চাকরি হারিয়ে গ্রামে ফলের চাষ, এখন হোসেনের বাগানে কাজ করেন ৫ জন
একসময় ধান ছাড়া কিছুই চাষ হতো না। অথচ সেই ধানি জমিতেই ফলছে মিষ্টি কুল, আম ও কমলা। ভোলার লালমোহন উপজেলার এক কৃষকের সাহসী সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে এলাকার কৃষিচিত্র। করোনাকালে শহর থেকে গ্রামে ফিরে এসে মো. হোসেন বিশ্বাস (৪৫) প্রমাণ করেছেন—সঠিক পরিকল্পনা ও পরিশ্রম থাকলে ধানি জমিতেও ফলানো যায় স্বাবলম্বিতার গল্প।
ভোলার লালমোহন উপজেলার পূর্ব চরউমেদ গ্রামের হোসেন বিশ্বাস ১৮০ শতাংশ জমিতে গড়ে তুলেছেন একটি মিশ্র ফলের বাগান। এখানে ফল কিনতে এখন আশপাশের এলাকা থেকে মানুষ আসছেন।
মো. হোসেন বিশ্বাসের বাবা জালাল আহমেদ বিশ্বাস (৭১) বলেন, করোনার লকডাউনের সময় তাঁর ছেলে বেকার হয়ে ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরে আসেন। ফল চাষের জন্য জমি চাইলে তিনি প্রথমে রাজি হননি। তাঁর যুক্তি ছিল, ১৮০ শতাংশ জমিতে যেখানে ৬০–৭০ মণ ধান হয়, সেখানে ফল চাষ করে লাভ কী। এমনকি তিনি বলেছিলেন, ‘ফল তো পাখি ছাড়া কেউ খায় না।’ কিন্তু ছেলের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত রাজি হন। এখন বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ বিমুখ করে না, প্রথম বছরেই লাভ হলো। এখন তো আর কথা নেই।’
সরেজমিনে দেখা যায়, ভোলা সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ডাওরী–বাহাদুর চৌমহনী–রায়চাঁদ বাজার সড়কের পূর্ব পাশে ধানি জমিতে মাটি ফেলে কাঁটা মান্দারের ডাল পুঁতে সুপারির চারা লাগানো হয়েছে। মান্দার পাতা পচে সারে পরিণত হয়—এটি ভোলার শত বছরের পুরোনো চাষপদ্ধতি। এই সুপারিবাগানের পাশেই নিয়ম ভেঙে গড়ে উঠেছে মো. হোসেনের মিশ্র ফলের বাগান।
যাঁরা একসময় হোসেন বিশ্বাসকে ‘পাগল’ বলতেন, তাঁরাই এখন ফলের বাগান করার কথা ভাবছেন। লালমোহন ও আশপাশের এলাকা থেকে আসা ক্রেতাদের বাগান থেকে বরই কিনতে দেখা যায়। তাঁদের ভাষ্য, সুপারিবাগানের তুলনায় অন্যান্য ফলের বাগানে আয় অনেক বেশি।
হোসেন ৬০ শতাংশ জমিতে অস্ট্রেলিয়ান জাতের বলসুন্দরী কুল, ৪০ শতাংশে চায়না টকমিষ্টি কুল, ২০ শতাংশে থাই আপেল, ভারত সুন্দরী ও কাশ্মীরি আপেল কুলের চাষ করেছেন। এসব চারা তিনি সংগ্রহ করেছেন রাজশাহীর এক বন্ধুর খামার থেকে। এ ছাড়া বাগানে আছে ১৩০টি হলুদ মাল্টা, ৬০টি দার্জিলিং কমলা ও ১৪০টি বিভিন্ন জাতের আমগাছ।
ভোলায় আগে থেকেই বাউকুল, নারকেলি কুল, টক বোল, মিষ্টি বোল ও খুদে আপেল কুলের চাষ হলেও ২০২২ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে বলসুন্দরী, চায়না টকমিষ্টি ও কাশ্মীরি আপেল কুলের আবাদ শুরু হয়। এসব জাতের ফলন ও দাম দুটিই ভালো। মো. হোসেন এ বছর বাড়ি থেকেই কুল বিক্রি শুরু করেছেন ২০০ টাকা কেজি দরে, বর্তমানে বলসুন্দরী বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকা কেজি।
মো. হোসেন বিশ্বাস বলেন, তিনি দীর্ঘদিন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সদরুল আমিনের অধীনে কাজ করেছেন। সেখান থেকে ফল চাষের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরে মেট্রোরেলে চাকরি করলেও করোনায় বেকার হয়ে পড়েন। তিনি বলেন,‘আল্লাহ প্রথম বছরেই মুখ তুলে তাকিয়েছেন। গত বছর ২২ লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছি। এ বছর শুধু কুল থেকেই ১৮ লাখ টাকার বিক্রি আশা করছি।’
হোসেনের বাগানে পাঁচজন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেন। তাঁদের প্রতিদিন ৮০০ টাকা মজুরি ও চারবার নাশতা দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে তাঁরা নিজেরাও ভবিষ্যতে বাগান করতে পারেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় প্রায় ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে ফলের আবাদ হয়। এর মধ্যে নারকেল, সুপারি, কাঁঠাল ও তরমুজের আবাদ প্রায় ২৯ হাজার হেক্টর। তবে অন্যান্য ফলের ক্ষেত্রে জেলার প্রায় ২১ লাখ মানুষের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। ফলে সারা বছর বাইরের জেলার ওপর নির্ভর করতে হয়।
লালমোহন উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, বেলে দোআঁশ মাটি ও আবহাওয়া বলসুন্দরী, টকমিষ্টি ও কাশ্মীরি আপেল কুলের জন্য খুবই উপযোগী। এমনকি লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও কুল ভালো হয়। তাই বেকার যুবকেরা সহজেই এই চাষে স্বাবলম্বী হতে পারেন। মো. হোসেনের বাগান দেখে ইতিমধ্যে ওই গ্রামের বেকার যুবকেরা প্রায় ১২ একর জমিতে ফলের আবাদ শুরু করেছেন।
ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) কৃষিবিদ এ আর এম সাইফুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে উদ্ভাবিত বলসুন্দরী ও কাশ্মীরি আপেল কুল উচ্চফলনশীল। ভোলার উর্বর জমিতে এসব জাতের ফলন আরও বেশি হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাজারে ফলের সরবরাহ বেড়েছে। ভোলায় ফল চাষের সম্ভাবনা ও চাহিদা—দুটিই আছে। কৃষি বিভাগ ফলের আবাদ বাড়াতে নানা প্রকল্প নিয়ে কৃষকদের পাশে আছে।