একটি হাতি প্রতিদিন কত কেজি খাবার খায়, মিলছে কি বনে

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনে হাতির খাদ্য ও আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ কেজি খাবার প্রয়োজন হলেও বাঁশঝাড়, ঝোপঝাড় ও প্রাকৃতিক উদ্ভিদ কমছে। সংকুচিত করিডরের কারণে খাবারের সন্ধানে হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে, বাড়ছে মানুষ-হাতি সংঘাত। বিশেষজ্ঞরা প্রাকৃতিক বন ও করিডর রক্ষা, খাদ্য উদ্ভিদ সংরক্ষণ এবং হাতির নতুন জরিপের তাগিদ দিয়েছেন।

বাঁশখালীর ইকোপার্কে ঘুরে বেড়াচ্ছে বন্যহাতির দলছবি: বাংলাদেশ বন গবেষণাগার ইনস্টিটিউটের সৌজন্যে।

একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ কেজি খাবার প্রয়োজন। সেই খাবার খুঁজতেই দিনের ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা কেটে যায়। ঘাস, বাঁশ, বেত, নলখাগড়া, লতাপাতা, গুল্ম, কচি ডাল, গাছের বাকল, বুনো কলা ও নানা ধরনের ফলসহ ১০০ থেকে ৫০০ প্রজাতির উদ্ভিদ খায় প্রাণীটি।

কিন্তু যে বন একসময় এই বিপুল খাবারের জোগান দিত, সেখান থেকে হারিয়ে যাচ্ছে হাতির খাদ্য। কমছে বাঁশ ও ঝোপঝাড়। দখল হচ্ছে বনভূমি। ফলে খাবারের খোঁজে বনের সবচেয়ে বড় প্রাণীটি নেমে আসছে মানুষের ফসলের মাঠে।

লোহাগাড়ার চুনতির কৃষক আবু সিদ্দিক সেই বাস্তবতার একজন সাক্ষী। তিন মাস আগে এক সন্ধ্যায় তিনটি বন্য হাতি তাঁর জমিতে নেমে আসে। কয়েক মাস ধরে পরিচর্যা করা লাউ, মুলা, কলাসহ নানা ফসল কয়েক মিনিটের মধ্যে মাড়িয়ে চলে যায় হাতির দল। তবে হাতিকে দোষ দেন না তিনি।

আবু সিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, আগে এত ঘন ঘন হাতি আসত না। এখন বনে খাবার কমে গেছে। তাই লোকালয়ে চলে আসে। বনে হাতির খাবার থাকলে হয়তো মানুষের জমিতে নামত না।

আবু সিদ্দিক বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে চুনতি সংরক্ষিত বন। গত জুলাইয়ে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, হাতির নিয়মিত খাবারের জায়গা হিসেবে পরিচিত একটি বাঁশবাগানের প্রায় এক একর অংশ উজাড় করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে হাতির বিষ্ঠা ও পায়ের ছাপ দেখা যায়। বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বুনো হাতির দল সেখানে কচি বাঁশ খেতে আসত। সেই বাঁশঝাড়েরই একাংশ কেটে ফেলা হয়েছে।

চুনতির এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন বনে কমছে হাতির খাবারের উৎস। সংকুচিত হচ্ছে আবাসস্থল ও চলাচলের পথ। বন বিভাগের নথি এবং গবেষকদের মতে, বনের ভেতরে স্বাভাবিক খাবারের ঘাটতি হাতির লোকালয়ে নেমে আসার অন্যতম কারণ।

বাংলাদেশের বনে থাকা এশীয় হাতির বৈজ্ঞানিক নাম ইলিফাস ম্যাক্সিমাস। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ—আইইউসিএন প্রজাতিটিকে বিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। বাংলাদেশসহ এশিয়ার ১৩টি দেশে এ হাতি টিকে আছে।

বন বিভাগ ও আইইউসিএনের জরিপ অনুযায়ী, দেশে স্থায়ী বন্য হাতি রয়েছে ২১০ থেকে ৩৩০টি। এগুলোর অধিকাংশের বাস চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনে। তবে এই হিসাবও হালনাগাদ নয়।

প্রতিদিন ২০০ কেজি খাবারের খোঁজ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ তাঁর ‘বিপন্ন হাতির কথা’ বইয়ে লিখেছেন, একটি হাতির খাদ্যতালিকা নির্ভর করে তার আবাসস্থলের ওপর। বনে উদ্ভিদের বৈচিত্র্য বেশি থাকলে খাবারও বেশি মেলে। বৈচিত্র্য কমে গেলে অল্প কয়েক ধরনের উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করতে হয়।

বইটিতে বলা হয়েছে, একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির দিনে ১৫০ থেকে ২০০ কেজি খাবারের পাশাপাশি ২০০ লিটারের বেশি পানির প্রয়োজন হতে পারে। তাই শুধু বড় গাছে ঢাকা বন হাতির জন্য যথেষ্ট নয়। দরকার বাঁশঝাড়, বেত, নলখাগড়া, লতাপাতা, গুল্ম, বুনো কলা, খোলা জায়গা, ছড়া ও জলাশয় সমৃদ্ধ বৈচিত্র্যময় বন।

একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন ১৫০-২০০ কেজি খাবার প্রয়োজন। বনে এই খাবার কমে আসছে। এ জন্য হাতির পাল কৃষিজমিতে নেমে আসছে
ছবি: বাংলাদেশ বন গবেষণাগার ইনস্টিটিউটের সৌজন্যে।

জানতে চাইলে অধ্যাপক এম এ আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, হাতি বড় গাছের ঘন বন খুব একটা পছন্দ করে না। তাদের প্রয়োজন লতাপাতা, বাঁশ, কলাগাছ, নলখাগড়া ও ঝোপঝাড়। কিছু গাছ, কিছু খোলা জায়গা এবং পানির উৎস আছে—এমন বন হাতির জন্য বেশি উপযোগী।

কিন্তু দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বনগুলোতে সেই পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বন থেকে স্থানীয় মানুষ বাঁশ, বেত, লতাপাতা ও অন্যান্য উদ্ভিদ সংগ্রহ করছেন। নির্বিচার চরানো হচ্ছে গরু-ছাগল। কোথাও জঙ্গল পরিষ্কার করে লাগানো হচ্ছে একক প্রজাতির বাণিজ্যিক গাছ। কোথাও গড়ে উঠছে বসতি, কৃষিজমি ও নানা স্থাপনা।

বাংলাদেশের বনে থাকা এশীয় হাতির বৈজ্ঞানিক নাম ইলিফাস ম্যাক্সিমাস। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ-আইইউসিএন প্রজাতিটিকে বিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। বাংলাদেশসহ এশিয়ার ১৩টি দেশে এ হাতি টিকে আছে। বন বিভাগ ও আইইউসিএনের জরিপ অনুযায়ী, দেশে স্থায়ী বন্য হাতি রয়েছে ২১০ থেকে ৩৩০টি। এগুলোর অধিকাংশের বাস চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনে। তবে এই হিসাবও হালনাগাদ নয়।

স্যাটেলাইটভিত্তিক বন পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের হিসাবে, ২০২০ সালে চট্টগ্রাম বিভাগে ১২ লাখ হেক্টর প্রাকৃতিক বন ছিল। ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এ বিভাগে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর বৃক্ষ আচ্ছাদন হারিয়েছে, যা ২০০০ সালের বৃক্ষ আচ্ছাদনের প্রায় ২০ শতাংশ। একই সময়ে আর্দ্র প্রাথমিক বন কমেছে প্রায় ৮ হাজার ৮০০ হেক্টর। তবে বৃক্ষ আচ্ছাদন হারানোর পুরোটা বন উজাড় নয়; এর মধ্যে বাগানের গাছ কাটা ও সাময়িক ক্ষতিও থাকতে পারে। তবু প্রাথমিক বন কমে যাওয়া এবং বনের অবক্ষয় হাতির খাদ্য ও আবাসের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

এম এ আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, হাতির আবাসস্থলে নতুন গাছ লাগানোর চেয়ে বিদ্যমান বন রক্ষা বেশি জরুরি। অনেক জায়গায় হাতির জঙ্গল পরিষ্কার করে বাগান তৈরি করা হচ্ছে। এতে খাবার কমে যায়। স্থানীয় মানুষ যাতে নির্বিচার বাঁশ, লতাপাতা ও অন্যান্য খাদ্য উদ্ভিদ সংগ্রহ করতে না পারেন, সেটি নিশ্চিত করা বন বিভাগের দায়িত্ব।
বন বিভাগের কার্যক্রমের বিষয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো বলেন, রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির, নতুন সড়ক নির্মাণ ও জনবসতি সম্প্রসারণের কারণে হাতির আবাসস্থল ও খাদ্যের উৎস সংকুচিত হচ্ছে। এ সংকট মোকাবিলায় চুনতি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যসহ বিভিন্ন এলাকায় বাঁশ ও হাতির খাদ্যোপযোগী দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানো হচ্ছে। পাশাপাশি জলাধারও তৈরি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের দখলদার উচ্ছেদ বা রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের মতো বড় বাস্তবতার সমাধান নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তাই হাতি সংরক্ষণে সমন্বিত সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।

