গত শনিবার অনলাইনে জুয়া খেলা ও মাদক ব্যবসার অভিযোগে গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস পেয়ারাবাগান এলাকার সুতা ব্যবসায়ী রবিউল ইসলামসহ (৪৫) চারজনকে ধরে আনে বাসন থানার পুলিশ। টাকা দিয়ে অন্য তিনজন ছাড়া পান। কিন্তু দাবি করা টাকা না দেওয়ায় রবিউলকে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ নিহত ব্যক্তির স্বজনদের। এ ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার সকালে এলাকাবাসী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এ সময় পুলিশের মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেন। এ ঘটনায় পুলিশের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে।

পেয়ারাবাগান এলাকার মুদি ব্যবসায়ী শামিম হোসেন বলেন, ‘আমি ও আমার ছোট ভাই শরিফ হোসেন স্থানীয় একটি বাড়িতে ভাড়া থাকি। ১২ জানুয়ারি রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে হঠাৎ ঘরের দরজায় কেউ ধাক্কা দেয়। দরজা খুলেই বাসন থানার এএসআই মাহবুব হোসেনকে দেখি। এ সময় স্যার কী হয়েছে জানতে চাইলে এএসআই মাহবুব আমার ছোট ভাইয়ের কাছে ইয়াবা আছে বলে তাকে ধরে নিয়ে যায়। পরে ভাইকে ছাড়ানোর জন্য তিনি (এএসআই মাহবুব) এক লাখ টাকা দাবি করেন। পরে ২০ হাজার টাকা দিয়ে আমি ছোট ভাইকে ছাড়িয়ে আনি।’ 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘গত ২ ডিসেম্বর মধ্যরাতে এএসআই মাহবুবসহ কয়েকজন পুলিশ চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় আমার বাড়িতে হানা দেয়। আমি আগে থেকেই বাড়িতে ছিলাম না। তখন আমার স্ত্রীর ফোন দিয়ে আমাকে ফোন করে মাহবুব আমার কাছে এক লাখ টাকা দাবি করে। তখন তাদের বলি, এখন ঘরে টাকা নেই কাল থানায় পাঠিয়ে দেব। কথামতো পরদিন বেশ কয়েকবার ফোন দেওয়ায় বাধ্য হয়ে এক লাখ টাকা থানায় পাঠিয়ে দিয়ে রক্ষা পাই।’

 গত শনিবার রাতে এএসআই মাহবুব হোসেন ও নূরুল ইসলাম সুতা ব্যবসায়ী ব্যবসায়ী রবিউল ইসলামকে তুলে নিয়ে যান। মঙ্গলবার মধ্যরাতে পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁর স্ত্রী নূপুর বেগমকে জানানো হয়, রবিউল ইসলাম সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। 

 সুতা ব্যবসায়ী রবিউল ইসলামের বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার শাহজাদপুর গ্রামে। তিনি গাজীপুর শহরে একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। রবিউলের পাশের কক্ষে ভাড়া থাকেন মো. শাকিল। তিনি বলেন, শনিবার রাতে চারজনকে ধরে নিয়ে যান এএসআই নূরুল ইসলাম ও মাহবুব হোসেন। পরে তিনজনকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। পুলিশ রবিউলের পরিবারের কাছে প্রথমে এক লাখ টাকা দাবি করে। পুলিশের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রবিউলের স্ত্রী নূপুর বেগম থানায় গিয়ে ৩৫ হাজার টাকা দেন। পরে পুলিশ নূপুরের কাছে আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে। তিনি আরও বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে রবিউলকে ছেড়ে দেবে বলে নূপুরকে থানায় ডেকে নেওয়া হয় এবং সাদা কাগজে তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এরপর পুলিশ নূপুরকে জানায়, রবিউলকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বাড়ি যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এরপর পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারেন, রবিউল মারা গেছেন।’ এ ঘটনার পর বাসন থানার এএসআই মাহবুব হোসেন ও নূরুল ইসলামকে প্রত্যাহার এবং তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে গাজীপুর মহানগর পুলিশ। 

বাসন থানার পুলিশের বিরুদ্ধে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত কোনো পুলিশ সদস্যকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ব্যবসায়ীর মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত হচ্ছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রবিউল ইসলামের লাশ রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় রবিউলের নিজ গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে গতকাল বুধবার রাত ১১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গ থেকে রবিউলের স্বজনেরা লাশ গ্রহণ করেন।

রবিউল ইসলামের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর ছোট ভাই মহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে গত বুধবার দিবাগত রাত ১১টায় বাসন থানায় একটি মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাত ট্রাকচালককে আসামি করা হয়েছে।

পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যুর অভিযোগ ওঠার পরও সড়ক দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করে মামলা করার বিষয়ে জানতে চাইলে রবিউলের শ্যালক রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘রবিউলের পরিবার থেকে কেউ অভিযোগ দিতে চাইছে না। কেউ আর কোনো ঝামেলায় যেতে চাইছি না। এখন আসলে ওরা (রবিউলের পরিবার) পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। এখন তো আর তাঁকে (রবিউল) ফিরে পাওয়া যাবে না। তাই এইটা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করলে হয়তো আপনাদেরও দৌড়াতে হবে, ফ্যামিলিকেও দৌড়াতে হবে। যে অভিযোগ করবেন, তাঁকেও দৌড়াতে হবে।’