সময়ের মুখ
আমরা বিপন্ন প্রাণীর কণ্ঠ হতে চেয়েছি
বিশ্ব বানর দিবস উপলক্ষে গত বুধবার সিলেট শহর ও শহরতলির ছয়টি এলাকায় বানরকে খাবার দিয়েছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘প্রাধিকার’। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য, কর্মসূচিসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন সাধারণ সম্পাদক আরিজ আহম্মেদ। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুমনকুমার দাশ।
প্রশ্ন :
বানরের খাদ্য ও আবাসস্থল নিরাপদ করার চিন্তা এল কীভাবে?
আরিজ আহম্মেদ: ২০১৮ সালে সিলেটে আসি, তখন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশে ইকো–পার্ক ও বানরটিলায় অনেক বানর ছিল। এখন এই প্রাণীর সংখ্যা কমছে, যা চোখে পড়ার মতো। এর আগে দুবার এসব এলাকায় খাবার নিয়ে গিয়েও বানর না পেয়ে ফিরে আসি। এটা আমাদের ভাবায়। তাই এবারের বিশ্ব বানর দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নিই। মানুষ ও বানরের মধ্যে বর্তমানে কী রকম সম্পর্ক, কেন বানরের সংখ্যা কমছে, আবাসস্থলে কী কী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, এসব বিষয় মাঠ পর্যায় থেকে বের করে আনতেই এ কর্মসূচি হাতে নিই।
প্রশ্ন :
আপনারা অন্যান্য প্রাণীর অধিকার সুরক্ষায়ও কাজ করছেন। কী কী কাজ করছেন?
আরিজ আহম্মেদ: প্রাণিকল্যাণ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ‘প্রাণী বাঁচুক, বাঁচুক পৃথিবী’ স্লোগানে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সিলেট অঞ্চলে বন্য প্রাণীর সুন্দর আবাসস্থল প্রাকৃতিকভাবেই রয়েছে। তবে দিন দিন প্রাকৃতিক সম্পদ বিলীন হচ্ছে। আমরা বিপণ্ন প্রাণীর কণ্ঠ হতে চেয়েছি। বন্য প্রাণী যেখানেই আটক হচ্ছে, সেগুলো উদ্ধারের চেষ্টা করছি। বন্য প্রাণীর আবাসস্থল যাতে নিরাপদ থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখা, রাস্তায় আহতÑকুকুর ও বিড়াল উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়া, বৃক্ষরোপণ, বিভিন্ন প্রাণীর দিবস পালন, মানুষের মধে৵ সচেতনতা তৈরি, প্রাণীর টিকাদানসহ বিভিন্ন কাজ করছি।
প্রশ্ন :
গত জুন মাসে সিলেট অঞ্চলে যে ভয়াবহ বন্যা হলো, তখন গবাদিপশুর চিকিৎসা দিয়েছেন...
আরিজ আহম্মেদ: শুরুতে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে অসহায় মানুষদের সহায়তা দেওয়া শুরু করি। পরে দেখা যায়, সবাই মানুষকেই শুধু সহায়তায় করছেন, মানুষের সঙ্গে যে অসহায় গো-প্রাণী রয়েছে, সেগুলোর অসহায়ত্ব নিয়ে কারও ভাবনা নেই। পানিতে ফসলি জমি ও গোচারণভূমি তলিয়ে যাওয়ায় গোখাদ্যের সংকট দেখা দেয়। আমরা তখন অসহায় প্রাণীগুলোর দিকে এগিয়ে যাই। সেগুলোকে চিকিৎসা দিই। সেসব প্রাণীর মালিকদের মধে৵ বিনা মূল্যে খাদ্য বিতরণ করি। অনেকে তখন আমাদের এ কাজে সহযোগিতা করেন।
প্রশ্ন :
বিপন্ন বা আহত প্রাণী ও পাখি উদ্ধার করে বনাঞ্চলে অবমুক্ত করেন। এ বিষয়ে যদি বলতেন।
আরিজ আহম্মেদ: সমাজে কিছু মানুষের মধ্যে প্রাণী নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা ও ভয় কাজ করে। ফলে প্রায়ই দেখা যায়, সেসব প্রাণী আটক করা হচ্ছে, পাচার করা হচ্ছে বা মারা হচ্ছে। খবর পেলে তাৎক্ষণিক সেসব প্রাণী উদ্ধারের চেষ্টা করি। তবে বর্তমানে মানুষের সচেতনতাও বেড়েছে।
প্রশ্ন :
‘পাখির জন্য ভালোবাসা’ নামেও একটি কর্মসূচি আপনারা নিয়মিত পালন করেন...
আরিজ আহম্মেদ: প্রতিবছর ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে এ কর্মসূচি পালন করি। বর্তমানে বনভূমি ও গাছপালা উজাড়ের ফলে পাখির বাসস্থান হুমকির মুখে। আমরা এ কর্মসূচির আওতায় উঁচু গাছে পাখির বাসা বানিয়ে দিই। আগামী দিনে এ কর্মসূচি আরও বড় পরিসরে করা হবে।
প্রশ্ন :
প্রাণী অধিকার রক্ষায় কোনো সচেতনতা কর্মসূচি পালন করেন?
আরিজ আহম্মেদ: প্রতিবছর ‘সেভ দ্য ফ্রগস’ কর্মসূচি পালন করি। এর আওতায় সভা-সেমিনার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বাড়ানো, প্রচারপত্র বিতরণসহ বেশ কিছু কর্মসূচি নিয়ে থাকি। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রাণিবিষয়ক দিবসে সেমিনার করি, মাঠপর্যায়ে মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করি।
প্রশ্ন :
সব শেষে কোনো বার্তা দিতে চান?
আরিজ আহম্মেদ: সুন্দর পৃথিবী কল্পনা করলে সেখানে শুধু নিজেদের নিয়ে চিন্তা না করে পরিবেশ ও এর বিভিন্ন সদস্য— বন্য প্রাণীকে নিয়ে ভাবা উচিত। পরিবেশ বাঁচাতে একটি সুশৃঙ্খল বাস্তুসংস্থান জরুরি। সবাই একসঙ্গে কাজ করলে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।