টিউশনের জমানো টাকায় বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি, এবার যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করবেন উচ্ছাস

উচ্ছাস শিকদার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। আজ শনিবার পিএইচডি করতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা দেবেন তিনি। সেখানে তিনি মানুষের অন্ত্রে থাকা অণুজীব নিয়ে গবেষণা করবেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ম সমাবর্তনে উচ্ছাস সিকদারছবি: সংগৃহীত

সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে। এরপর যেতেন টিউশন করাতে। রাতে বাসায় ফিরে করতেন ক্যানসারে আক্রান্ত বাবার সেবাযত্ন। এর মধ্যেই বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি চালিয়ে গেছেন তিনি। টিউশন থেকে জমানো টাকায় নিজের পড়াশোনা খরচ, আইইএলটিএস পরীক্ষা, বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন সব করেছেন। অবশেষে আজ শনিবার পিএইচডি করতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা দেবেন তিনি।

গল্পটা উচ্ছাস সিকদারের। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ‘হিউম্যান গাট মাইক্রোবায়োটা’ নিয়ে গবেষণা করবেন। মানুষের অন্ত্রে থাকা অণুজীব নিয়ে তাঁর এই গবেষণা ভবিষ্যতে রোগীর শরীরের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ নিয়েই এ গবেষণা।

উচ্ছাস চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাসিন্দা। তবে তিনি বেড়ে উঠেছেন চট্টগ্রাম নগরের আন্দরকিল্লা এলাকায়। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন তিনি। দুই পরীক্ষাতেই সব বিষয়ে এ প্লাস (গোল্ডেন জিপিএ-৫) পেয়েছেন তিনি। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগে ভর্তি হন উচ্ছাস। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর—দুই পর্যায়েই তাঁর সিজিপিএ ৩ দশমিক ৯৬। এখন যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ বছরের পূর্ণ বৃত্তিতে পিএইচডি করবেন তিনি।

অনেক মানুষের সহযোগিতায় এত দূর আসতে পেরেছি। আমার শিক্ষক, বন্ধু ও জুনিয়ররা সব সময় পাশে ছিলেন। জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ ছিল বাবার ক্যানসারে আক্রান্ত থাকাকালীন দুই বছরের সে সময়টা। একবার সেই সময় পার করে আসার পর আর কোনো চ্যালেঞ্জকেই অসম্ভব মনে হয়নি।
উচ্ছাস সিকদার, সাবেক শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষ থেকেই টিউশন করে নিজের খরচ চালাতেন উচ্ছাস। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিভাগের ক্লাস ও গবেষণাগারে থাকতেন তিনি। এরপর টানা দুটি টিউশন করাতেন। কখনো কখনো চারটি টিউশনও তাঁকে করাতে হয়েছে। এতে গড়ে মাসে আয় করতেন ২০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ১০ হাজার টাকা নিজের খরচের জন্য রেখে দিতেন। বাকি ১০ হাজার টাকা পরিবারকে দিতেন।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে জাপানে ইন্টার্নশিপে যাওয়ার আগে মা–বাবার সঙ্গে উচ্ছাস সিকদার
ছবি: তাঁর কাছ থেকে নেওয়া

তবে কোনো মাসে পরিবারের আর্থিক প্রয়োজন কম থাকলে সেই টাকা উচ্চশিক্ষার জন্য জমাতেন উচ্ছাস। সে জমানো টাকা দিয়েই আইইএলটিএস পরীক্ষাসহ যাবতীয় খরচ মিটিয়েছেন তিনি। পিএইচডিতে ভর্তির জন্য পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেছিলেন। সব মিলিয়ে আবেদন বাবদ তাঁর প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই স্থির করেছিলেন উচ্ছাস। ২০২৩ সালে ১৫ দিনের জন্য জাপানে ইন্টার্নশিপ করতে গিয়েছিলেন তিনি। তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষে পড়তেন। জাপানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ফিজিওলজিক্যাল সায়েন্সেসে তিনি অসুস্থ প্রাণীর ওপর প্রাকৃতিক উপাদান ও আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা শেখেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষ থেকেই টিউশন করে নিজের খরচ চালাতেন উচ্ছাস। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিভাগের ক্লাস ও গবেষণাগারে থাকতেন তিনি। এরপর টানা দুটি টিউশন করাতেন। কখনো কখনো চারটি টিউশনও তাঁকে করাতে হয়েছে।

