প্রধানমন্ত্রীকে বরণে মৌলভীবাজারে চলছে প্রস্তুতি, আলোচনায় মেডিক্যাল কলেজসহ নানা দাবি
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মৌলভীবাজার সফরে আসছেন। তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে চলছে বহুমুখী তৎপরতা। একদিকে প্রশাসনিক ব্যস্ততা চলছে, অন্যদিকে রাস্তাঘাট সংস্কার, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ হচ্ছে। জেলা থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত বিএনপি নেতা-কর্মীরা প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশকে সফল করতে বৈঠক, আনন্দমিছিলসহ নানামুখী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রশাসন, বিএনপি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে মৌলভীবাজার আসবেন। দুপুরে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভিক্টোরিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠ এবং পরে মৌলভীবাজার জেলা সদরে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে উপস্থিত থেকে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করবেন। প্রধানমন্ত্রীর এই আগমনকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন থেকে জেলাবাসীর মধ্যে নানা রকম আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। এতে নতুন করে পুরোনো দাবিগুলো আলোচনাতে ফিরে এসেছে। দীর্ঘদিন থেকে মৌলভীবাজারে একটি মেডিক্যাল কলেজ ও একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, প্রবাসীবহুল ও পর্যটন এলাকা হিসেবে শমসেরনগর বিমানবন্দর চালু, জেলার হাওরগুলোর উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণসহ নানা দাবি আলোচনায় এসেছে।
এদিকে প্রথমে জেলার শ্রীমঙ্গল ও রাজনগরে তাঁর সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল। প্রাথমিক প্রস্তুতিও শুরু করা হয়। পরে মানুষের স্থান সংকুলান হবে না বলে রাজনগরের সমাবেশটি সদরের মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। এতে রাজনগর উপজেলার অনেকেই আশাহত হয়েছেন। অনেকেই বলেছেন, রাজনগর উপজেলায় প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত হলে রাজনগর পৌরসভা ঘোষণা, রাজনগর উপজেলা সদরে গ্যাস-সংযোগসহ স্থানীয় কিছু দাবিদাওয়া পূরণের সুযোগ সৃষ্টি হতো। রাজনগরের মাওলানা মুফজ্জল হোসেন মহিলা ডিগ্রি কলেজ সরকারিকরণের দাবিও আছে।
এদিকে মৌলভীবাজারে তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বিএনপির নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই সফরকে ঘিরে চলছে আলাপ-আলোচনা। প্রধানমন্ত্রীর আসা-যাওয়ার পথ সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ-রাজনগর সড়কের ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকা থেকে শ্রীমঙ্গল পর্যন্ত প্রায় ৫৫ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশের ঝোপঝাড়, আগাছা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। ব্রিজের রেলিং ও জেব্রাক্রসিংগুলোতে নতুন করে রং করা হচ্ছে। সড়কের ভাঙাচোরা অংশ, গর্ত মেরামত করা হচ্ছে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কায়সার হামিদ আজ সোমবার (১৫ জুন) প্রথম আলোকে বলেন, ‘সড়কের দুই পাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কারসহ রাস্তায় কিছু গর্ত থাকে, সেগুলো রিপেয়ার করা হচ্ছে।’
মৌলভীবাজারে প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশকে সফল করতে মাঠে মঞ্চ ও প্যান্ডেল তৈরির ব্যাপক কর্মতৎপরতা চলছে। প্রশাসন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপির স্থানীয় নেতারা নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ করছেন। গতকাল রোববার (১৪ জুন) বিকেলে মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এম নাসের রহমান সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠ পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. ফয়জুল করিম ময়ূন, সদস্যসচিব মোহাম্মদ আব্দুর রহিম, জেলা পরিষদের প্রশাসক মিজানুর রহমান, বিএনপি জেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আব্দুল মুকিত, বকশি মিছবাউর রহমান, মৌলভীবাজার সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মুজিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক মারুফ আহমদ, রাজনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মো. আব্বাস আলী প্রমুখ।
এ সময় এম নাসের রহমান বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের সময় বিভিন্ন কমিটমেন্ট করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে খুবই সচেতন। আমরা জেলার জন্য তিনটি বিষয় দাবি করেছিলাম, মেডিক্যাল কলেজ, শমসেরনগর বিমানবন্দর চালু এবং বিশ্ববিদ্যালয়। এগুলো শুধু জনগণের দাবি নয়, এগুলো আমারও দাবি। ১৭ জুন এই দাবিগুলো তাঁর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করব।’
আজ সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে গিয়ে দেখা গেছে, মাঠে যাওয়ার রাস্তা কোর্ট রোডের দুই পাশের ভ্রাম্যমাণ বিভিন্ন ধরনের দোকান সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মাঠের সীমানাপ্রাচীরে রং করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ–লাইনের প্রতিবন্ধকতা সরাতে গাছের ডালপালা কাটা হচ্ছে। মাঠের ভেতরে প্যান্ডেলের স্থানে ইট ও বালু ফেলা হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে সমাবেশ স্থানের আশপাশে কাদাপানি জমে গেছে। চলছে প্যান্ডেল বাঁধার কাজ। অনেক শ্রমিক কাজ করছেন। সভাস্থল ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে স্বাগত জানিয়ে আজ সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে বিএনপি মৌলভীবাজার সদর উপজেলা কমিটি শহরে আনন্দমিছিল করেছে।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. ফয়জুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ব্যাপক মানুষের সমাবেশ ঘটাতে কাজ করছি। ইউনিয়ন, ওয়ার্ড পর্যায়ে কাজ চলছে।’ রাজনগর থেকে সমাবেশের স্থান পরিবর্তন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘রাজনগর সরকারি ডিগ্রি কলেজের সামনে জনসাধারণের স্থান সংকুলান হবে না, এজন্য জেলা সদরে নিয়ে আসা হয়েছে। তবে রাজনগরে পৌরসভা, গ্যাস সংযোগ স্থাপনসহ যে দাবি আছে, সারা জেলার সব দাবির সঙ্গে তা আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরব।’
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী আগামী বুধবার মৌলভীবাজার সফরকালে শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড এবং রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের উপকারভোগীর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করবেন। রাজনগরে ১৫৫ জন এবং শ্রীমঙ্গলে ১৫২ জন উপকারভোগী পরিবারকে তৃতীয় পর্যায়ের পাইলটিং কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচিত প্রতিটি পরিবার প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা হারে আর্থিক সহায়তা পাবে।
মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম আজ সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কত সুন্দর, ভালো করা যায়; আমাদের সে রকম প্রস্তুতি চলছে।’