পঁচা মিয়া বলেন, ‘প্রত্যেক দিনই বহু মানুষ আহে চা খাওয়ার ল্যাইগা। বেকেই (সবাই) দুই কাপ চা খাইবার চায়। এহন যদি আমি একজনরে দুই কাপ চা দিবার যাই তাইলে অন্যরা এক কাপও খাইবার পারে না। হের লাইগা আমারে কেউ লাখ টেহা (টাকা) দিলেও একজনের কাছে দুই কাপ চা বেচি না। দোকানের সামনেও লেইখ্যা দিছি। ম্যালা মানুষ দূর থাইক্যা চা খাইবার আহে। তাঁরা যদি কষ্ট কইরা আইয়া চা না পাইয়া ফিরা যায়, তাইলে তাঁদের কেমন লাগবো? হের লাইগা আমি এই সিস্টেম চালু করছি।’

পঁচা মিয়ার চায়ের দোকান সোমবার ছাড়া প্রতিদিন খোলা থাকে। প্রতি কাপ চায়ের দাম ২০ টাকা। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে শুরু করে যতক্ষণ দুধ থাকে ততক্ষণ চা বিক্রি চলতে থাকে। পঁচা মিয়া প্রায় ৭০ বছর ধরে চা বিক্রি করে সংসার চালিয়ে আসছেন। সম্প্রতি তাঁর চায়ের সুনাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে হয়। আগে স্থানীয়দের কাছে পঁচা মিয়ার চায়ের কদর ছিল। তবে এখন সেই কদর এখন ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের বিভিন্ন জেলায়। তাই প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষজন পঁচা মিয়ার চা পান করতে ছুটে যান লন্ডন বাজারে।

শ্রীপুর উপজেলার মাওনা বাজার থেকে লন্ডন বাজারে চা পান করতে এসেছেন আউলাদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘ফেসবুকে লন্ডন বাজারের এই চায়ের খবর পেয়েছিলাম। তাই মোটারসাইকেলে ১২ জন বন্ধু একসঙ্গে চা পান করতে এসেছি। এই দোকানের চা খুবই সুস্বাদু।’

default-image

উপজেলার নাবিরবহর গ্রামের বাসিন্দা ও ফুলবাড়িয়া আক্কেল আলী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতোয়ার রহমান বলেন, নাবিরবহর গ্রামটি ‘লন্ডন বাজার’ হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিল। আর এখন লন্ডন বাজার পঁচা মিয়ার চায়ের দোকানের কারণে বিখ্যাত হয়ে গেছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে চা পান করতে আসেন।

পঁচা মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ৭০ বছর ধরে তিনি চা বিক্রি করেন। এর মধ্যে প্রায় ২২ বছর তিনি রাজধানীর মহাখালীতে বিক্রি করেছেন। এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ফেরি করেও চা বিক্রি করতেন। তবে বছর দশেক আগে তিনি নিজ গ্রামে ফিরে এসে চায়ের দোকান দেন। চা বিক্রি করেই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছেন।

আমারে কেউ লাখ টেহা (টাকা) দিলেও একজনের কাছে দুই কাপ চা বেচি না। ম্যালা মানুষ দূর থাইক্যা চা খাইবার আহে। তাঁরা যদি কষ্ট কইরা আইয়া চা না পাইয়া ফিরা যায়, তাইলে তাঁদের কেমন লাগবো?
চা বিক্রেতা রহিম উদ্দিন ওরফে পঁচা মিয়া

চায়ের জনপ্রিয়তার কারণ জানতে চাইলে পঁচা মিয়া বলেন, ‘অনেকেই দুধে ভেজাল করে কিন্তু কিন্তু আমি সেটা কখনোই করি না। প্রতিদিন এক মণ দুধের চা বিক্রি করি। মাঝেমধ্যে এমনও দিন যায়, যখন দুই থেকে আড়াই মণ দুধও লাগে। চা বিক্রি করে কর্মচারীদের বিল দিয়ে দিনে ভালো লাভ থাকে। এটা দিয়েই আমার সংসার চলে। এখন বয়স হয়েছে তাই বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। যার কারণে নাতি দেলোয়ার সহযোগিতা করে।’

শুরুতে এক কাপ চা বিক্রি করে পঁচা মিয়া পেতেন ১০ পয়সা। এরপর চার আনা, আট আনা, এক টাকা—এভাবে বাড়তে বাড়তে এখন পঁচা মিয়ার এক কাপ চায়ের দাম ২০ টাকা। চা বিক্রি ছাড়া অন্য কোনো পেশা টানেনি তাঁকে। বর্তমানে প্রতি মাসে খরচ বাদে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় হয় বলে জানালেন পঁচা মিয়া। এ ছাড়া শুক্রবার বা বিশেষ কোনো ছুটির সময় এক দিনে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকার চা বিক্রি করেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চা বিক্রি করে যেতে চান তিনি।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন