স্বামী হত্যায় দণ্ডপ্রাপ্ত স্ত্রী বললেন, ‘যত খুশি মন চায় ভিডিও করেন, দেহুক সবাই’
ময়মনসিংহে যুবলীগের এক কর্মীকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে শ্বাস রোধ করে হত্যার দায়ে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সেই সঙ্গে তাঁকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আজ বুধবার দুপুর ১২টার দিকে ময়মনসিংহের বিশেষ দায়রা জজ ফারহানা ফেরদৌস আসামির উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত নারীর নাম আফরোজা শেখ ওরফে ইতি। তিনি নিহত যুবলীগ নেতা শফিকুল ইসলাম ওরফে সপুর (২৫) দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন।
রায় ঘোষণার পর আসামিকে আদালত থেকে ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। এজলাশ থেকে বের করার সময় আফরোজাকে বিমর্ষ হওয়ার বদলে হস্যোজ্জ্বল দেখা যায়। কারাগারে পাঠানোর সময় সাংবাদিকদের উদ্দেশে হাসতে হাসতে বলতে থাকেন, ‘যত খুশি মন চায় ভিডিও করেন, দেহুক সবাই।’
আমি আসামির মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করেছিলাম। রায় হওয়ার পর আসামি হাসতে হাসতে গেল, বলতে থাকল, “চিন্তা কইরো না, আমি আবার আইতাছি। আবার আয়া খেলবাম।” আমাদের নিরাপত্তা দেওন লাগব। রায়ে আমি সন্তুষ্ট না, এই বিচার আমি মানি না।নুরুন্নাহার, মামলার বাদী ও নিহত শফিকুল ইসলামের মা
রায়ের পর নিহত শফিকুল ইসলামের মা ও মামলার বাদী নুরুন্নাহার জানান, তিনি আসামির মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে হত্যার ঘটনার পর তিন দিন ধরে খোঁজাখুঁজির নাটক করে আফরোজা। আমার ছেলে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছে। আমি আসামির মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করেছিলাম। রায় হওয়ার পর আসামি হাসতে হাসতে গেল, বলতে থাকল, “চিন্তা কইরো না, আমি আবার আইতাছি। আবার আয়া খেলবাম।” আমাদের নিরাপত্তা দেওন লাগব। রায়ে আমি সন্তুষ্ট না, এই বিচার আমি মানি না।’
আদালত ও মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, নগরের বাঁশবাড়ী কলোনি এলাকার বাসিন্দা সুরুজ মিয়ার ছেলে শফিকুল ইসলাম প্রথমে মাহমুদা আক্তারকে বিয়ে করেন। তাঁদের একটি ছেলেসন্তান রয়েছে। পরে প্রথম বিয়ের বিষয়টি গোপন রেখে আফরোজা শেখকে বিয়ে করেন শফিকুল। একপর্যায়ে আফরোজা জানতে পারেন, তাঁর স্বামী প্রথম স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন তিনি। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে কলহের সৃষ্টি হয়। ওই বিরোধের জের ধরে ২০১৯ সালের ১০ জুন আফরোজা শেখ পরিকল্পিতভাবে স্বামীকে প্রায় ২০০টি ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করেন। পরে ওড়না দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে মরদেহ কাঁথা দিয়ে পেঁচিয়ে বাড়ির পাশের একটি পচা পুকুরে কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে রাখেন।
ঘটনার তিন দিন পর স্থানীয় লোকজন পুকুরে মানুষের একটি হাত ভেসে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
এ ঘটনায় শফিকুলের মা নুরুন্নাহার বাদী হয়ে ২০১৯ সালের ১৩ জুন ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় পুত্রবধূ আফরোজা শেখ ও তাঁর বড় ভাই দীন ইসলামকে আসামি করা হয়েছিল। পুলিশ তদন্ত শেষে ২০২০ সালে ৩ ফেব্রুয়ারি আদালতে আফরোজা শেখের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মো. আকরাম হোসেন এবং আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী সাজ্জাদুর রহমান। মামলায় ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আদালত মামলাটির রায় ঘোষণা করেন আদালত।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. আকরাম হোসেন জানান, আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, আসামি একজন নারী এবং তাঁর একটি সন্তান রয়েছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আফরোজা শেখের ভাই শেখ সাব্বির বলেন, তাঁরা এ রায়ে সন্তুষ্ট নন এবং উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। তাঁর দাবি, তাঁর বোন হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন; তাঁকে পরিকল্পিতভাবে এ মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। সাব্বিরের ভাষ্য, প্রথম স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও শফিকুল ইসলাম দ্বিতীয় বিয়ে করায় তাঁদের সংসারে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। তাঁর বোন নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং তাঁর একটি সন্তান থাকার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল। তাঁরা শুরু থেকেই খালাস প্রত্যাশা করেছিলেন। তাই এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন তাঁরা।