‘অ পুত, তোর পরান কেনে গেইয়ি’
‘অ পুত, অ পুত, তোর পরান কেনে গেইয়ি।’ ছেলের লাশের পাশে বসে বিলাপ করতে করতে বলছিলেন মা হাছিনা আকতার। তাঁর একমাত্র ছেলে মো. হাসান বাবুর (১৬) রক্তমাখা লাশ পড়ে ছিল বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের মাঠে। খবর শুনেই ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়েছিলেন। ছেলেকে এমন রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করে ওঠেন তিনি। ছেলে নেই এই কথা কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না তাঁর। বারবার জানতে চাইছিলেন কীভাবে ছেলের প্রাণ গেল।
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার শোভনদণ্ডী ইউনিয়নের কুরানগিরি গ্রামের একটি বিল থেকে গতকাল রোববার রাতে হাসান বাবুর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
পুলিশ জানায়, মহিষ চরানো নিয়ে বিরোধের জের ধরে গতকাল বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে উপজেলার কুরানগিরি গ্রামের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চৈতার মার খালের ঢালে হাসান বাবুকে পিটিয়ে ও গলা টিপে হত্যা করা হয়। হাসান কুরানগিরি গ্রামের মো. আমিনুল হকের দ্বিতীয় স্ত্রী হাছিনা আকতারের একমাত্র ছেলে।
এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গতকাল দিবাগত রাত একটার দিকে পুলিশ মো. জয়নাল আবেদীন ওরফে লিমন (২০) নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আজ বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার লিমনকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাররাহুম আহমেদের আদালতে হাজির করা হলে তিনি ঘটনার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, হাসানকে কয়েকজন মিলে হত্যার পর খালে ফেলে দেন তাঁরা।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার লিমনসহ ৫ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন হাসান বাবুর মা হাছিনা আক্তার। মামলার অভিযোগে বলা হয়, কুরানগিরি গ্রামের আবুল কাসেমের ছেলে মো. লিমনসহ কয়েকজনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে হাসান বাবুদের পরিবারের বিরোধ ছিল। এর আগে তাঁরা হাসান ও তাঁর মা হাছিনাকে একাধিকবার হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। এ নিয়ে সালিস বৈঠকও হয়।
পুলিশ ও পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ দিন ধরে গ্রামের ফোরকান নামের এক ব্যক্তির ১১টি মহিষ পাশের বিলে চরাত কিশোর হাসান। গতকালও সকাল সাতটার দিকে মহিষগুলো নিয়ে কুরানগিরি গ্রামের চৈতার মার খালের কাছে বিলে ঘাস খাওয়াতে যায় সে। দুপুর ১২টার দিকে মাঠে মহিষ রেখে বাড়িতে এসে ভাত খেয়ে আবার মাঠে চলে যায়।
সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত সে বাড়ি না ফেরায় তাঁর মা ও স্বজনেরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে সন্ধ্যা সাতটার দিকে কুরানগিরি এলাকার চৈতার মার খালের ঢালের মধ্যে হাসান বাবুকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তাঁর শরীরে মাটি লেগে ছিল, নাক-মুখে রক্ত এবং গলায় একাধিক নখের জখম ছিল।
হাছিনার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে তাঁদের সহায়তায় ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসেন পরিবারের সদস্যরা। পরে রাত নয়টার দিকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়।
হাছিনা আকতার বলেন, তাঁর শ্বাসকষ্টের রোগ আছে। তাই ছেলে হাসান বাবু তাঁকে বেশি কাজ করতে দিত না। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গরম পানি দিত, চা-নাশতা করে খেতে দিত। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলেকে ফেলে আমি কীভাবে থাকব।’
হাছিনা আকতার জানান, হাসান বাবুর আগে তাঁর আরও দুটি ছেলে জন্মের পর মারা যায়। তাঁর আর কোনো সন্তান নেই। তাঁর অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি এর বিচার চান।
পটিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) যুযুৎসু যশ চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় গতকাল রাত ১২টার দিকে হাসান বাবুর মা হাছিনা আকতার বাদী হয়ে পটিয়া থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় একই বাড়ির আবুল কাসেমের ছেলে মো. লিমনসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও দুই থেকে তিনজনকে আসামি করা হয়েছে।