সুন্দরবনের ‘নানা ভাই’ বাহিনী কারা, গড়ে উঠেছিল কীভাবে

সুন্দরবনের ‘নানা ভাই’ বাহিনীর ১২ জন সদস্য অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ কোস্টগার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে কোস্টগার্ড পশ্চিমাঞ্চলের সদর দপ্তরেছবি: প্রথম আলো

সুন্দরবনের বিভিন্ন অংশে আলাদা আলাদা দস্যু বাহিনীর তৎপরতা দেখা যায়। সাধারণত বাহিনী প্রধানের নামেই বাহিনীগুলোর নাম হয়ে থাকে। কখনো কখনো বাহিনী ভেঙে নতুন বাহিনী হলে পুরোনো নামের সঙ্গে ছোট-বড় যোগ করে নতুন বাহিনীর নাম শোনা যায়। চাঁদা ও জিম্মিদশায় পড়া বনজীবীদের মাধ্যমে বাহিনীর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। এ রকম একটি বাহিনীর নাম ‘নানা ভাই’ বাহিনী।

সুন্দরবনে দীর্ঘদিন ধরে ডাকাতি ও বনজীবীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করা এই বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর মোড়লসহ ১২ জন সদস্য কোস্টগার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে বাগেরহাটের মোংলায় কোস্টগার্ড পশ্চিমাঞ্চলের সদর দপ্তরে অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিয়ে তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন।

২০২৪ সালের শেষের দিকে অথবা ২০২৫ সালের শুরুর দিকে এই বাহিনীর তৎপরতা শুরু হয়। তাঁরা মূলত সুন্দরবনের পশ্চিম অংশে কয়রা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে ডাকাতি করতেন।

কোস্টগার্ড জানায়, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সুন্দরবনের ধানসিদ্ধির চর এলাকায় তাঁরা আত্মসমর্পণ করেন। পরে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁরা বিভিন্ন ধরনের ১৩টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২১২টি তাজা কার্তুজসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ, ম্যাগাজিন ও ছয়টি ওয়াকিটকি জমা দেন।

আত্মসমর্পণ করা ডাকাতদলের মধ্যে আছেন—বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর মোড়ল ওরফে রহমত (৩৬), শফিকুল ইসলাম (৫৩), সাইফুল্লাহ মোড়ল (৩৯), এখলাছুর রহমান (৩৮), রবিউল ইসলাম (৩৫), মফিজুল ইসলাম (৩৫), আজিম উদ্দিন গাজী (৩৭), আব্দুর রহমান শেখ (৩৬), মিন্টু গাজী (৩৯), আজিজুল গাজী (৩৫), শাহজাহান মালী (৩৫) ও আজিজুর রহমান (৪৫)। তাঁদের সাতজন খুলনার পাইকগাছা ও ডুমুরিয়ার, চারজন সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও একজন বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার বাসিন্দা।

২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনকে আনুষ্ঠানিকভাবে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করেছিল তৎকালীন সরকার। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুন্দরবনে আবার দস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে। এর মধ্যে কয়েক দফায় কোস্টগার্ড ও র‍্যাবের কাছে বেশ কয়েকটি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে।

‘ডন’ বাহিনী থেকে ‘নানা ভাই’ বাহিনী

বনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, আত্মসমর্পণ করা শফিকুল ইসলামের একটি দস্যুবাহিনী ছিল সুন্দরবনে। বাহিনীতে সদস্য ছিলেন সাত থেকে আটজন। তাঁরা শফিকুলকে ‘নানা ভাই’ নামে ডাকতেন। কিন্তু তখন জেলেদের কাছে বাহিনীটি ‘ডন’ বাহিনী নামে পরিচিত ছিল। অন্যদিকে বনে আরেকটি সশস্ত্র দস্যু দল ছিল ‘মজনু বাহিনী’। সেই দলের প্রধান মজনু ভারতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে বাহিনীর সদস্য জাহাঙ্গীর মোড়ল সাত থেকে আটজনকে নিয়ে দল গঠন করে সুন্দরবনে ডাকাতি শুরু করেন।

জেলেরা জানিয়েছেন, পরবর্তী সময়ে জাহাঙ্গীর মোড়ল ও শফিকুল ইসলাম একজোট হয়ে সুন্দরবনে দস্যুতা শুরু করেন। তখন থেকেই শফিকুলের ডাকনাম ‘নানা ভাই’ থেকে বাহিনীর নাম ‘নানা ভাই বাহিনী’ হয় এবং জাহাঙ্গীর বাহিনীটির প্রধান হন। ২০২৪ সালের শেষের দিকে অথবা ২০২৫ সালের শুরুর দিকে এই বাহিনীর তৎপরতা শুরু হয়। তাঁরা মূলত সুন্দরবনের পশ্চিম অংশে কয়রা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে ডাকাতি করতেন।

যেসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা পড়ল

কোস্টগার্ডের তথ্যমতে, আত্মসমর্পণের সময় একটি এইট শুটার, একটি সিক্স শুটার, একটি ফোর শুটার, একটি সাইড হেমার, একটি বোল্ট অ্যাকশন পিস্তল, দুটি এমথ্রি গ্যাস গান, দুটি ৭ দশমিক ৬৫ মিলিমিটার পিস্তল, দুটি ওয়ান শুটার ও দুটি এয়ারগান জমা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ২১২টি তাজা কার্তুজ, ২৯টি ফাঁকা কার্তুজ, ৭ দশমিক ৬৫ মিলিমিটার পিস্তলের ২০টি গুলি, ৮ মিলিমিটারের ৫টি গুলি ও এয়ারগানের ৪১৩টি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে চারটি পিস্তলের ম্যাগাজিন, দুটি এয়ারগানের ম্যাগাজিন, চার্জারসহ ছয়টি ওয়াকিটকিও জব্দ করা হয়।

আজ দুপুরে কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলমের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সুন্দরবনের দস্যুদের আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। যাঁরা আত্মসমর্পণ করবেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাঁদের পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হবে। তবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখলে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির আওতায় কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জব্দ করা অস্ত্র ও গোলাবারুদ এবং আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের বিষয়ে পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।

আত্মসমর্পণ করা ১২ জনের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করা হয়েছে। পরে তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়।
আতিকুর রহমান, ওসি, মোংলা থানা

কোস্টগার্ড বলছে, ধারাবাহিক অভিযানের কারণে সুন্দরবনে সক্রিয় ডাকাত দল কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। আগে ‘ছোট সুমন’, ‘বড় জাহাঙ্গীর’ ও ‘ছোট জাহাঙ্গীর’ বাহিনীর ৩৭ জন ডাকাত অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ কোস্টগার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। আজ ‘নানা ভাই’ বাহিনীর ১২ জন আত্মসমর্পণ করলেন।

মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আত্মসমর্পণ করা ১২ জনের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করা হয়েছে। পরে তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়।

২০১৬ সাল থেকে সুন্দরবনের বিভিন্ন দস্যু বাহিনী স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রত্যাশা নিয়ে র‍্যাবের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনকে আনুষ্ঠানিকভাবে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করেছিল তৎকালীন সরকার। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুন্দরবনে আবার দস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে। এর মধ্যে কয়েক দফায় কোস্টগার্ড ও র‍্যাবের কাছে বেশ কয়েকটি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে।