আড়াই শ বছরের পুরোনো শ্যামসুন্দর মন্দির, লোকমুখে প্রচার এক রাতেই নির্মাণ
পুরোনো ইটের গায়ে কোথাও টেরাকোটার নকশা ক্ষয়ে গেছে, কোথাও জমেছে শেওলা। দেয়ালের আস্তরণ খসে পড়েছে, ক্ষয়ে গেছে ইটের সিঁড়ি। গাছের শিকড় নেমে এসেছে দেয়াল বেয়ে। নেই সুরক্ষিত সীমানাপ্রাচীর। অরক্ষিত এই পরিবেশের মধ্যেই কয়েক শ বছরের ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মন্দিরটি।
মুঠোফোনের আলো জ্বালিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়। মেঝেতে ছড়িয়ে আছে খসে পড়া ইট ও বালু। ইটের সিঁড়ি বেয়ে দোতলা ও তৃতীয় তলায় ওঠা যায়। তবে ওপরের সিঁড়িগুলো এতটাই ক্ষয়ে গেছে যে প্রতিটি ধাপে পা ফেলতে হয় সাবধানে। দেয়ালের কারুকাজ ও টেরাকোটার অলংকরণের অনেকটাই সময়ের ক্ষয়ে মলিন হয়ে গেছে।
১১ সেপ্টেম্বর সকালে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সীমান্তঘেঁষা সোনাবাড়িয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের অযত্নে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে ঐতিহাসিক শ্যামসুন্দর মন্দিরটি। স্থানীয়ভাবে এটি সোনাবাড়িয়া মঠ বা মঠবাড়ি নামেও পরিচিত। স্থাপত্যশৈলী ও ইতিহাসের দিক থেকে এটি এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তিগুলোর একটি।
দক্ষিণমুখী মন্দিরটির পূর্ব পাশের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই অন্ধকার। ভেতরে রয়েছে একাধিক কক্ষ। দ্বিতীয় তলায় দক্ষিণমুখী একটি কক্ষ এবং তিন দিকে টানা বারান্দা। দক্ষিণ অংশের দেয়ালে পাশাপাশি রয়েছে তিনটি দরজা। তৃতীয় তলায় মাঝখানে একটি কক্ষ, তার ওপরে গম্বুজ। প্রতিটি তলার চার কোণেও রয়েছে চৌকো গম্বুজাকৃতির ছোট ছোট কাঠামো।
মন্দিরের পাশ দিয়ে স্থানীয় মানুষের চলাচলে তৈরি হয়েছে সরু কাঁচা পথ। সামনে ঝোপঝাড়ে ঢাকা একটি পুরোনো পুকুর। পূর্ব কোণে মাটি ও গাছের শিকড়ে ভরা উঁচু একটি ঢিবি। দীর্ঘদিনের অযত্নে পুরো স্থাপনাটির চারপাশ অনেকটা জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়েছে।
কলারোয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার পশ্চিমে সোনাবাড়িয়া গ্রাম। সাতক্ষীরা শহর থেকে দূরত্ব প্রায় ২৬ কিলোমিটার। গ্রামের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এই মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি এই অঞ্চলের কয়েক শ বছরের স্থাপত্য ইতিহাসেরও সাক্ষী।
২৫৯ বছরের পুরোনো মন্দির
স্থানীয়ভাবে সোনাবাড়িয়া মঠ বা মঠবাড়ি নামে পরিচিত হওয়ায় স্থাপনাটির অতীত নিয়েও নানা কথা প্রচলিত আছে। মিজানুর রহমানের ‘সাতক্ষীরার পুরাকীর্তি’ বইয়ে প্রাচীনদের কাছ থেকে পাওয়া একটি ভিন্ন মতের উল্লেখ রয়েছে। বইটির তথ্য অনুযায়ী, বুদ্ধদেবের শিষ্যরা এখানে একটি মঠ তৈরি করেছিলেন বলে একটি মত রয়েছে। তবে এ অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের প্রচার এবং মানুষের বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ কখনো সুবিধাজনক অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি। একপর্যায়ে বুদ্ধদেবের শিষ্যরা সোনাবাড়িয়া ছেড়ে চলে যান। মঠটি কিছুদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকার পর হিন্দুরা এটি পুনর্নির্মাণ করে মন্দিরে রূপান্তর করেন বলেও মতান্তরে উল্লেখ রয়েছে।
তবে বর্তমান মন্দিরটির নির্মাণকাল সম্পর্কে ঐতিহাসিক সূত্রে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। ইতিহাসবিদ সতীশ চন্দ্র মিত্রের ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরটি নির্মাণ করা হয় ১৭৬৭ সালে। মন্দিরের গায়ে থাকা একটি প্রাচীন ইটের লিপির পাঠোদ্ধার করে সতীশ চন্দ্র মিত্র লিখেছেন, রামেশ্বরের পুত্র হরিরাম দাস শ্যামসুন্দর বিগ্রহের জন্য মন্দিরটি নির্মাণ করেন। নির্মাণকাল ১৬৮৯ শকাব্দ, অর্থাৎ ১৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দ।