তবে মাস্টার্সে ওঠার পরই জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় শুরু হয় উচ্ছাসের। ২০২৪ সালের শুরুতে তাঁর বাবা কানু সিকদারের ক্যানসার ধরা পড়ে। বড় দুই বোন বিবাহিত। মা কৃষ্ণা সিকদার বাসায় একাই বাবার দেখাশোনা করতেন। এমন পরিস্থিতিতে নিজের গবেষণা, থিসিস, বিদেশে আবেদনের প্রস্তুতি এবং পরিবারের দায়িত্ব সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়েছে তাঁকে। একপর্যায়ে বাবাকে নিয়ে ভারতের হাসপাতালেও তাঁকে প্রায় এক মাস থাকতে হয়েছে।

সেই সময়ের কথা স্মরণ করে উচ্ছাস বলেন, ‘ছাত্রজীবনে সব সময় চেষ্টা করেছি নিজের খরচ নিজেই চালাতে। টিউশন করতাম, যাতে পরিবারের ওপর চাপ না পড়ে। কিন্তু স্নাতকোত্তরে ওঠার পর বাবার ক্যানসার ধরা পড়লে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় শুরু হয়। দিনের বেশির ভাগ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে কাজ করতাম। এরপর ট্রেনে করে শহরে এসে টিউশন করাতাম। রাত ৯টা বা ১০টার দিকে বাসায় ফিরে বাবার সেবাযত্ন করতাম। তখন প্রায়ই মনে হতো ক্যারিয়ার গড়ব, নাকি পরিবারের পাশে থাকব।’

২০২৫ সালের অক্টোবরে তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। তখন তাঁর স্নাতকোত্তরের চূড়ান্ত পরীক্ষা চলছিল। তবে তাঁর মানসিক অবস্থা বিবেচনায় একটি পরীক্ষা স্থগিত করেছিল বিভাগ। উচ্ছাস বলেন, ‘অনেক মানুষের সহযোগিতায় এত দূর আসতে পেরেছি। আমার শিক্ষক, বন্ধু ও জুনিয়ররা সব সময় পাশে ছিলেন। জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ ছিল বাবার ক্যানসারে আক্রান্ত থাকাকালীন দুই বছরের সে সময়টা। একবার সেই সময় পার করে আসার পর আর কোনো চ্যালেঞ্জকেই অসম্ভব মনে হয়নি।’

যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রস্তুতিতেও নিজের সঞ্চয় কাজে লাগাচ্ছেন তিনি। বিমানভাড়া ও সেখানে প্রথম এক মাসের জীবনযাত্রার খরচ মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা প্রয়োজন হবে। এই অর্থের একটি অংশ নিজের জমানো টাকা থেকে ও বাকিটা পরিবার থেকে নিয়ে বহন করবেন তিনি।

মায়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পর অবশ্য আর্থিক চাপ অনেকটাই কমবে উচ্ছাসের। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাসে ২ হাজার ৬৭৪ মার্কিন ডলার স্টাইপেন্ড পাবেন তিনি। এ ছাড়া প্রথম বছরের ২৯ হাজার ৫৬৬ মার্কিন ডলার টিউশন ফি মওকুফ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। সেখান থেকে পড়াশোনা শেষে আবার দেশে ফিরতে চান উচ্ছাস।

বিদেশ যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে উচ্ছাস বলেন, ‘প্রথমেই লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। তথ্য জানতে হবে, গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে এবং নিজের সক্ষমতা নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগা যাবে না। অনেকে মনে করেন, সিজিপিএ কম হলে সুযোগ পাওয়া যায় না। কিন্তু সঠিক প্রস্তুতি থাকলে যে কেউ চেষ্টা করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের কাছে পরিষ্কার থাকা আপনি আসলে কী চান।’

উচ্ছাস সিকদারের গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক আদনান মান্নান বলেন, ‘প্রচণ্ড ব্যক্তিগত শোক, হতাশা ও অসহনীয় কাজের চাপের মধ্যেও একজন মানুষ কীভাবে নিজেকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে পারে, লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়ে কীভাবে প্রতিটি দায়িত্ব সমান নিষ্ঠায় পালন করতে পারে—এর অনন্য উদাহরণ আমাদের উচ্ছাস। আমি সত্যিই তাঁকে নিয়ে গর্বিত। সে কখনো হার মানেনি, হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করেনি।’