কার্তিকের ভোরে আলো ফুটতেই জাগে শামুকখোলের ঝাঁক
ভোর হয়েছে মাত্র। আকাশে আলো ফুটছে ধীরে ধীরে। হেমন্তের হালকা ঠান্ডায় অনেকেই তখনো ঘুমিয়ে আছেন। কিন্তু ঘুম ভেঙে গেছে একঝাঁক শামুকখোল পাখির। কোনোটি ডাকছে, ডানা ঝাপটাচ্ছে, কোনোটি আবার উড়ে যাচ্ছে এক গাছ থেকে আরেক গাছে। পাখির কলরবে মুখর হয়ে উঠেছে পথের ধারের কয়েকটি বাড়ি।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ইসলামপুর এলাকায় মৌলভীবাজার–কুলাউড়া সড়কের পাশে এমন দৃশ্য এখন প্রায় প্রতিদিনের। একাধিক বাড়ির গাছপালা ও বাঁশঝাড়ে বাসা বেঁধেছে শামুকখোলের ঝাঁক। পুকুরের জলে পড়েছে পাখিসহ গাছপালার ছায়া। বাড়ির ছোট্ট একটুকরা বাগান যেন হয়ে উঠেছে পাখির অরণ্য।
গত শনিবার ভোরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সড়ক দিয়ে মাঝেমধ্যে ছুটে যাচ্ছে দূরপাল্লার বাস, পণ্যবোঝাই ট্রাক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা। পুব আকাশে ফুটছে সিঁদুর রঙের আলো। এর মধ্যেই গাছের ডালে ডালে পাখির ডাক। আলো যত বাড়ে, পাখির ব্যস্ততাও তত বাড়ে। একসময় দল বেঁধে তারা উড়ে যায় মাঠ ও হাওরের দিকে। সারা দিন খাবার খুঁজে বিকেলে ফিরে আসবে নিজেদের এই আস্তানায়।
আগের দিন শুক্রবার বিকেলেও সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়ে দৃশ্যটি। তখন একে একে ঘরে ফিরছিল পাখিরা। বাড়িগুলোর ওপর অনেক শামুকখোল ডানা মেলে চক্কর দিচ্ছিল, এরপর বসে পড়ছিল গাছের ডালে।
শনিবার ভোরে ইসলামপুরে ধানখেতে আগাছা পরিষ্কার করতে কাস্তে হাতে বেরিয়েছিলেন কৃষক মোশাররফ হোসেন। কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, এখানে কেউ পাখি শিকার করে না। সারা বছর পাখি থাকে। শুধু এই সড়কের পাশে নয়, কাছের উত্তরমুলাইম, মল্লিকসরাইসহ কয়েকটি গ্রামের বাড়িতেও পাখিদের এমন আস্তানা আছে। কথা বলতে বলতেই তিনি তাঁর খেতের কাজে চলে গেলেন।
মাঠের ভেতরের সড়ক ধরে মৌলভীবাজার–কুলাউড়া সড়কের দিকে বাইসাইকেলে যাচ্ছিলেন রোম্মান মিয়া। কথা বলতে চাইলে সাইকেল থামিয়ে তিনি বলেন, বিকেলে মাঠ ও বাড়ির ওপর অনেক পাখি উড়তে থাকে, দেখতে খুব সুন্দর লাগে। সন্ধ্যা ঘনালে তারা গাছে গাছে বসে যায়। প্রায় পাঁচ-ছয় বছর ধরে তিনি এ এলাকায় পাখিদের এভাবে আসা–যাওয়া দেখছেন।
শামুকখোল বড় আকারের সারসজাতীয় জলচর পাখি। দেখতে অনেকটা বকের মতো। জলাভূমি, হাওর–বাঁওড় ও ধানখেতে এদের বিচরণ বেশি। এদের ঠোঁটের গড়ন বিশেষ ধরনের, যা দিয়ে শামুকের খোলস ভেঙে ভেতরের নরম অংশ খেতে পারে। সম্ভবত এ কারণেই কোথাও কোথাও এরা ‘শামুকভাঙরি’ নামেও পরিচিত।
সাধারণত শামুকখোলের গায়ের রং ধূসর–সাদা, লেজ ও ডানা কালো। তবে প্রজননকালে একেবারে সাদা হয়ে যায়। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এদের প্রজননকাল। এ সময় গাছে বাসা বেঁধে দুই থেকে পাঁচটি সাদা ডিম পাড়ে। এরা ঝাঁক বেঁধে চলে, প্রতিটি ঝাঁকে থাকে ৪০ থেকে ৬০টি পাখি। শামুকখোলের দুটি প্রজাতি আছে, এশীয় শামুকখোল ও আফ্রিকান শামুকখোল।
বাংলাদেশে দেখা মেলে এশীয় শামুকখোলের। শামুক ও ঝিনুকজাতীয় প্রাণী এদের প্রধান খাবার। সুযোগ পেলে জলাশয় থেকে ছোট ব্যাঙ, কাঁকড়া ও জলজ পোকামাকড়ও খায়। প্রকৃতিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের তালিকায় শামুকখোল ‘কম সংকটাপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশে পাখিটি আইনগতভাবে সংরক্ষিত।
সকাল ততক্ষণে বেশ আলোকিত। শামুকখোলের ছোট ছোট ঝাঁক দল বেঁধে চলে গেছে দূরে। যারা তখনো গাছে ছিল, তারা ডাল বেয়ে নিচে, পাতার আড়ালে নেমে যেতে থাকে। গাছে গাছে পাখি থাকলেও তখন আর তেমন দেখা যায় না। গাছপালা আর বাঁশবন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে।