স্বাস্থ্যসেবা
প্রসূতির মুখে হাসি ফোটান আফরিন
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আফরিনের হাতের ছোঁয়ায় গত আট বছরে দুই হাজার স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে।
২০২০ সালের ৭ এপ্রিল, রাত ৯টা! চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার খুদিয়াখালী গ্রামে মৃত্যু পথযাত্রী বাবার পাশে বসে আছেন পরিবার-কল্যাণ পরিদর্শিকা আফরিন আরা। বাড়িজুড়ে কান্নার রোল। ঠিক সে সময়ে মুঠোফোনে খবর আসে, অন্তঃসত্ত্বা এক নারীকে নিয়ে স্বজনেরা কেন্দ্রে সন্তান প্রসবের জন্য অপেক্ষা করছেন।
বাবাকে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রেখেই কর্মস্থল সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ছুটে যান আফরিন। তাঁর নিবিড় তত্ত্বাবধানে ফুটফুটে সন্তান প্রসব করেন প্রসূতি। নবজাতকের মাসহ স্বজনদের মধ্যে বয়ে যায় খুশির জোয়ার। কিন্তু যথাসময়ে কেন্দ্রে না এলে ওই নারীর কপালে কী ঘটত, তা ভাবতেই আঁতকে ওঠেন আফরিন। এ সময় মুঠোফোনে খবর আসে তাঁর বাবা আর নেই।
আফরিনের জীবনে এমন ঘটনা আরও আছে। চলতি বছর ঈদুল ফিতরের দিন সকালের কথা। পাঁচ বছর বয়সী তাসনিম মাহমুদকে নিয়ে স্বামী আবু সায়েম ঈদগাঁহে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আফরিন তখন রান্নাবাটি নিয়ে ব্যস্ত। এমন সময় এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে নিয়ে স্বজনেরা এলেন। রান্নাবান্না ফেলেই ছুটেন আফরিন। অন্তঃসত্ত্বা নারীকে নিয়ে লেবার রুমে ঢোকেন। তার পরপরই আসেন আরেক অন্তঃসত্ত্বা। দুজনকে সামলাতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল।
গত আট বছরে এমন অসংখ্য মানবিক কাজের রেকর্ড আছে আফরিনের ঝুলিতে। আফরিন বলেন, সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তান বুকে নিয়ে একজন মা যখন গাড়িতে গিয়ে ওঠেন, সেটা খুবই আনন্দের। কারণ, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের কয়েক ঘণ্টা পর পর্যন্ত প্রসূতি তাঁর বাচ্চার মুখ দেখতে পান না। গত আট বছরে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার এই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দুই হাজারেরও বেশি সন্তান জন্ম নিয়েছে। ‘আমার প্রথম স্পর্শে এত–সংখ্যক শিশুর পৃথিবীতে আসা অনেক বড় পাওয়া। অথচ এই সময়ে একটিও মাতৃমৃত্যুর ঘটনা নাই,’ তৃপ্তির সুরে কথাগুলো বললেন আফরিন।
দিনবদলের গল্প
১৯৮৯ সালে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়নের হিজলগাড়িতে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ২০১৪ সাল পর্যন্ত শুধু পরিবার পরিকল্পনা সেবা চালু ছিল। অন্তঃসত্ত্বা নারীরা প্রশিক্ষণবিহীন দাই অথবা জেলা শহরের হাসপাতাল-ক্লিনিকের ওপর ভরসা করতেন।
২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল বেগমপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা পদে যোগদান করেন আফরিন। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে জুলাই মাসে সপরিবারের কেন্দ্রের কোয়ার্টারে ওঠেন। সেই থেকে সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টার সেবা শুরু। কর্মগুণে অল্প দিনেই প্রসূতিদের প্রিয়জনে পরিণত হন আফরিন।
স্মৃতি হাতড়ে তিনি জানান, মরিয়ম নামে একজন প্রসূতিকে মুমূর্ষু অবস্থায় স্বজনেরা চুয়াডাঙ্গায় নিচ্ছিলেন। তাঁকে কেন্দ্রে নিয়ে আসতে বললে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। কারণ, গ্রামে অবস্থিত একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্বাভাবিক প্রসবের বিষয়টিই তখন ছিল কল্পনার বাইরে। অবশেষে সেই নারী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আনা হলে আফরিন দ্রুত তাঁকে লেবার রুমে নেন। কিন্তু সেখানে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো উপকরণই ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে আফরিন প্রসূতি মায়ের মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্বাভাবিক প্রসবের ব্যবস্থা করেন।
আফরিন বলেন, ওই স্বাভাবিক প্রসবের বিষয়টি দ্রুত এলাকার মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর মানুষ স্বাস্থ্যকেন্দ্রমুখী হয় এবং শহরমুখী মনোভাব কমতে থাকে। দিনে দিনে আস্থা ও ভরসা বাড়তে থাকে। গ্রামে বসে উন্নত সেবার কারণে এই কেন্দ্রে আশপাশের ইউনিয়ন থেকে রোগী আসে।
আফরিন দাবি করেন, ‘আমাদের দলগত প্রচেষ্টা খুবই ভালো। কেন্দ্রের উপসহকারী চিকিৎসা কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন, আয়া রওশন আরা এবং অফিস সহায়ক আবুল কালাম আজাদ যথেষ্ট সহযোগিতা করেন। সবাই মিলে কাজ করি নিরাপদ সন্তান প্রসবের জন্য।’
সরেজমিনে একদিন
১ নভেম্বর বেলা ১১টায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঢুকে পরিছন্ন পরিবেশ চোখে পড়ে। বিভিন্ন বয়সী ১৪ থেকে ১৫ জন নারীকে বেঞ্চে বসে থাকতে দেখা গেল। কয়েকটি শিশু নতুন তোয়ালে মোড়ানো। নারীদের সঙ্গে আসা কয়েকজন পুরুষ সঙ্গীকেও দেখা গেল। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, আগের দিন সন্ধ্যা সাতটা থেকে দিবগত রাত তিনটা পর্যন্ত দুটি স্বাভাবিক সন্তান প্রসব হয়েছে এ কেন্দ্রে। মা ও নবজাতক সুস্থ আছেন। সারারাত জেগে থেকে সন্তান প্রসাব করানোর পরও সকালে অফিস করার বিষয়ে জানতে চাইলে আফরিন বলেন, ‘ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর নবজাতককে তুলে দেওয়ার সময় প্রসূতি মায়ের মুখের হাসি আমার ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। আমাকে সাহসী ও কর্মোদ্যমী করে তোলে।’
প্রসূতিদের কথা
ডিহি গ্রামের আরিফা খাতুন জানান, তাঁর পুত্রবধূকে শহরের একটি ক্লিনিকে নিলে সেখানকার চিকিৎসক বলেন, গর্ভের বাচ্চা বেকায়দা অবস্থায় আছে। জরুরি অস্ত্রোপচার করতে হবে। এরপর তাঁকে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসলে কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়া স্বাভাবিক প্রসব হয়।
তিতুদহ ইউনিয়নের বড়শলুয়া গ্রামের আনজিরা বেগম বললেন, ‘শুরু থেকেই এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত পরিচর্যা ও পরামর্শ নিয়ে এসেছি। তাই কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই নরমাল ডেলিভারি হয়েছে।’
উপসহকারী চিকিৎসা কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, করোনার সময় ঝুঁকি থাকলেও আস্থার জায়গা ভেবে অন্তঃসত্ত্বা নারীরা এসেছেন এবং হাসিমুখে সেবা নিয়ে ফিরে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আফরিন যোগদানের পর থেকে ঐচ্ছিক ছুটি নেননি। অর্জিত ছুটিও ভোগ করেননি। কখন কোনো রোগী এসে যদি ফিরে যান, সেই কথা মাথায় রেখে সারা বছর ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করেন তিনি।’
মাতৃমৃত্যু কমানো প্রসঙ্গে আফরিন বলেন, গর্ভকালীন ১৬, ২৪, ২৮ ও ৩৬ সপ্তাহে চেকআপ করাতে হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মীরা যদি রোগীকে অনুপ্রেরণা দিয়ে কেন্দ্রে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন এবং ঠিকভাবে চেকআপ করা গেলে মাতৃমৃত্যুর হার অনেকাংশে কমে আসবে।