পথ দেখালেন নাজমিন

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার গৃহবধূ নাজমিন নাহার আট বছর আগেও খুব কষ্টের মধ্যে ছিলেন। গরুর খামার দেওয়ার পর তাঁর কষ্ট দূর হয়েছে।

তারাগঞ্জে নিজের খামারে দুধ দোয়ায় ব্যস্ত নাজমিন নাহার
ছবি: প্রথম আলো

আট বছর আগের কথা। এক তরুণীর বিয়ে হয় এক বেকার যুবকের সঙ্গে। স্বামীর সংসারে এসে দেখেন চারদিকে শুধু অভাব আর অভাব। শাড়ি–চুরির শখন পূরণ করা তো অনেক দূরের কথা, স্বামীর আয়রোজগার না থাকায় দুবেলা খাবারও মুখে তুলতে পারেননি। এ পরিস্থিতিতে তিনি দারিদ্র্য দূর করার জন্য কিছু করার পরিকল্পনা করেন। শুরু করেন গৃহশিক্ষকতা। এরপর ধীরে ধীরে রাত–দিন পরিশ্রম করে গড়ে তোলেন গরুর খামার। এখন তাঁর সংসারে সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। 

অভাবজয়ী ওই গৃহবধূর নাম নাজমিন নাহার। বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের শেরমস্ত পাতিলভাঙা গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের  মাইদুল ইসলামের স্ত্রী। গরুর খামার থেকে এখন তিনি মাসে ২৫ হাজার টাকা আয় করছেন। মেধা ও শ্রম দিয়ে তিনি শুধু একার দিন বদলাননি। তাঁর দেখানো পথ ধরে আশপাশের গ্রামের অনেক নারী–পুরুষের জীবন বদলে গেছে।

উপজেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে শেরমস্ত পাতিলভাঙা গ্রাম। গ্রামে ঢুকেই নাজমিন নাহারের বাড়ি খোঁজ করতেই একজন দেখিয়ে দিলেন। বাড়িতে ঢুকতেই দেখা গেল, নাজমিন নাহার গাভির দুধ দোয়াতে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ পর খামার থেকে বালতিভর্তি দুধ নিয়ে বেরিয়ে এলেন তিনি। বাড়ির উঠানে গাছের ছায়ায় বসতে দিলেন। 

নাজমিন নাহারের দিনবদলের পেছনের গল্প সম্পর্কে জানতে চাইলে কথা বলতে শুরু করেন তিনি। তারাগঞ্জ উপজেলার দোহাজারী গ্রামে ১৯৯৫ সালে মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম তাঁর। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। ২০১৩ সালে এইচএসসি পাস করার পর তাঁর বিয়ে হয় একই উপজেলার শেরমস্ত পাতিলভাঙা গ্রামের ওসমান আলীর ছেলে মাইদুল ইসলামের সঙ্গে। বেকার স্বামীর সংসারে এসে প্রায়ই অনাহারে-অর্ধাহারে থাকতে হতো। কিন্তু এত অভাব, এত দারিদ্র্য তিনি মেনে নিতে পারেননি। একদিন তিনি প্রতিজ্ঞা করেন দারিদ্র্যের কাছে হার মানবেন না। এ প্রতিজ্ঞা থেকে তিনি আয়ের উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে থাকেন। সেই ভাবনা থেকে গৃহশিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু গৃহশিক্ষকতা করেও ভালো আয়রোজগার হচ্ছিল না। 

নাজমিন নাহার জানান, ছয় মাস গৃহশিক্ষকতা করিয়ে তিনি ১২ হাজার টাকা আয় করেন। ওই আয় দিয়ে তিনি হাঁস-মুরগি ও ছাগল কেনেন। পরে আরও বড় কিছু করার স্বপ্ন থেকে হাঁস-মুরগি, ছাগল বিক্রি করে সংকর জাতের দুটি বকনা বাছুর কেনেন। বছর দুয়েক পর বাছুর দুটি বড় হয়ে বাচ্চা জন্ম দেয়। এরপর থেকে প্রতিদিন ৩৬ লিটার দুধ দিতে শুরু করে। এ দুধ বিক্রি করে দিনে প্রায় ৬০০ টাকা আয় হয় হতে থাকে। এভাবে তিন বছরে আরও তিনটি সংকর জাতের গাভি কেনেন। পাঁচটি গাভি দিয়ে শুরু করেন গরুর খামার। বর্তমানে নাজমিন নাহারের খামারে দেশি-বিদেশি মোট গরু ১৩টি। প্রতিদিন খামার থেকে ৮৫-৯০ লিটার দুধ পান। দুধ বিক্রি করে দৈনিক এক হাজার টাকা লাভ থাকে। বছরে দুই লাখ টাকার বাছুরও বিক্রি করেন তিনি। 

গরুর খামার থেকে আয় হওয়া টাকা দিয়ে নাজমিন টিনের ঘরের জায়গায় পাকা বাড়ি করেছেন। কিনেছে ৭০ শতক আবাদি জমি। আত্মনির্ভরশীল নাজমিন এলাকাবাসী ও পরিবারের কাছে হয়ে উঠেছেন আদর্শ গৃহিণী।

নিজের সংসারে সচ্ছলতা আনার পাশাপাশি গ্রামে তাঁর মতো বিপদে পড়া অন্য গৃহবধূর কথাও ভুলে যাননি নাজমিন। তাঁদেরও পরামর্শ দিয়ে গরু পালনে উৎসাহিত করেছেন। তাঁর দেখাদেখি আলমপুর ইউনিয়নের অনেক গৃহবধূ গরু পালন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। শুধু নারীরাই নন, গ্রামের অনেক বেকার তরুণও নাজমিন নাহারের দেখাদেখি গাভি পালন করে বেকারত্ব ঘুচিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে হাজীপাড়া গ্রামের মোতালেব হোসেনও আছেন।

মোতালেব হোসেন বলেন, ‘কাজ না থাকায় অলস সময় কাটিয়েছি। এখন নাজমিনের পরামর্শে গাভি পালন করে সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। শুধু আমিই নই, আমাদের গ্রামের অনেকেই নাজমিনের কাছে পরামর্শ ও বকনা নিয়ে গাভি পালন করছে। সেই গাভির দুধ বেচে আমাদের সংসার চলছে।’ 

আলমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম বলেন, নাজমিন গ্রামের শিক্ষিত ও পরিশ্রমী গৃহবধূ। তাঁর হাত ধরে আলমপুর ইউনিয়নের অনেকেই দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ফরহাদ নোমান বলেন, ‘নাজমিন নাহারের খামার ও তার কার্যক্রম আমি দেখেছি। সে একজন দক্ষ খামারি। নিজের সন্তানের মতো নিজের গাভিগুলো পরিচর্যা করে। তাকে দেখে গ্রামের অনেক নারী–পুরুষ গাভি পালনে উৎসাহিত হচ্ছেন।’