৬২ বছর ধরে ‘শব্দ’ আর ‘ছবির’ ডাক্তারি করছেন গমির হোসেন

দিনাজপুর শহরের গণেশতলা এলাকায় ৬২ বছর ধরে অচল টিভি সচল করার কাজ করছেন গমির হোসেন। সম্প্রতি দিনাজপুর শহরের গণেশতলা এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

পুরোনো একটি টেবিলের এক প্রান্তে ছড়ানো-ছিটানো রেডিও ও টেলিভিশনের যন্ত্রাংশ। অপর প্রান্তে পেছনের দিক খোলা একটি বক্স টেলিভিশন। পাশেই মিটার যন্ত্র, টেস্টার, তাঁতালসহ ইলেকট্রনিকস পণ্য মেরামতের নানা যন্ত্র। মাথা নিচু করে প্রয়োজন অনুযায়ী যন্ত্রপাতি নিচ্ছেন গমির হোসেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে টেলিভিশনের স্ক্রিনের সামনে রাখা আয়নায় দেখছেন। ধীরে ধীরে সচল হচ্ছে টেলিভিশনটি। গমিরের চোখেমুখে তখন আনন্দের রেখা।

দিনাজপুরে ৬২ বছর ধরে এভাবেই ইলেকট্রনিকস পণ্য ঠিক করে জীবিকা নির্বাহ করছেন ৭৯ বছর বয়সী গমির হোসেন। ফুলে ওঠা হাতের রগ জানান দিচ্ছে তাঁর বয়স। গ্রামোফোন থেকে রেডিও, ট্রানজিস্টর, টেপ রেকর্ডার, ক্যাসেট, ভিসিআর, সিডি, টিভি এমনকি বৈদ্যুতিক পাখা ও চুল্লি (ম্যাজিক চুলা)—সবকিছুর মেকানিক তিনি।

টিভির শব্দ শোনা যায় ছবি দেখা যায় না কিংবা স্ক্রিন ঝিরঝির করছে—গ্রাহকের মুখে এমন সমস্যার কথা শুনেই সমস্যা কী বুঝে ফেলেন গমির। পরে যন্ত্র মেরামতের আশ্বাস দেন তিনি। এ প্রজন্মের কাছে গমির অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত হলেও শহরের বয়োবৃদ্ধদের কাছে বেশ পরিচিত মুখ তিনি। গমির বলেন, ‘শব্দ আর ছবি নিয়েই খেলা। এই কাজ করতে করতেই জীবন শেষ হয়ে যাবে। কাজটার প্রতি একটা মায়া পড়ে গেছে। আবার নেশাও বলতে পারেন।’

গমিরের বাড়ি দিনাজপুরের ভুটিবাবুর মোড় এলাকায়। তিনি তিন মেয়ে ও এক ছেলেসন্তানের বাবা। শহরের গণেশতলা এলাকায় একটি দ্বিতল ভবনের সিঁড়ির গোড়ায় তাঁর দোকানঘর। গত রোববার দোকানে গিয়ে দেখা যায়, ঘরভর্তি পুরোনো টিভি, মাদারবোর্ড, সার্কিট ছড়ানো-ছিটানো। ধুলোর আস্তরণে বাসা বেঁধেছে মাকড়সা। মাঝখানে বসে কাজ করছেন গমির হোসেন।

দিনাজপুরের এই কারিগর ৬২ বছর ধরে যন্ত্রের শব্দ ও ছবির সঙ্গে খেলেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। সম্প্রতি দিনাজপুর শহরের গণেশতলা এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

গমির হোসেন জানালেন, দেশভাগের সময় ভারতের কোচবিহার থেকে সপরিবার রংপুরের কামালকাছনায় থিতু হন। কয়েক মাস পর তাঁর চাচা মনছুর আলী ঢাকায় ফিলিপস কোম্পানিতে চাকরি নেন। পাঁচ বছর পর চাচা ফিরে আসেন দিনাজপুরে। কাজ শুরু করেন ফিলিপস কোম্পানির শোরুমে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন তিনি (গমির)। ১৮ বছর বয়সে ১৯৬৪ সালে রংপুর থেকে দিনাজপুরে এসে চাচার দোকানে বসেন তিনি।

গমির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেই যে শুরু করলাম, দেখতে দেখতে ৬২ বছর কেটেছে। আমার হাতেই অন্তত অর্ধশতাধিক ছেলেকে কাজ শিখিয়েছি। অনেকে এ শহরেই আছে।’ তিনি বলেন, ‘ব্যবসাটা আর আগের মতো নাই। এমনও দিন গেছে একটা রেডিও ঠিক করতে চার-পাঁচজন আসতেন। মনে হতো যেন বাড়ির কেউ অসুস্থ হয়েছে। মেরামত শেষে খুশি হয়ে দুধ-কলা দিয়ে যেতেন। এখন সমস্যা হলে মানুষ নতুন কিনে ফেলে, আমাদের কাছে আসতে চায় না।’

দীর্ঘ সময়ে প্রযুক্তির নানা পরিবর্তন দেখেছেন গমির। এখনো নষ্ট টিভি সারিয়েই চলছে তাঁর সংসার। পুরোনো দিনের কথা বলতে গিয়ে খানিকটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। চাচাই তাঁর প্রথম ওস্তাদ। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই। গমির বলেন, ‘প্রথম দিকে চাচা দোকানের কোনো কিছু ধরতে দিতেন না। বলতেন মনোযোগ দিয়ে দেখে যা। সমস্যাটা বুঝতে চেষ্টা কর।’ টেবিল ল্যাম্পটি দেখিয়ে বললেন, ‘আশি সালে কিনেছি, এখনো আছে। এই যে টেবিলটাতে কাজ করছি, এটার বয়স ৪০ বছর।’

দীর্ঘ সময়ে প্রযুক্তির নানা পরিবর্তন দেখেছেন গমির। সম্প্রতি দিনাজপুর শহরের গণেশতলা এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

মেকানিকের পেশায় প্রয়োজন সততা। এর মাধ্যমে গ্রাহকের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে হয়। গমির বলেন, অনেকেই আছেন যন্ত্রের সমস্যা না বুঝে মেরামত করা শুরু করেন। গ্রাহক সময়মতো যন্ত্র বুঝে না পেয়ে আস্থা নষ্ট হয়েছে। জানালেন, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও থেকেও অনেকে তাঁর কাছে যন্ত্র সারাতে আসেন। কেউ কেউ দিনাজপুরে এলে এখনো তাঁর দোকানে ঘুরে যান।

একসময় দৈনিক দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আয় ছিল গমিরের। এখন দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা হয়। কোনো কোনো দিন তেমন কাজ থাকে না। প্রায় প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা মুরুব্বি গোছের কয়েকজন আসেন। দোকানে সুখ-দুঃখের গল্পগুজব চলে। গমির বলেন, ‘আয়-উন্নতি বলতে মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই করেছি। ভালোবাসার কাজটা যে কখন নেশা হয়ে গেছে টেরই পাইনি। মায়ায় আটকে গেছি, অন্য কোনো কাজও শেখা হয়নি। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি। ছেলেটার একটার চাকরি হলেই হয়। এই লাইনে কষ্ট বেশি, টাকা কম দেখে নতুন প্রজন্মের কেউ আসতে চায় না। যত দিন শরীর চলে এই কাজই করে যাব।’

গমিরের দোকানে বসা একসময়ের রেডিও দোকানের মালিক (ঝংকার রেডিও) লাকি হোসেন (৬৫)। তিনি বলেন, রেডিও-টিভি বিক্রির পাশাপাশি মেকানিকের কাজ শিখেছেন গমিরের কাছে। ২০০০ সালের পর ব্যবসা ছেড়ে দেন। একসময় প্রায় ৫০ জন মেকানিক ছিলেন দিনাজপুর শহরে। এখন হাতে গোনা কয়েকজন আছেন। সময় পেলে গমির ভাইয়ের দোকানে আসেন।