এপারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর, ওপারে বারঘরিয়া। মাঝখানে মহানন্দা নদী। দুই পাড়কে যুক্ত করেছে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু (মহানন্দা সেতু)। সেতুর বারঘরিয়া প্রান্তের ডান পাশে মহানন্দা নদীর তীরে গড়ে ওঠা নতুনবাজার গ্রামে বসবাস ১৪০ থেকে ১৫০টি পরিবারের। এর মধ্যে প্রায় ২৫টি পরিবার কুমোর এবং বাকিগুলো জেলে। দু-একটি পরিবার ছাড়া প্রায় সবাই প্রান্তিক, দরিদ্র ও সনাতন ধর্মাবলম্বী। আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তাঁদের বিশেষ কোনো চাওয়া নেই। তাঁদের একটাই চাওয়া—নিরাপদে থাকা, শান্তিতে থাকা।
নির্বাচনকে সামনে রেখে গ্রামটিতে বিএনপি ও জামায়াতের লোকজন তাঁদের আশ্বাস দিচ্ছেন। বলছেন, ভয়ের কোনো কারণ নেই, তাঁরা পাশে থাকবেন। মিলছে নানা প্রতিশ্রুতিও। কিন্তু তাতে নতুনবাজার গ্রামের মানুষের মন থেকে ভয়-শঙ্কা আর দুশ্চিন্তা কাটছে না।
নির্বাচন নিয়ে কথা হয় বকুল হালদার (৫৬), ফুর্তি হালদার (৬৭), সঞ্জয় হালদার (৪৩), সুব্রত হালদার (৪৩) ও লালন হালদারের (৫১) সঙ্গে। তাঁরা গ্রামের মন্দিরের সামনে ফাঁকা জায়গায় গুটিয়ে রাখা মাছ ধরার জালের ওপর বসে শীতের মিষ্টি রোদ পোহাচ্ছিলেন। নিজেদের মধ্যে গল্প করছিলেন নির্বাচনসহ নানা বিষয় নিয়ে।
গ্রামের পরিস্থিতি তুলে ধরে বকুল হালদার বলেন, ‘হামরা কী আর চাহাবো, কী আর পাবো। হামরা কিছু চাহি না, খালি নিরাপদে থাকতে চাহি। কেহু হামাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা কইর্যা দিবে না। হামরাকে পরের দুয়ারে খাইট্যা খাইতে হোইবে।’ ফুর্তি হালদার বলেন, ‘হামারঘেরও ওই একই কথা।’ অন্যরাও তাঁর কথায় সায় দেন।
আলোচনায় উঠে আসে সাম্প্রতিক সময়ে দীপু দাসকে পুড়িয়ে হত্যাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা। কেউ কেউ স্মরণ করেন ১৯৭১ সালে এই গ্রামের মানুষের ভারতে পালিয়ে যাওয়ার কথা। দেশে কবে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ আসবে—এ নিয়ে সবার কণ্ঠেই শোনা যায় হাহাকার।
তাঁরা বলেন, বারঘরিয়া ইউনিয়নে তাঁদের পাশেই আছে হালদারপাড়া, পালপাড়া, মণ্ডলপাড়াসহ আরও কয়েকটি হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম। এসব গ্রামের মানুষের মনের অবস্থাও প্রায় একই।
বকুল হালদার বলেন, ‘আগেতো অবস্থা ছিল এমন যে, হিন্দু মানেই নৌকার ভোটার। এখন তো আর নৌকা নেই। টানাটানি করছে দুদলই। আওয়ামী লীগের ও হিন্দু ভোটার এখন একটা ফ্যাক্টর। তাই এই টানাটানি।’
গ্রামের বাসিন্দা মিনা হালদার (৫৮) বলেন, তাঁর স্বামী কানন হালদার (৬৫) অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। চিকিৎসায় জমানো ২০ হাজার টাকা খরচ হলেও তিনি সুস্থ হননি। তাঁদের ঘরে আছে বাক্প্রতিবন্ধী মেয়ে মালা (৩৫), ছেলে দুখু হালদার (২৪)। দুখুর আয়ে কোনোমতে চলে সংসার। দুখু মৎস্যচাষিদের পুকুরে কামলা হিসেবে জাল টেনে মাছ ধরেন। বিকেলে মহানন্দা নদীতে ডিঙি নৌকা বেয়ে বেড়াতে আসা মানুষদের ঘুরিয়ে কিছু আয় করেন। বালক বয়সে বাবার সঙ্গে নদীতে মাছ ধরতেন। এখন নদীতে তেমন মাছ নেই। মাছ ধরে আর কারও সংসার চলে না।
গ্রামের নারীদের মধ্যেও উদ্বেগ কম নয়। কথা হয় দীপালী হালদার, লাবনী হালদার, রেখা হালদার, সুমতি হালদারসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে। তাঁরা বলেন, নির্বাচন ও নিরাপত্তা নিয়ে নারীরাই সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় থাকেন।