উচ্ছ্বাসে শুরু গণিত উৎসবের চট্টগ্রাম পর্ব
কনকনে শীত উপেক্ষা করে গণিতের টানে ছুটে এসেছে হাজারো কিশোর-কিশোরী। আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর কৌতূহলের মিলনে মুখর হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম নগরের সেন্ট প্ল্যাসিডস্ স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণ। আজ শনিবার সকালে এখানেই শুরু হয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক-প্রথম আলো গণিত উৎসবের চট্টগ্রাম পর্ব।
সকাল সাড়ে ৯টায় জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জাতীয় পতাকা, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা ও আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন সেন্ট প্ল্যাসিডস্ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ব্রাদার স্যামুয়েল সবুজ বালা ও ব্রাদার সনেট ফ্রান্সিস রোজারিও। বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এস এম নছরুল কদির এবং আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক বিশ্বজিৎ চৌধুরী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডাচ্–বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপক রঞ্জন বড়ুয়া। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো চট্টগ্রাম বন্ধুসভার সভাপতি রুমিলা বড়ুয়া।
‘গণিত শেখো, স্বপ্ন দেখো’—এই স্লোগানে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় উৎসবটির আয়োজন করেছে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি। সহযোগিতায় রয়েছে প্রথম আলো চট্টগ্রাম বন্ধুসভা।
জমজমাট প্রাঙ্গণ
সকাল আটটার আগেই শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। নগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এবারের উৎসবে অংশ নেয় প্রায় ১ হাজার ৩০০ শিক্ষার্থী। অনেকের সঙ্গে ছিলেন অভিভাবকেরাও।
গণিত উৎসবের মতো আয়োজন শিক্ষার্থীদের চিন্তা করার ক্ষমতা বাড়ায়। এখানে তারা শুধু অঙ্ক শেখে না, যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখে। আনন্দের মধ্য দিয়ে শেখার এই সুযোগ শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। তাই ভয় নয়, ভালোবাসা নিয়ে গণিত শিখতে হবে।
সকালে উৎসব প্রাঙ্গণে হাজির হয় শায়ান আহমেদ। কক্সবাজারের বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির এই শিক্ষার্থী উৎসবে অংশ নিতে আগের দিন শুক্রবার বিকেলে পরিবারের সঙ্গে চট্টগ্রামে আসে। শায়ান জানায়, গণিত তার খুব প্রিয় বিষয়। ‘এখানে এসে আমার খুব ভালো লাগছে,’ বলে সে।
নগরের আগ্রাবাদ থেকে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনি উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. আরিয়ান আরাফ। আগেও এই উৎসবে অংশ নিয়েছিল সে। তখন অনেক কিছু শিখেছিল বলে জানায় আরিয়ান। তার কাছে প্রশ্ন-উত্তর পর্বটি সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য।
ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী উম্মে সারা জাফরিন গত বছরও গণিত উৎসবে অংশ নিয়েছিল। এবার সে সকাল ৯টার আগেই উৎসব প্রাঙ্গণে উপস্থিত। জাফরিন জানায়, তার বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীই এবার এসেছে। তবে তার প্রস্তুতি ছিল দীর্ঘদিনের। সে প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হতে চায়।
চাচা ও ভাইয়ের হাত ধরে সকালে উৎসব প্রাঙ্গণে আসে মোস্তফা আবরার। প্রেসিডেন্সি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির এই শিক্ষার্থী জাতীয় সংগীতে অংশ নিতে সারির একেবারে সামনে দাঁড়ায়। এক ফাঁকে সে জানায়, যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ—এই অঙ্কগুলো তার কাছে খুবই সহজ।
উৎসব প্রাঙ্গণে বসেছে ল্যাব বাংলা, স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশন, তৌফিক প্রকাশনী, রকমারি, বাংলার ম্যাথ স্টল। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা ঘুরে ঘুরে দেখছেন বই, কিনছেন গণিত আর ধাঁধার বই।
‘গণিতের ভয় কাটাতে হবে’
উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এস এম নছরুল কদির বলেন, ‘আজকের এই গণিত উৎসব শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি স্বপ্ন দেখার একটি মঞ্চ। এখানে তোমরা যারা এসেছ, তারা সবাই আলাদা আলাদা সম্ভাবনা নিয়ে এসেছ। গণিত অনেকের কাছে কঠিন মনে হতে পারে, ভয়ও লাগতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ভয়কে জয় করলেই সামনে এগোনো যায়।’
আফসোস নিয়ে এস এম নছরুল কদির বলেন, ‘ছাত্র থাকা অবস্থায় আমরা এ ধরনের সৃজনশীল আয়োজনে অংশ নিতে পারিনি। কারণ, তখন এসব আয়োজন হতো না। তাই তোমরা খুবই ভাগ্যবান। গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়া অনেকেই দেশ-বিদেশে সুনাম কুড়িয়েছে। তোমরাও একদিন আন্তর্জাতিক পদক নিয়ে আসবে।’
সেন্ট প্ল্যাসিডস্ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ব্রাদার স্যামুয়েল সবুজ বালা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘গণিত উৎসবের মতো আয়োজন শিক্ষার্থীদের চিন্তা করার ক্ষমতা বাড়ায়। এখানে তারা শুধু অঙ্ক শেখে না, যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখে। আনন্দের মধ্য দিয়ে শেখার এই সুযোগ শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। তাই ভয় নয়, ভালোবাসা নিয়ে গণিত শিখতে হবে।’
উপাধ্যক্ষ ব্রাদার সনেট ফ্রান্সিস রোজারিও বলেন, গণিত উৎসবের মতো আয়োজন শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দের। অনেকেই গণিতে ভয় পায়, কিন্তু নিয়মিত চর্চা করলে সেই ভয় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
সাহিত্যিক ও সাংবাদিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, ‘গণিত চর্চা মানে শুধু অঙ্ক কষা নয়, এটি চিন্তা করার শক্তি বাড়ায়, যুক্তি শেখায়, সমস্যা সমাধানের সাহস দেয়। নিয়মিত অনুশীলন, কৌতূহল আর অধ্যবসায় থাকলে অসম্ভব বলে কিছু থাকে না। তোমাদের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা একটাই, স্বপ্ন দেখবে, পরিশ্রম করবে, কখনো হাল ছেড়ে দেবে না।’
ডাচ্–বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপক রঞ্জন বড়ুয়া বলেন, ‘গণিতচর্চা ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিত ও যুক্তিবোধের চর্চা ছড়িয়ে দিতে এই উৎসবের পাশে আছে। আনন্দের মধ্য দিয়ে শেখার এই আয়োজন থেকে শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাস ও অনুপ্রেরণা পাবে, এটাই আমাদের বিশ্বাস।’
উদ্বোধনের পর সকাল ১০টা ৩০ মিনিট থেকে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষে গণিতের পরীক্ষা শুরু হয়। পরীক্ষার পর বন্ধুসভার সদস্যদের পরিবেশনায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এরপর শিক্ষার্থীদের প্রশ্নোত্তর পর্ব। পাশাপাশি চলবে খাতা মূল্যায়নের কাজ।