চাকরি–ফ্রিল্যান্সিং ছেড়ে কৃষিতে প্রকৌশলী নাঈম, মাসে আয় দুই লাখ টাকা

নাঈম হুদার বাগানে প্রথমবারের মত হলুদ হয়েছে মাল্টার রং। বিক্রির জন্য মাল্টা তোলা হচ্ছে। গত শুক্রবার দুপুরে দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার বৈকুণ্ঠপুর গ্রামেছবি: প্রথম আলো

জমিতে মাল্টার বাগান। সেই বাগানের বেশির ভাগ গাছে ঝুলে আছে হলুদ রঙের মাল্টা। সারি সারি গাছের ফাঁকে বেডে কেঁচো সার বানানো হচ্ছে। সেই সার যাচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে।

ফলের বাগানের ভেতরে আধুনিক পদ্ধতির এই কেঁচো সারের খামারের দেখা মিলবে দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার বৈকুণ্ঠপুর গ্রামে। খামারের উদ্যোক্তা ফজলুর রহমানের ছেলে নাঈম হুদা (৩২)।

বেড, গামলা, রিং–পদ্ধতিসহ কয়েকভাবে প্রতি মাসে ২৫-৩০ টন কেঁচো সার উৎপাদন করছেন নাঈম। পাশাপাশি ছয় বিঘা জমিতে লাগিয়েছেন মাল্টা, কমলা, আম ও লিচু। বিক্রি করছেন জৈব বালাইনাশক। খামার–সংলগ্ন পুকুরে মাছ চাষ করছেন। পুকুরের পাড়ে লাগিয়েছেন সুপারি, মাল্টা, বারোমাসি আম ও কাঁঠালের গাছ। সেখানেই মাচাংয়ে চলছে সবজি চাষ। ব্যয় বাদে সবকিছু থেকে প্রতি মাসে নাঈমের আয় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। নাঈমের খামার দেখতে প্রতিদিন ভিড় করেন কৃষক, উদ্যোক্তা, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ও সাধারণ দর্শনার্থীরা।

নাঈমের শুরু যেভাবে

২০১৬ সালে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যন্ত্র প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন নাঈম হুদা। পরের বছর নীলফামারী ইপিজেডে কর্মজীবন শুরু করেন। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং করতেন। চাকরিতে যে পরিমাণ সময় আর শ্রম দিতে হচ্ছিল, সে তুলনায় বেতন কম ছিল। কয়েক মাস পর তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। পুরোপুরি মনোযোগ দেন ফ্রিল্যান্সিংয়ে। ২০২০ সালে করোনার প্রাদুর্ভাবে তাঁর ফ্রিল্যান্সিংয়ে ভাটা পড়ে।

নাঈম বলেন, ‘চাকরি ছাড়ার পর থেকে পরিবারের নানা কথা শুনতে হচ্ছিল। ভাবলাম, এমন কিছু শুরু করব, যেটা পৃথিবী যত দিন থাকবে, আমার কাজও তত দিন থাকবে। সেই বিবেচনায় কৃষিতে মনোযোগী হই।’

২০২০ সালে বাড়ির পাশে পৈতৃক এক বিঘা জমিতে কিউজাই জাতের আম আর চায়না–থ্রি লিচুর বাগান করে কৃষিকাজ শুরু করেন নাঈম হুদা। একই বছর আরও চার বিঘা জমিতে লাগান মাল্টা, কমলা, লেবু ও পেঁপে। এসব করতে গিয়ে তিনি দেখেন, কৃষিতে সারের খরচটা তুলনামূলকভাবে বেশি।

নাঈম বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের ভাবনা নিয়ে কৃষিতে আসি, কিন্তু সার ও কীটনাশক কিনতে হচ্ছিল প্রচুর। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়ির উঠানে ১০টি রিং ও কয়েকটি প্লাস্টিকের গামলায় কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করি।’

ধীরে ধীরে জৈব সার ব্যবহারে উপকার পেতে শুরু করেন নাঈম। বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে কৃষিখামারও পরিদর্শন করেন। একটা সময় নিজের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সার উৎপাদন হয় তাঁর। স্থানীয় কৃষকদের কাছে তিনি প্রতি কেজি সার ১২-১৫ টাকা দরে বিক্রি শুরু করেন। এবার আশপাশের বিভিন্ন খামার থেকে গোবর সংগ্রহ করে পুরোদমে সার উৎপাদন শুরু করেন।

বর্তমানে ৪০টি রিং, অর্ধশতাধিক গামলা ও ৫৫টি বেডে প্রতি মাসে নাঈম হুদার খামারে ২৫ থেকে ৩০ টন সার উৎপাদন হচ্ছে। খামারের পাশে নির্দিষ্ট গুদামঘরে তিনি সার মজুত করছেন। খুচরা বিক্রির পাশাপাশি আশপাশের জেলাসহ টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, সিলেট, ময়মনসিংহ, খুলনাসহ বিভিন্ন কৃষিখামারে তিনি সার বিক্রি করেন। ‘সর্বদা কৃষকের পাশে’ স্লোগানে তিনি গড়ে তুলেছেন নাঈম অর্গানিক অ্যাগ্রো।