সতীশ চন্দ্র মিত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, এটি একটি নবরত্ন মন্দির। নিচের তলার চার কোণে চারটি, দ্বিতীয় তলার চার কোণে চারটি এবং সর্বোচ্চ চূড়ায় একটি, মোট নয়টি রত্ন বা চূড়া নিয়ে এর নবরত্ন স্থাপত্যরীতি গড়ে উঠেছে।
মন্দিরটির স্থাপত্যশৈলীর বৈশিষ্ট্য শুধু নয়টি চূড়া বা তিনতলা কাঠামোয় সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষুদ্রাকৃতির ইট, টেরাকোটার অলংকরণ, খিলান দরজা, বাঁকানো কার্নিশ ও বিভিন্ন নকশায় এর বাইরের দেয়াল সাজানো ছিল। ভেতরে ছিল একাধিক কক্ষ ও প্রদক্ষিণের পথ।
মিজানুর রহমানের ‘সাতক্ষীরার পুরাকীর্তি’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরের নিচতলা বর্গাকার। ওপরের দুই তলা ক্রমশ সরু হয়ে উঠেছে। ফলে স্থাপনাটি অনেকটা পিরামিডের মতো। চূড়া পর্যন্ত এর উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট। এতে ১৬টি কক্ষ, চারপাশে টানা বারান্দা এবং খিলানাকৃতির পাঁচটি প্রবেশদ্বার রয়েছে।
সেবায়েতদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, একসময় মন্দিরে সোনার তৈরি রাধা-কৃষ্ণের প্রতিমা ছিল। দোলযাত্রার সময় তৃতীয় তলায় দোলনা ঝুলিয়ে সেই প্রতিমা দোলানো হতো।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
মন্দিরের পাশের সোনাবাড়িয়া গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা শ্রী মহাদেব কুমার বলেন, ‘আমি যখন ক্লাস টুতে পড়ি, তখন রতি ময়রা নামের ৮০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের কাছে মন্দিরটির কথা জানতে চেয়েছিলাম। তিনিও বলেছিলেন, ছোটবেলা থেকে স্থাপনাটি এমনই দেখে আসছেন। একসময় সরকার সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল। এরপর বহু বছর কেটে গেলেও আর কাজ হয়নি।’
মন্দিরের পাশের বাসিন্দা আরতি দে বলেন, ‘সিঁড়িগুলো ভেঙে যাওয়ায় এখন মন্দিরের ওপরে ওঠা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। আগে যে গেট দিয়ে ভেতরে যাওয়া যেত, সেটিও আর আগের মতো নেই। লোকমুখে শোনা যায়, এক রাতে কীভাবে যেন স্থাপনাটি নির্মাণ হয়েছিল। মন্দিরের সামনের পুকুরটিও পুরোনো। মন্দিরের চূড়া থেকে পুকুরের মধ্যে একসময় শিকল ছিল বলে শুনেছি। এখন তো ওসব কিছুই নেই।’
বর্তমান অরক্ষিত অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে মন্দিরের সেবায়েতেরও। সেবায়েত সুব্রপ্রসাদ চৌধুরী বলেন, ‘মন্দির প্রাঙ্গণ সীমানাপ্রাচীর দিয়ে সুরক্ষিত করা দরকার। অরক্ষিত পরিবেশের সুযোগ নিয়ে এখানে অনেক সময় বখাটেরাও ঢুকে পড়ে। প্রতিবাদ করাটাও আমাদের জন্য ভয়ের। সংস্কারের পাশাপাশি মন্দিরের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা জরুরি।’
স্থাপনাটির বর্তমান কাঠামো, নকশা ও স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য বিস্তারিতভাবে নথিবদ্ধ করা হবে। এ বছরের মধ্যে প্রি-ডকুমেন্টেশনের কাজ শুরু করার চেষ্টা করব। ভবনটি বড় হওয়ায় কাজ ধাপে ধাপে করতে হবে।মহিদুল ইসলাম, খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক
সংরক্ষণে লাগতে পারে দুই-তিন কোটি টাকা
মন্দিরটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় রয়েছে। সম্প্রতি মন্দিরটি পরিদর্শন করেছেন খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক মহিদুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘শ্যামসুন্দর মন্দির সংরক্ষণে আমাদের ইচ্ছা আছে। আগে স্থাপনাটির বর্তমান কাঠামো, নকশা ও স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য বিস্তারিতভাবে নথিবদ্ধ করা হবে। এ বছরের মধ্যে প্রি-ডকুমেন্টেশনের কাজ শুরু করার চেষ্টা করব। ভবনটি বড় হওয়ায় কাজ ধাপে ধাপে করতে হবে।’
মহিদুল ইসলাম আরও বলেন, ‘এটি সংরক্ষণে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, দুই থেকে তিন কোটি টাকার কমে মন্দিরটির সংস্কার করা সম্ভব হবে না। প্রথমে যেসব জায়গায় বড় ধরনের সমস্যা হয়েছে, সেগুলো ঠিক করা হবে।’