বন বিভাগের হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবেও খাদ্যসংকটের কথা রয়েছে। প্রকল্পে হাতির খাদ্যোপযোগী উদ্ভিদ ও বাঁশ রোপণ, জলাধার খনন এবং কৃত্রিম লবণ ক্ষেত্র তৈরির পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে আবাসস্থলের অবক্ষয়, করিডর সংকুচিত হওয়া ও মানুষ-হাতি সংঘাতকে পরস্পর–সম্পর্কিত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

খাবারের খোঁজে পথে পথে বাধা

বনের এক অংশে খাবার কমে গেলে হাতির দল অন্য বনে চলে যায়। ঋতুবদলের সঙ্গে বদলে যায় তাদের খাদ্যের উৎসও। কোথাও কচি বাঁশ, কোথাও বুনো কলা, কোথাও নলখাগড়া, আবার কোথাও ছড়ার ধারে জন্মানো গুল্মের খোঁজে এক বন থেকে আরেক বনে যায় তারা। এই চলাচলের নির্দিষ্ট পথই হাতির করিডর; কিন্তু দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অনেক করিডর এখন আর আগের মতো খোলা নেই। কোথাও বসতি, কোথাও কৃষিজমি, কোথাও সড়ক ও রেললাইন হাতির পথ আটকে দিয়েছে। টেকনাফ-উখিয়া এলাকায় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির গড়ে ওঠার পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ করিডরও বন্ধ হয়ে গেছে। সীমান্তের বেড়া ও বিভিন্ন স্থাপনার কারণে মিয়ানমারের বনাঞ্চলের সঙ্গেও হাতির স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত হয়েছে। ফলে যে হাতির দল আগে প্রয়োজন হলে অন্য বনে গিয়ে খাবার সংগ্রহ করতে পারত, এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেই সুযোগ হারিয়েছে।

আইইউসিএনের জরিপের ভিত্তিতে দেশে ১২টি হাতির করিডর চিহ্নিত করা হয়েছিল; কিন্তু অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, এর অধিকাংশই এখন বাধাগ্রস্ত বা দখল হয়ে গেছে। এক দশকেও এসব করিডরের হালনাগাদ মূল্যায়ন হয়নি। তাঁর মতে, হাতি এখন কোন পথ দিয়ে চলাচল করছে, কোথায় নতুন করিডর তৈরি হয়েছে কিংবা কোন পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে—এসব জানতে জরুরি গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশে বর্তমানে কতটি হাতি রয়েছে, সেটিও নতুন করে গণনা করা দরকার।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ তাঁর ‘বিপন্ন হাতির কথা’ বইয়ে লিখেছেন, একটি হাতির খাদ্যতালিকা নির্ভর করে তার আবাসস্থলের ওপর। বনে উদ্ভিদের বৈচিত্র্য বেশি থাকলে খাবারও বেশি মেলে। বৈচিত্র্য কমে গেলে অল্প কয়েক ধরনের উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করতে হয়। বইটিতে বলা হয়েছে, একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির দিনে ১৫০ থেকে ২০০ কেজি খাবারের পাশাপাশি ২০০ লিটারের বেশি পানির প্রয়োজন হতে পারে।
প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত বই ‘বিপন্ন হাতির কথা’।

করিডর সংকুচিত হওয়ার প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনেও। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে হাতি। ধানখেত, কলাবাগান, সবজিখেত ও বসতঘরে হামলার ঘটনা বাড়ছে। সর্বশেষ গত ২৬ জুলাই রাতে আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের গুয়াপঞ্চক মাহমুদুল্লাহপাড়ায় একটি বন্য হাতি চারটি বসতঘর ভেঙে ফেলে এবং বিভিন্ন ফসল নষ্ট করে। ক্ষতিগ্রস্ত ওসমান গণি বলেন, রাতের অন্ধকারে হাতিটি ঘরের দেয়াল ভেঙে ওঠানের ফসল মাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘদিন পর হাতির ফিরে আসায় এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, বনে হাতির খাবার কমে যাওয়ায় লোকালয়ে নেমে আসার প্রবণতা বাড়ছে। তাঁর বিভাগের আওতাধীন এলাকায় গত তিন বছরে হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত ৪১৮ জনকে ২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করিডর হারানোর ক্ষতি শুধু সংঘাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এক বন থেকে আরেক বনে যেতে না পারলে হাতির দল ছোট ছোট এলাকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন একই দলের মধ্যে প্রজনন চললে জিনগত বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতির অভিযোজন ক্ষমতা ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। অর্থাৎ আজ যে সংকট খাবারের, সেটিই ভবিষ্যতে প্রজাতিটির টিকে থাকার সংকটে রূপ নিতে পারে।

হাতি বাঁচাবে বন

প্রতিবেদনের এ পর্যন্ত পড়ে একটি প্রশ্ন আসতেই পারে, হাতির খাবার কমে গেলে তাতে মানুষের কী আসে-যায়? এ প্রশ্নে বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতি একটি ‘কিস্টোন স্পিসিজ’ বা বাস্তুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি। বনের ভেতর চলাচলের সময় তারা ঝোপঝাড়ে পথ তৈরি করে, বুনো ফল খেয়ে দূরে দূরে বীজ ছড়িয়ে দেয়। তাদের তৈরি পথ ব্যবহার করে হরিণ, বন্য শূকরসহ অনেক বন্য প্রাণী চলাচল করে। তাই হাতির সংখ্যা কমে গেলে বা তারা কোনো বন থেকে হারিয়ে গেলে সেই বনের স্বাভাবিক পুনর্জন্ম ও জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই ক্ষতির প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেও ফিরে আসে। বন দুর্বল হলে পাহাড়ের মাটি ধরে রাখার ক্ষমতা কমে, ছড়া ও ঝিরির পানিপ্রবাহ ব্যাহত হয়, কমে জীববৈচিত্র্য। বাড়ে পাহাড়ধস, মাটি ক্ষয় ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি। তাই হাতির খাবার রক্ষা করা মানে শুধু একটি বিপন্ন প্রাণীকে রক্ষা করা নয়; বরং পুরো বন এবং সেই বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন ও জীবিকাও রক্ষা করা।

অধ্যাপক এম এ আজিজের মতে, হাতির আবাসস্থলে নতুন গাছ লাগানোর চেয়ে বিদ্যমান প্রাকৃতিক বন রক্ষা বেশি জরুরি। চুনতি, বাঁশখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় হাতির চলাচলের উপত্যকা ও নিচু জমিতে এখন ধান ও মাছের চাষ হচ্ছে। অনেক জায়গায় হাতির জঙ্গল পরিষ্কার করে বাণিজ্যিক বাগান করা হয়েছে। এতে হাতির খাদ্য দ্রুত কমছে। স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করে এসব এলাকা সংরক্ষণ করতে হবে এবং হাতির খাদ্যোপযোগী উদ্ভিদ নির্বিচার সংগ্রহ বন্ধ করতে হবে।

এম এ আজিজ আরও বলেন, বন বিভাগ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। হাতির আবাসের ওপর দিয়ে রেললাইন, মহাসড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মিত হচ্ছে, করিডর নষ্ট হচ্ছে; কিন্তু এসব রোধে বন বিভাগ অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে বন বিভাগের অনুমোদন ছাড়া হাতির আবাসস্থলে কোনো উন্নয়নকাজ না হয়।

বনে হাতি পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন। চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তিনি গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, হাতির জন্য উপযোগী বন বলতে শুধু গাছের সারি বোঝায় না। সেখানে বাঁশঝাড়, বেত, নলখাগড়া, ঝোপঝাড়, ছড়া ও জলাশয় থাকতে হবে। নানা কারণে বনভূমি কমে গেছে। হাতি বনের খাবার হারিয়ে নেমে আসছে লোকালয়ে। তাই হাতি বাঁচাতে নানা উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে দেশে বর্তমানে কতটি হাতি আছে, তারা কোন পথে চলাচল করছে এবং কোন আবাসস্থল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে—এসব তথ্য ছাড়া কার্যকর সংরক্ষণ পরিকল্পনা সম্ভব নয়।