পা দিয়ে লিখে পরীক্ষা দিলেন কলি রানী

দুই হাত নেই, তবু থামেননি কাউনিয়া উপজেলার কলি রানী। পা দিয়ে লিখে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন তিনি। ছবি: প্রথম আলো

পরীক্ষার হলে সবাই যখন হাতে লিখছেন, তখন কলি রানী লিখছেন ডান পা দিয়ে। জন্ম থেকেই তাঁর দুই হাতের কবজি নেই। তবে শারীরিক এ সীমাবদ্ধতা তাঁর পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

রংপুরের কাউনিয়ার গদাই গ্রামের কলি রানী এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জানিয়ে দিলেন যে স্বপ্নের কাছে প্রতিবন্ধকতা বড় নয়। অন্যদের সঙ্গে পরীক্ষার কক্ষে বসে ছোট্ট একটি বেঞ্চে খাতায় লিখতে থাকা কলি রানীর এ লড়াই এখন অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা।

আজ বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া এইচএসসি পরীক্ষায় রংপুরের কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রে মানবিক বিভাগ থেকে অংশ নিয়েছেন কলি রানী। শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর পথ রুদ্ধ করতে পারেনি; বরং মনের শক্তি, অধ্যবসায় আর শিক্ষার প্রতি গভীর ভালোবাসাই হয়ে উঠেছে তাঁর সবচেয়ে বড় ভরসা।

কলি রানীর বাড়ি রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের গদাই গ্রামে। তিনি রুপালী রানীর মেয়ে। জন্ম থেকেই তাঁর দুই হাতের কবজি নেই। পরিবারের জন্য এটি ছিল বেদনার, কিন্তু কলি রানী সে বেদনাকে পরিণত করেছেন শক্তিতে। ছোটবেলা থেকেই অন্যদের মতো কলম হাতে তুলে নিতে পারেননি, কিন্তু তাই বলে শেখার ইচ্ছাটা থেমে থাকেনি। ধীরে ধীরে ডান পা দিয়ে লেখা শিখেছেন আর সেই পা-ই আজ তাঁর শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে বড় সহযাত্রী।

মৃত মনোরঞ্জন রায়ের ছয় সন্তানের মধ্যে কলি রানী সবার ছোট। অভাব, সীমাবদ্ধতা আর শারীরিক প্রতিবন্ধকতা—সব মিলিয়ে তাঁর পথটা সহজ ছিল না কখনোই। তবু তিনি স্বপ্ন দেখার সাহস হারাননি। পা দিয়ে লিখেই তিনি পঞ্চম শ্রেণিতে এ গ্রেড পেয়েছিলেন। পরে এসএসসিতেও কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন। এখন সেই অদম্য মেয়ে এইচএসসি পরীক্ষার খাতায়ও নিজের ভবিষ্যতের গল্প লিখছেন পা দিয়ে, কিন্তু মাথা উঁচু করে।

কলি রানী বলেন, শুধু লেখাপড়াই নয়, তিনি গানও করেন। গান গেয়ে ইতিমধ্যে অর্জন করেছেন একাধিক সম্মাননা ও স্মারক। প্রযুক্তির ব্যবহারেও তিনি পিছিয়ে নেই। পা দিয়েই চালাতে পারেন কম্পিউটার ও মুঠোফোন। মানুষের শক্তি শরীরে নয়, থাকে ইচ্ছাশক্তিতে। কলি রানী ইচ্ছাশক্তি দিয়েই উচ্চশিক্ষিত হবেন। তাঁর স্বপ্ন, একদিন বিসিএস ক্যাডার হয়ে মানুষের সেবা করবেন।

কলি রানীর ভাই মন্টু রাম রায় বলেন, জন্ম থেকেই তাঁর বোনের হাতের আঙুল নেই, হাত ছোট ও বাঁকা হওয়ায় হাতে কলম ধরা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই কলির ইচ্ছাশক্তি ছিল অসাধারণ। ধীরে ধীরে ডান পা দিয়ে লেখা শিখে নেন তিনি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রের কেন্দ্রসচিব রফিকুল ইসলাম বলেন, অন্যান্য শিক্ষার্থীর মতোই কলি রানী পরীক্ষার হলে বসে পা দিয়ে লিখছেন। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছে। কলির এ দৃঢ়তা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পাপিয়া সুলতানা বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কলি রানীকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। উপজেলা প্রশাসন চায়, তাঁর এই অদম্য অগ্রযাত্রা যেন কোনোভাবেই থেমে না যায়। তিনি যেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন, সে পথচলায় প্রশাসন তাঁর পাশে থাকবে।