তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগামী অর্থবছরে বাজেটে বরাদ্দ দেওয়ার দাবি
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বরাদ্দ দেওয়ার দাবি করেছে ‘তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ’। আজ বুধবার সকালে রংপুরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে এই দাবি করেন সংগঠনের নেতারা। সেই সঙ্গে দাবি বাস্তবায়নে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী। তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলের প্রাণপ্রবাহ তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, এটি এই অঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও কোটি মানুষের জীবন–জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও তিস্তা আজও অবহেলা, বৈষম্য ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের নির্মম শিকার। তিস্তা অববাহিকা খরা, আকস্মিক বন্যা, অসময়ের প্লাবন ও ভয়াবহ নদীভাঙনে বিপর্যস্ত। নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে সমতলের কাছাকাছি চলে এসেছে। বহু বাঁধ ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রতিবছর বন্যা ও ভাঙনে ফসল, ঘরবাড়ি, রাস্তা, অবকাঠামোসহ প্রায় লাখ কোটি টাকার সম্পদ নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। হাজার হাজার পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে। কর্মসংস্থানের অভাবে তিস্তা পাড়ের মানুষ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গার্মেন্টস ও অস্থায়ী শ্রমবাজারে ছুটে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, রংপুর অঞ্চল দেশের অন্যতম প্রধান খাদ্যভান্ডার। ধান, আলু, ভুট্টা, গম, পেঁয়াজ, মরিচ, শাকসবজি, চিনাবাদাম ও বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের বড় অংশ উৎপাদিত হয় এই অঞ্চলে। দেশের খাদ্য উৎপাদন, পোলট্রি ও পশুখাদ্যশিল্পে রংপুর অঞ্চলের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সেচের সংকট, নদীভাঙন, পানির অনিশ্চয়তা, সংরক্ষণাগারের অভাব ও কৃষিভিত্তিক শিল্প না থাকায় কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে শুধু একটি নদীর রক্ষা হবে না, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী হবে। কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠে নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি নতুন শক্তি পাবে।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পানিসম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হবে বলে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের সামনে ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ঘোষণার পরও বাস্তব অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। বরং তিস্তার প্রশ্নে বর্তমান সরকারের অভ্যন্তরে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সামনে আসছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ত্রাণমন্ত্রীর ইতিবাচক অবস্থানের বিপরীতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য জনগণের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, ‘আমরা পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, তিস্তা কোনো ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় নয়। তিস্তা উত্তরাঞ্চলের মানুষের বাঁচা-মারার প্রশ্ন। তাই আমরা আগেও বলেছি, এখনো বলছি, চীন-ভারত-আমেরিকা বুঝি না, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিজস্ব অর্থায়নেই করতে হবে। আসন্ন বাজেটে এই অর্থ বরাদ্দ চাই।’
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ছয় দফা দাবি
তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ ২০১৫ সাল থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে আসছে। সংগঠনটি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ছয় দফা দাবি করেছে। দাবিগুলো হলো একনেক সভায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা অনুমোদন করে প্রথম পর্যায়ের কাজ অবিলম্বে শুরু করতে হবে এবং সময়বদ্ধ বাস্তবায়ন রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। আসন্ন জাতীয় বাজেটে তিস্তা মহাপরিকল্পনার জন্য বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে নিজস্ব অর্থায়নের ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। নদী প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, পরিবেশবিদ জলবায়ু গবেষক ও আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্বশাসিত কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে।
তিস্তা অববাহিকায় কৃষক সমবায়ের ভিত্তিতে হিমাগার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, কৃষিভিত্তিক কলকারখানা ও রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে হবে, যাতে কৃষক ন্যায্য মূল্য পান এবং স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। তিস্তার পাথর ও বালু উত্তোলনের সরকারি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সেই আয় তিস্তা প্রকল্প ও নদী সংরক্ষণে বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের অংশগ্রহণমূলক অর্থায়নের জন্য ‘তিস্তা বন্ড’ চালু করতে হবে। তিস্তা তীর সংরক্ষণ, সেচ খাল সম্প্রসারণ, শাখা- উপনদী পুনঃখনন, জলাধার নির্মাণ এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হয়।
দাবি বাস্তবায়নে কর্মসূচি ঘোষণা
তিস্তা মহাপরিকল্পনার দাবি বাস্তবায়নে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে ২৬ মে পর্যন্ত তিস্তা পাড়ের জনপদে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় ও গণসংযোগ কর্মসূচি করা হবে। পবিত্র ঈদুল আজহার ঈদ জামাতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ মোনাজাত করা হবে। আগামী ৫ জুন আসন্ন বাজেটে বিভাগীয় নগর রংপুরে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজকে নিয়ে সংহতি সমাবেশ করা হবে। এ ছাড়া জুনে মাসব্যাপী তিস্তা পাড়ের ৫ জেলার ১২ উপজেলায় কর্মশালা, লিফলেট বিতরণ, হাটসভা, পথসভা, গণ সমাবেশ ও মশাল প্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করা হবে।
তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা বলেন, গত বছরের ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের উদ্যোগে গণ–অবস্থান কর্মসূচির সমাপনী দিনে লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, ক্ষমতায় গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। স্থানীয় বাসিন্দারা চান, প্রধানমন্ত্রী তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাবেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আলী, সাদেকুল ইসলাম, বখতিয়ার হোসেন (শিশির), শেখ রেজওয়ান, আলমগীর কবির ও মোহাম্মদ আশিকুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।