‘প্লিজ, ডোন্ট ফায়ার; আই সেইড, ডোন্ট ফায়ার। কোনো ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে যেন আমার গায়ে গুলি লাগে।’ ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের বাঁচাতে পাকিস্তানি সৈন্যদের উদ্দেশে কথাগুলো বলেছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর সৈয়দ মুহম্মদ শামসুজ্জোহা। এরপরই সৈন্যদের বন্দুকের নিশানা হন তিনি। পরে বেয়নেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে তাঁকে হত্যা করা হয়।
উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের প্রাক্কালে যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই আন্দোলন গণ-আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল, তাঁদের অন্যতম একজন শামসুজ্জোহা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী তিনি। ১৮ ফেব্রুয়ারি শামসুজ্জোহার মৃত্যুর পর থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দিবসটি ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি, দিনটি যেন ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস’ হিসেবে সারা দেশে পালন করা হয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর ৫৭ বছর পেরিয়ে গেলেও দিবসটি আজও ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি।
প্রতিবছরের মতো এবারও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ শামসুজ্জোহার মৃত্যুর দিনটিকে ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়েছে। পাশাপাশি এই দিনটিকে ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস’ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। আজ বুধবার সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন ভবন, একাডেমিক ভবনসহ অন্যান্য ভবনে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। সকাল ৯টায় উপাচার্য সালেহ্ হাসান নকীবসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শহীদ শামসুজ্জোহার সমাধি ও জোহা স্মৃতিফলকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট, আবাসিক হল, সাংবাদিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন। সেখানে সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে তাঁরা শামসুজ্জোহার আত্মত্যাগের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন ও সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায় অংশ নেন।
সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত হয় জোহা স্মারক বক্তৃতা। এরপর বেলা ১১টায় শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে (টিএসসিসি) রচনা প্রতিযোগিতা, বাদ জোহর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে কোরআনখানি ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া বাদ আসর শহীদ শামসুজ্জোহা হলে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
১৮ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে উদ্যাপন না করার পেছনে সামগ্রিক ব্যর্থতা আছে বলে মন্তব্য করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি স্মারক বক্তা হিসেবে বলেন, ‘সবার সঙ্গে যদি আমরা তুলনা করি, তাহলে ড. শামসুজ্জোহা হচ্ছেন একেবারেই ব্যতিক্রম ও অনন্য। তিনি একমাত্র শিক্ষক বা বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের সদস্য, যিনি শিক্ষার্থীদের পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। এটি তাঁর আগে কেউ কখনো করেনি, পরেও কেউ করেনি।’
মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘১৮ ফেব্রুয়ারি আমরা জাতীয়ভাবে কেন উদ্যাপন করছি না, এটার পেছনে আমাদের সামগ্রিক একটা ব্যর্থতা আছে। এই দিবসটি জাতীয়ভাবে উদ্যাপন করা উচিত। কারণ, এখানে তিনি ব্যতিক্রম। এ রকম একটি উদাহরণ তো আমাদের দেশে নেই।’
এদিকে সকাল ১০টায় অন্যান্য সংগঠনের পাশাপাশি প্রথম আলো বন্ধুসভার বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্যরা শামসুজ্জোহার সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর সংক্ষিপ্ত আলোচনায় তাঁরা দিনটিকে ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস’ এবং তাঁর আত্মত্যাগ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
বন্ধুসভার সভাপতি সুইটি রাণী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ড. জোহার শাহাদতের পর থেকেই ১৮ ফেব্রুয়ারিকে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। তবে গত ৫৭ বছর ধরে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে এ দিনটিকে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হলেও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।’