‘আমার পুত কোনো সময়ও এই পথের (চোরাকারবার) আছিল না। লোভে পড়ি বর্ডারে গিয়া ছেলেটা গুলি খাইয়া মরল। আমার বুকটা খালি হই গেল।’ বিলাপ করে কথাগুলো বলছিলেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে নিহত তারা মিয়ার (২০) মা আজিরুন্নেছা (৫৫)।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের মুরইছড়া বস্তি এলাকায় তাঁদের বাড়ি। পাশের পৃথিমপাশা ইউনিয়নের মাগুরুলি সীমান্ত দিয়ে গত শনিবার গভীর রাতে একদল লোক ভারতে ঢুকে পড়ে। তারা মিয়াও ওই দলে ছিলেন। বিএসএফের গুলিতে তিনি ঘটনাস্থলে নিহত হন।
গতকাল রোববার বিকেলে মুরইছড়া বস্তি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ইটের দেয়াল আর টিনের চালা দেওয়া তারা মিয়াদের ঘর। ঘরের ভেতর থেকে থেমে থেমে কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। একপর্যায়ে স্বজনেরা বাইরে বেরিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে তারা মিয়া ছোট ছিলেন। তাঁদের পরিবার সচ্ছল। বড় দুই ভাই রাজু মিয়া ও রাজ্জাক মিয়ার মালামাল পরিবহনের তিনটি ট্রাক আছে। তারা মিয়া গাড়ি চালানো জানতেন। মাঝেমধ্যে ভাইদের গাড়ি চালাতেন।
তারার বাবা আবদুল মালেক বলেন, গত শনিবার রাত দুইটার দিকে সুমন নামের এলাকার এক যুবক সীমান্তে কাজের কথা বলে তারাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান। এ সময় মানা করলেও তারা শোনেননি। পরদিন রোববার সকালে সীমান্তে তারার মৃত্যুর খবর পান তাঁরা। এরপর স্বজনেরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। স্থানটি ভারতের অংশে থাকায় লাশের কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব হয়নি।
এলাকার ২০-২৫ জন তরুণ-যুবক চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত। তাঁরা ভারত থেকে চোরাই পথে বিড়ি, সিগারেটসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য পাচার করে আনেন। তবে তাঁরা শুধু মালামাল পরিবহনের কাজ করেন।
নিজেদের পরিবারের সচ্ছলতার কথা তুলে ধরে তারার বড় ভাই রাজু মিয়া বলেন, ‘আমরা তো অভাবী (গরিব) নায়। সবার ছোট হওয়ায় তারে (তারা) হখলে মায়া করতা। রুজিরোজগার নিয়া কোনো টেনশন করা লাগত না। এরপরও কিতার লাগি, কার কুবুদ্ধিতে ভাইটা এই কামে (চোরাকারবার) গেল, মাথায় ঢুকে না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় চার-পাঁচজন বলেন, এলাকার ২০-২৫ জন তরুণ-যুবক চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত। তাঁরা ভারত থেকে চোরাই পথে বিড়ি, সিগারেটসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য পাচার করে আনেন। তবে তাঁরা শুধু মালামাল পরিবহনের কাজ করেন। মালামালের মালিক বাইরের লোকজন। মালামাল পরিবহনে মাথাপিছু এক হাজার টাকা করে মজুরি পাওয়া যায়। এ কাজে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকার লোকজনও জড়িত।
চোরাকারবারে জড়িত থাকার অভিযোগে নিহত তারা মিয়ার বিরুদ্ধে কুলাউড়া থানায় মামলাও রয়েছে।কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ
মুরইছড়া বস্তি এলাকার গ্রাম্য সরদার ইউসুফ আলী বলেন, চোরাকারবারে না যেতে এলাকার দরিদ্র লোকজনকে তাঁরা বারবার অনুরোধ করেন। এরপরও কিছু লোক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ কাজে জড়িয়ে যান। অথচ বাইরে যেকোনো স্থানে দিনমজুরি খেটে ৭০০-৮০০ টাকা পাওয়া যায়।
মাগুরুলি সীমান্ত বিজিবির ৪৬ ব্যাটালিয়নের আওতায়। শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত ওই ব্যাটালিয়নের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ বলেন, সীমান্তে চোরাচালান প্রতিরোধে তাঁদের কড়া নজরদারি রয়েছে। নিহত তারা মিয়া চোরাকারবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর স্বজনেরাও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তারা মিয়ার লাশ ভারতীয় পুলিশ নিয়ে গেছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তারা স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করবে। চোরাকারবারে জড়িত থাকার অভিযোগে নিহত তারা মিয়ার বিরুদ্ধে কুলাউড়া থানায় মামলাও রয়েছে।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ জহিরুল ইসলাম বলেন, চোরাকারবারে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২৫ সালে বিজিবির পক্ষ থেকে ওই মামলা করা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন।