তিন মাস ধরে মুনাফাসহ মূলধন ফেরত দিচ্ছে না ‘জিপিডিএল’, অভিযোগ রাজশাহীর গ্রাহকদের
রাজশাহীতে জেনারেশন প্রোপার্টিজ অ্যান্ড ডেভেলপার্স লিমিটেড (জিপিডিএল) নামের একটি আবাসন প্রতিষ্ঠান তিন মাস ধরে গ্রাহকদের মুনাফা–মূলধন ফেরত দিচ্ছে না। এতে প্রায় ২০ হাজার গ্রাহকের প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়েছে।
রাজশাহীর একাধিক গ্রাহকের অভিযোগ, ব্যাংকের চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটি মাঠপর্যায়ে বিনিয়োগ সংগ্রহ করে। জানানো হয়েছিল, টাকা জমা দিলেই কোম্পানির পরিচালক হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। এভাবে বর্তমানে পরিচালকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭০ জনে।
প্রতিষ্ঠানটির ঘোষণায় বলা হয়, এক লাখ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে গ্রাহককে প্রতি মাসে ৪ হাজার ২০০ টাকা মূলধন ফেরত ও ৩ হাজার ৩০০ টাকা মুনাফাসহ মোট ৭ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হবে। ২৪ কিস্তিতে পুরো অর্থ পরিশোধের কথা। এ হিসাবে ১ লাখ টাকায় বছরে প্রায় ৪০ হাজার টাকা মুনাফা পাওয়ার কথা, যা ব্যাংকের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।
তবে এ হারে মুনাফা দিতে হলে প্রতি মাসে প্রায় ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়। এ বিপুল আয়ের উৎস সম্পর্কে কোম্পানির কর্মকর্তাদের কাছ থেকে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
গ্রাহকদের সঙ্গে করা চুক্তিপত্রে কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা হিসেবে ‘উত্তরা, ঢাকা-১২৩০, সেক্টর-১, রোড-৭, হাউস-১৯’ উল্লেখ আছে। তবে সরবরাহ করা কাগজপত্রে কোনো নিবন্ধন নম্বর নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স বা পূর্বানুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে এ ধরনের আর্থিক লেনদেন করতে পারে না।
এ বিষয়ে জানতে জিপিডিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল হোসাইনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। একবার ফোন ধরে ব্যস্ততার কথা বললেও পরে আর যোগাযোগ করা যায়নি।
গত বৃহস্পতিবার কথা হয় রবিউল আহসান নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে, যিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে ৭০ জন পরিচালক ও প্রায় ২০ হাজার গ্রাহক আছেন, যাঁদের বিনিয়োগ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।
উচ্চ মুনাফার উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে রবিউল আহসান বলেন, তাঁদের ১২টি ‘স্মার্ট বাজার’ (চেইনশপ) আছে, যার মধ্যে তিনটি চালু হয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তরা ও মাসকাট প্লাজায় দুটি চেইনশপ চালু আছে।
রবিউল আহসানের দাবি, কোম্পানির পূর্বাচলে ২৭ কাঠা, গুলশানে ২৪ কাঠা এবং নেত্রকোনায় ৪ হাজার ৭০০ বিঘা জমি আছে। বসুন্ধরায় ২৬ কাঠা জমির ওপর ১৪ তলা হাসপাতালের কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পে বিনিয়োগের কারণেই তিন মাস ধরে মুনাফা ও মূলধন পরিশোধ বন্ধ। তবে ৩১ মার্চ থেকে পরিশোধ শুরু হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন আছে কি না, জানতে চাইলে কথিত ওই পরিচালক বলেন, বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে কথা বলতে। তবে পরে আবার ফোন করলে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এরই মধ্যে দুজন গ্রাহক নিজেদের বিনিয়োগ ফেরত চেয়ে ২৪ মার্চ আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। তাঁদের একজন আরিফা সুলতানা, যিনি গত মে মাসে ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। চলতি মার্চ পর্যন্ত তাঁর ১০ কিস্তি পাওয়ার কথা থাকলেও পেয়েছেন সাত কিস্তি। পরপর দুই কিস্তি না পেয়ে তিনি আইনি নোটিশ পাঠান।
নোটিশে বলা হয়েছে, ১৫ দিনের মধ্যে বকেয়া কিস্তিসহ সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ না করলে দণ্ডবিধির ৪০৩, ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় মামলা করা হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গ্রাহক বলেন, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন। তা না হলে সরল বিশ্বাসে বিনিয়োগ করা হাজারো মানুষ যেকোনো সময় সর্বস্বান্ত হতে পারেন।