ইউটিউবে দেখে কমলা চাষের শুরুতে টিপ্পনী, আড়াই বছরেই তাক লাগিয়ে দিলেন আলমগীর
প্রায় দুই দশক প্রবাসে কাটিয়েছেন আলমগীর ভূঁইয়া। কয়েক বছর আগে একেবারে দেশে ফিরে আসেন। একদিন তিনি ইউটিউবে দেখে কলমা চাষে উদ্বুদ্ধ হন। গ্রামে ৬৫ শতক জমি ইজারা নিয়ে শুরু করেন চাষ। যা দেখে নানা টিপ্পনী, ঠাট্টা ও কটুকথা বলতে থাকেন এলাকার মানুষ। এসবে দমে যাননি আলমগীর। আড়াই বছরের মধ্যেই কমলা চাষে সাফল্য এনে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। ১৮৫টি গাছে আসে বিপুল কমলা। গাছ থেকে পেড়ে এখন বাগানেই কমলা বিক্রি করছেন।
আলমগীর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভারত সীমান্তঘেঁষা বিজয়নগর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর গ্রামের বাসিন্দা। পরিবারে স্ত্রীসহ দুই মেয়ে ও এক ছেলে সন্তান রয়েছে। এর আগে তিনি ১২ বছর সৌদি আরবে কাটিয়েছেন। এরপর সাইপ্রাস ও দুবাইয়ে কাটিয়েছেন আরও ছয় থেকে সাত বছর। এভাবে প্রবাসে কেটেছে তাঁর প্রায় ১৯ বছর।
জেলায় আলমগীরই কমলা চাষে সফল হওয়া প্রথম ব্যক্তি বলে জানালেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাব্বির আহমেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অন্য কেউ সফল হতে পারেনি। তাঁর কমলার জাত চীনা, আকারে ছোট। তবে স্বাদে বেশ মিষ্টি।
২০১৯ সালের শেষ দিকে একেবারে দেশে আসেন আলমগীর। প্রায় আড়াই বছর আগে ইউটিউবে চুয়াডাঙ্গার ওমর ফারুক নামে এক ব্যক্তির কমলার চাষ দেখেন তিনি। এতে তিনি উদ্বুদ্ধ হন। মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করে ওমর ফারুকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। চুয়াডাঙ্গায় গিয়ে কমলার বাগানও পরিদর্শন করেন। পরে সেখান থেকেই ১৭৫ টাকা দরে ২০০ কমলার চারা কেনেন। তাঁর খরচ হয় ৩৫ হাজার টাকা। এক আত্মীয়র কাছ থেকে এক লাখ টাকায় দুলালপুর গ্রামে ১৬ বছরের জন্য ইজারা নেওয়া ৬৫ শতক জমিতে চাষ শুরু করেন।
আলমগীর ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, প্রথম দিকে গ্রামের মানুষের সঙ্গে কমলার চাষ নিয়ে পরামর্শ করতে যান। স্থানীয়রা বলেছিলেন, এখানে কমলার ফলন হবে না, হলেও কমলা টক হবে। মানুষজন নানা টিপ্পনী, ঠাট্টা, কটুকথাও বলেছেন। কিন্তু তিনি নিরাশ হননি। লোকজনের কথায় কান না দিয়ে কমলার চাষে মন দেন।
আমি যে এখানে কমলার চাষ করেছি, ইউনিয়ন ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা জানতেনই না। বিভিন্নজনের কাছ থেকে শুনে তাঁরা বাগানে এসে কমলা দেখে অবাক হয়েছেন।
মূলত শখ থেকে কমলার চারা লাগিয়েছিলেন বলে জানান আলমগীর। তিনি জানান, চারা লাগানোর এক বছরের মাথায় গত বছর গাছে হালকা মুকুল আসে। ভালো ফলনের আশায় তা রাখেননি। চাষির পরামর্শ অনুযায়ী ফেলে দেন। এ বছরের মাঝামাঝি সময়ে গাছে কমলা আসতে শুরু করে। ২০০টি চারা রোপণ করলেও বর্তমানে বাগানে ১৮৫টি কমলার গাছ রয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে আলমগীর বলেন, ‘আমি যে এখানে কমলার চাষ করেছি, ইউনিয়ন ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা জানতেনই না। বিভিন্নজনের কাছ থেকে শুনে তাঁরা বাগানে এসে কমলা দেখে অবাক হয়েছেন। কারণ, উপজেলার আর কেউই অন্য কোথাও কমলার চাষে সফল হননি। এখন উপজেলা ও জেলার অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত আমার কমলার বাগান দেখতে আসেন। যাওয়ার সময় কমলা কিনে নিয়ে যান।’
আলমগীর ভূঁইয়া বলেন, সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার ও শনিবার সর্বনিম্ন ১৫০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০ কেজি কমলা বিক্রি হয়। প্রতি কেজি কমলার দাম ১৭০ টাকা। এখন পর্যন্ত কমলর বাগানের পেছনে চার লাখের বেশি টাকা খরচ হয়েছে। প্রায় তিন থেকে চার লাখ টাকার কমলা বিক্রি করতে পেরেছেন। আরও প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকার কমলা বিক্রি করতে পারবেন। একটি গাছ থেকে এখন পর্যন্ত ৪২ থেকে ৫০ কেজি কমলা বিক্রি করেছি। পরের বছর আর বেশি খরচ হবে না।
আলমগীরের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গাছ থেকে কমলা পাড়ার তিন মাস পর গাছে ফুল আসে। সাধারণত বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসেই গাছে ফুল আসে। ফুল আসার পর পরিপূর্ণ কমলা হতে সাত থেকে আট মাস সময় লাগে। চুনের সঙ্গে তুঁত মিশিয়ে গাছের গোড়ায় দিলে পচন ধরে না ও পোকামাকড় ওপরে উঠে না, গোড়াও ভালো থাকে।
কমলার বাগানের পাশাপাশি আলমগীর ভূঁইয়া নিজ বাড়িতে গরুর খামারও করেছেন। খামার গোবর কমলার চাষে ব্যবহার করেন। এ ছাড়া কমলার ভালো ফলনের জন্য জৈব সার, ছত্রাকনাশক ও মাকড়নাশকের স্প্রে ব্যবহার করতে হবে বলে জানান তিনি।
উপজেলার বক্তামোড়া গ্রামের বাবুল মিয়া ও তাসলিমা বেগম, পাহাড়পুর গ্রামের সোহাগ মিয়া বলেন, বাজারের কমলা থেকে আলমগীরের বাগানের কমলা ভালো। কমলার আকার ছোট হলেও স্বাদে বেশ মিষ্টি ও সুস্বাদু। দামও ঠিক আছে।