মাল্টাবাগানে সোনালি স্বপ্ন

গত সাত বছর কৃষিকাজে সময় দিয়ে রীতিমতো গবেষক হয়ে উঠেছেন নাঈম হুদা। বর্তমানে তাঁর মিশ্র ফলের বাগানে শুধু মাল্টার গাছ আছে সাত শতাধিক। ২০২৩ সালে প্রথমবার মাল্টা ধরে। সেবার ফল নেননি। পরেরবার মাল্টা পেয়েছেন প্রায় ৭০ মণ; কিন্তু মাল্টার রং হলুদের বদলে সবুজ। সেবার ভালো দাম মেলেনি। ২০২৪ সালে কৃষি বিভাগ ও ঠাকুরগাঁওয়ের এক বাগানির পরামর্শে ‘রুড প্রুনিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করে মাল্টাগাছের পরিচর্যা শুরু করেন। মাল্টার রং হলুদ হয় সেবার।

সম্প্রতি নাঈমের মাল্টাবাগান ঘুরে দেখা গেছে, ছোট ছোট গাছে সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে হলুদ মাল্টা। টক–মিষ্টি স্বাদের রসালো মাল্টা আকারে অপেক্ষাকৃত বড়। মাল্টার ভারে নুয়ে পড়া গাছের ডালে বাঁশের খুঁটিতে ঠেক দেওয়া হয়েছে। আশপাশের লোকজন প্রতিদিন এই বাগানে ভিড় করছেন, ছবি তুলছেন।

দ্বিতল বেড পদ্ধতিতে কেঁচো সারের খামার করেছেন নাঈম হুদা। গত শুক্রবার দুপুরে দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার বৈকুণ্ঠপুর গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

নাঈমের খামারে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ১৪ জন শ্রমিক কাজ করেন। কেউ মাল্টা ছিঁড়ে ক্যারেটে ভরছেন, কেউ বেডে গোবরের মিশ্রণ ওলটাচ্ছেন। কেউ মেশিনে নেটিং করছেন, কেউ চাতালে সার শুকাচ্ছেন। পুকুরপাড়ে পাকা ঘর তুলে অফিস ও বিক্রয়কেন্দ্র করা হয়েছে। নাঈম জানালেন, গত কয়েক বছরে পাঁচ শতাধিক তরুণ-যুবককে উদ্যোক্তা হতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন তিনি। আগ্রহী অনেককে কেঁচোও সরবরাহ করেছেন।

খামারে আসা শামসুদ্দিন আলম নামের একজন বলেন, ‘মাল্টা বিদেশি ফল বলেই জানি। কয়েক বছর থেকে আমাদের দেশেও চাষ হচ্ছে। কিন্তু সবুজ রঙের। এবারই প্রথম নিজের চোখে সরাসরি গাছে হলুদ রঙের মাল্টা দেখলাম।’

নাঈম জানালেন, এবার সব গাছে ফল আসেনি। তবে ফলের আকার বড় হয়েছে। অপেক্ষাকৃত কম কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর প্রত্যাশা, এবার সর্বনিম্ন ২৫০ থেকে ২৮০ মণ মাল্টা পাবেন। পাইকারিতে প্রতি কেজি মাল্টা ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রির আশা তাঁর।

জৈব বালাইনাশকে কৃষকের ভরসা

নাঈম শুধু কেঁচো সারেই থেমে থাকেননি। তিনি মাটি ও ফসলের উপকারে গোমূত্র, চিটা গুড়, বেসন ও মাটি দিয়ে তৈরি সলিড অণুজীব সার বিক্রি করছেন। নিম, মেহগনি, বেল, আতা, ধুতরা ও ভেন্নাপাতায় তৈরি ১০ পাতার রস বিক্রি করছেন। এটি ব্যবহারে কৃষকের গাছ-ফসলের পুষ্টিজনিত সমস্যা দূর হচ্ছে। তাঁর বিক্রয়কেন্দ্রে আছে ডিমের খোসার গুঁড়া, শামুক-ঝিনুক-শুঁটকি মাছ-তামাকের গুঁড়া, বাদাম-নিম-নারকেল-তিলের খইল। এসব উপাদানে নাঈমের খামারে উৎপাদন করা হয় ট্রাইকোডার্মা কম্পোস্ট সার।

বৈকুণ্ঠপুর এলাকার কৃষক এরশাদ আলী বলেন, ‘বাজারে সার ও কীটনাশকের দাম অনেক বেশি। কৃষি অফিসারও জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন বারবার। এলাকার অনেকেই কয়েক বছর থেকে নিয়মিত জৈব সার ব্যবহার করছি। এতে সারের খরচটা কমেছে, ফলনও ভালো হয়েছে।’

একটা সময় চাকরি ছেড়ে কৃষিকাজে যুক্ত হওয়ায় ছেলের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন বাবা ফজলুর রহমান। এখন ছেলের সাফল্য দেখে তিনি খুশি। ছেলের কাজের খোঁজ রাখেন, খামারে সময় দেন। বিক্রয়কেন্দ্রে বসে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন।

ফজলুর রহমান বলেন, ‘একটা সময় ছেলেকে বকাবকি করেছি; কিন্তু ওর চেষ্টা ও পরিশ্রমে আজ খামারটা দাঁড় হয়েছে। প্রতিদিন ১০-১২ জন কাজ করছেন।’ তিনি মনে করেন, কৃষিতে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের এগিয়ে আসা উচিত।

নাঈম হুদার উদ্যোগের বিষয়ে চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা বলেন, উপজেলায় গত কয়েক বছরে কেঁচো সারের ব্যবহার বেড়েছে। রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীলতা কমেছে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণে এই সার ব্যবহারের বিকল্প নেই। বর্তমানে জেলায় নাঈমের খামারটিই সবচেয়ে বড় ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের খামার।