ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতাল
ব্যবহৃত না হওয়ায় নষ্ট সোয়া কোটি টাকার যন্ত্রপাতি
চিকিৎসকসংকটের কারণে সাড়ে সাত বছরের বেশি সময় ধরে চোখের সব ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ আছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসক সংকটের কারণে সাড়ে সাত বছরের বেশি সময় ধরে চোখের সব ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ আছে। এর মধ্যে ব্যবহৃত না হওয়ায় চক্ষু বিভাগের প্রায় সোয়া কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতিও নষ্ট হয়ে গেছে। ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে বন্ধ আছে ছয় শয্যার চক্ষু ওয়ার্ড ও অস্ত্রোপচার কক্ষ (ওটি)।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চক্ষু বিভাগে পরীক্ষার জন্য পাঁচ ধরনের যন্ত্রপাতি আছে, যার মধ্যে পাঁচটিই নষ্ট হয়ে গেছে। অস্ত্রোপচার কক্ষে থাকা ১৭ ধরনের যন্ত্রপাতির ১৩টিই নষ্ট এবং চক্ষু বহির্বিভাগে থাকা ১৬ ধরনের যন্ত্রপাতির ৬টিই নষ্ট।
সম্প্রতি হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা জেলার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর গ্রামের বাসিন্দা আজিজ মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডান চোখে ছানি পড়ছে, ডাক্তার কইছে অপারেশন লাগব। কিন্তু সদর হাসপাতালে অপারেশন বন্ধ। বেসরকারি হাসপাতালে গেলে তো ম্যালা টেহা লাগব।’
নেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
হাসপাতালের প্রশাসনিক শাখা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের পর থেকে ন্যাশনাল আই কেয়ারের আওতায় হাসপাতালে চোখের ছানির অস্ত্রোপচার, চশমাজনিত সমস্যা, বহির্বিভাগ (ওপিডি) ব্যবস্থাপনা, লেজার চিকিৎসা, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি রোগনির্ণয়সহ চোখের বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা দেওয়া হতো। ওই সময় হাসপাতালে প্রতি মাসে দুই শতাধিক রোগীর অস্ত্রোপচার করা হতো। কিন্তু এখন সেগুলোর কিছু হয় না।
২০১৪ সালের ১৫ অক্টোবর চক্ষু বিভাগে সিনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন ইয়ামলি খান। ২০১৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর পদোন্নতি পাওয়ায় তাঁর বদলি হয়। এর দেড় বছর পর চক্ষুবিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আল আমিন এখানে যোগ দেন। কিন্তু যোগদানের ১৫-২০ দিনের মধ্যে তিনিও বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান। এর পর থেকে হাসপাতালের চক্ষুবিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট। হাসপাতালে কনিষ্ঠ চক্ষুবিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ চক্ষুবিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দুটি পদ সাড়ে সাত বছরের বেশি সময় ধরে শূন্য পড়ে আছে।
২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত চোখের কোনো চিকিৎসকই ছিলেন না। দীর্ঘ এই সময় মেডিক্যাল অফিসার দিয়ে চক্ষু বিভাগের চিকিৎসাসেবার কাজ চালানো হয়। ব্যবহারের অভাবে অনেক যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে।
বর্তমানে চক্ষু বহির্বিভাগে রোগীর চোখের দৃষ্টিশক্তি দেখা, চোখের রোগনির্ণয়, চোখের ছানি রোগী বাছাই, চশমার পাওয়ার দেখা হয়। প্রতিদিন ১৮০ থেকে ২৫০ রোগীকে সেবা দেওয়া হয়।
২০২৩ সালের এপ্রিলে মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে যোগ দেন চক্ষু চিকিৎসক ওবায়দুল হক। গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদে পদোন্নতি পান। বর্তমানে বিভাগটির একমাত্র চিকিৎসক তিনি। ওবায়দুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত চোখের কোনো চিকিৎসকই ছিল না। দীর্ঘ এই সময় মেডিক্যাল অফিসার দিয়ে চক্ষু বিভাগের চিকিৎসাসেবার কাজ চালানো হয়। ব্যবহারের অভাবে অনেক যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে।
যেসব যন্ত্র নষ্ট হয়েছে
হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে কর্মরতরা জানান, চিকিৎসক না থাকায় এবং ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ব্যবহার বন্ধ থাকায় চক্ষু ওয়ার্ডের ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি কক্ষের দুটি লেজার যন্ত্র, কালার ফান্ডাস ফটোগ্রাফি এবং ওসিটি মেশিন নষ্ট হয়ে গেছে। এগুলোর সম্মিলিত মূল্য ৯৯ লাখ টাকা।
এ ছাড়া চোখের অস্ত্রোপচার কক্ষের ১২-১৫ লাখ টাকা মূল্যের অপারেটিং মাইক্রোস্কোপ, ২-৫ লাখ টাকা মূল্যের এ-স্ক্যান বায়োমেট্রিক, ৫-৬ লাখ টাকার এ-স্ক্যান টমি, প্রায় ছয় লাখ টাকার অটোক্লেভ, ১-২ লাখ টাকার হট এয়ার স্টেরিলাইজার ও ৫০ হাজার টাকা দামের ক্যাথারেক্ট সেটসহ ১৩ ধরনের যন্ত্রপাতি মরিচা পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। চক্ষু বহির্বিভাগে প্রায় দুই লাখ টাকা মূল্যের চোখের রেটিনা পরীক্ষা করার বিশেষ যন্ত্র ইনডাইরেক্ট অফথ্যালমোস্কোপ, চোখের রিফ্র্যাকশন (চশমার পাওয়ার নির্ণয়) এবং রেটিনোস্কপি পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত ৫০ হাজার টাকার নাইটজ রেটিনোস্কোপসহ ছয় ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করায় নষ্ট হয়ে গেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক রতন কুমার ঢালী প্রথম আলোকে বলেন, একটি প্রকল্পের আওতায় হাসপাতালে আবার চোখের অস্ত্রোপচার চালুর বিষয়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। চক্ষু ওয়ার্ডে কিছুদিনের জন্য শিশু ওয়ার্ডকে স্থানান্তর করা হয়েছে, যা দু-এক দিনের মধ্যেই সরানো হবে। চিকিৎসক সংকটের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।