যতটুকু অবশিষ্ট আছে তা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেন তিনি। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহা. সবুর আলী বলেন, হাটুরিয়া গ্রামে একসঙ্গে ১৩ জমিদারের বসবাসের বিষয়টি শুনেছেন। তাঁদের প্রাচীন নিদর্শনগুলো সংরক্ষণের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।