পুলিশকে বোকা বানালেন তিনি, আটকে গেলেন আঙুলের ছাপে

১৪ আগস্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের(এপিবিএন) অভিযানে মাদকসহ গ্রেপ্তার হন মনোয়ারা বেগম। তবে পুলিশের কাছে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন রহিমা আক্তার হিসেব
ছবি: এপিবিএনের সৌজন্যে

অভিযানে গিয়ে মাদকসহ এক নারীকে গ্রেপ্তার করে থানায় আনে পুলিশ। এরপর মাদক মামলায় তাঁকে পাঠানো হয় আদালতে। থানায় এবং আদালতে দাঁড়িয়ে ওই আসামি নিজের যে নাম–পরিচয় দিয়েছিলেন, কারাগারে আনার পর দেখা গেল তার সবই ভুয়া। কারা কর্তৃপক্ষ বায়োমেট্রিক যন্ত্রে আঙুলের ছাপ নেওয়ার পর তাঁর আসল পরিচয় বেরিয়ে এল। জামিনে বেরিয়ে আবার গ্রেপ্তার না হতে ওই নারী মিথ্যা পরিচয় দিয়েছিলেন বলে স্বীকার করেন। বিষয়টি চট্টগ্রাম কারা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গত সোমবার লিখিতভাবে আদালতকে জানিয়েছে।

কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাতীয় পরিচয়পত্রের ডেটাবেজে (তথ্যভান্ডার) ভোটারদের আঙুলের ছাপ সংরক্ষিত আছে। এ পদ্ধতিকে বলা হয় ফিঙ্গারপ্রিন্ট আইডেনটিফিকেশন অ্যান্ড ভেরিফিকেশন সিস্টেম। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ পদ্ধতি ব্যবহার শুরু করে চট্টগ্রাম কারা কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে আঙুলের ছাপে ধরা পড়েছে অনেক বন্দীর আসল পরিচয়। এসব ঘটনায় মামলাও হয়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করে জালিয়াতির মাধ্যমে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে আসা ১৬ জনকে আঙুলের ছাপের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়।

কারা ও আদালত সূত্র জানায়, ১৪ আগস্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)-৯ চট্টগ্রামের একটি দল গোপন তথ্যের ভিত্তিতে খবর পেয়ে নগরের চান্দগাঁও থানার কাপ্তাই রাস্তার মাথা মোহরা বিদ্যুৎ কার্যালয়ের বিপরীতে বসতঘরের সামনে থেকে এক নারীকে গ্রেপ্তার করেন। ওই সময় তাঁর কাছ থেকে ৫০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়। অভিযানের সময় ওই নারী নিজের নাম বলেছিলেন রহিমা আক্তার (৩৫)। এ কারণে রহিমা আক্তারকে আসামি করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে চান্দগাঁও থানায় মামলা করেন এপিবিএন-৯ চট্টগ্রামের এসআই রায়হান উদ্দিন মাহমুদ। পরে এই মামলায় ওই নারীকে আসামি করে ১৫ আগস্ট আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

পুলিশের কিছু সদস্যের গাফিলতির কারণে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে গ্রেপ্তার এড়ানো কিংবা সাজামুক্ত থাকতে ভুয়া নাম-ঠিকানা দিচ্ছেন।
আবদুস সাত্তার, সভাপতি, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক মো. ইকবাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, কারাগারে আসা অন্য নতুন আসামির মতো বন্দী রহিমারও আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী অন্য নাম-ঠিকানা আসে। তাঁর প্রকৃত নাম মনোয়ারা বেগম। পিতা-বাবুল মিয়া। জেলা-কক্সবাজার, থানা-পেকুয়া, গ্রাম রাজাখালী। কিন্তু কারাগারে এসেছিলেন রহিমা আক্তার পরিচয়ে। ঠিকানা দেওয়া আছে নগরের চান্দগাঁও, মোহরা। বিষয়টি লিখিতভাবে গত সোমবার আদালতকে জানানো হয়েছে।

ইকবাল হোসেন আরও বলেন, আসামি নিজেও স্বীকার করেছেন জামিনে বেরিয়ে যাতে আর ধরা না পড়েন, সে জন্য আসল পরিচয় গোপন রেখে ভুয়া নাম-ঠিকানা দিয়েছেন।

আঙুলের ছাপে ধরা পড়েছে অনেক বন্দীর আসল পরিচয়। এসব ঘটনায় মামলাও হয়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করে জালিয়াতির মাধ্যমে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে আসা ১৬ জনকে আঙুলের ছাপের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়।

গ্রেপ্তারের পর আসামি নাম-ঠিকানা যাচাই-বাছাই কেন করা হয়নি জানতে চাইলে মামলার বাদী ও এপিবিএন-৯ চট্টগ্রামের এসআই রায়হান উদ্দিন মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে আসামি যা বলেছেন, তাই লেখা হয়েছে।

পুলিশের কিছু সদস্যের গাফিলতির কারণে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে গ্রেপ্তার এড়ানো কিংবা সাজামুক্ত থাকতে ভুয়া নাম-ঠিকানা দিচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুস সাত্তার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তারের পর আসামি যে নাম-ঠিকানা দেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা চৌকিদারের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাচাই-বাছাই করা উচিত। ভুয়া ঠিকানায় আসামির বিরুদ্ধে পরোয়ানা গেলে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এ ছাড়া আসামির স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর নিয়ে সঠিক নাম-ঠিকানা দেওয়া যায়। যদিও গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে আদালতে হাজির করতে হয়। তারপরও ওই সময়ের মধ্যে এটি করা সম্ভব।