কলেরা তাড়ানো বাঁশি যেভাবে হয়ে উঠল ম্রোদের সাংস্কৃতিক পরিচয়

কলেরা মহামারি তাড়াতে একসময় প্লুং বাঁশি বাজানো হতো ম্রো পাড়ায়। এখন সেই প্লুং বাঁশি উৎসব, নাচ ও ভালোবাসার প্রতীক। সাধারণ উপকরণে তৈরি এই বাঁশি এখন শুধু ম্রোদের নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। প্লুংয়ের সুরে ম্রো জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ ও সামষ্টিক স্মৃতি বেঁচে থাকে।

ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে প্লুং বাজাচ্ছেন ম্রো পুরুষেরা। সম্প্রতি বান্দরবানের রাজার মাঠ এলাকা থেকে তোলাছবি: মং হাই সিং মারমা

বহু বছর আগে পাহাড়ের ম্রো জনপদে কলেরা মহামারি ছড়িয়ে পড়েছিল। গ্রামের পর গ্রাম পরিণত হয়েছিল মৃত্যুপুরীতে। ঠিক সেই সময়ে একটি গ্রামে এক রহস্যময় আধ্যাত্মিক পুরুষ হাজির হন। তিনি এক যুবককে ডেকে নিয়ে বললেন, তুমি একটি প্লুং (বাঁশি) তৈরি করো। প্লুং এর সুরে কলেরা মহামারি দূর হবে। মানুষের জীবন রক্ষা পাবে। যুবককে প্লুং বা বাঁশি তৈরি ও বাজানোর তালিম দিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যান সেই রহস্যময় পুরুষ। যুবক পাড়াবাসীকে বিষয়টি জানালে কেউ প্রথমে বিশ্বাস করেননি। এরপর প্লুং তৈরি করে ওই যুবক বাজাতে শুরু করলে মহামারিতে আক্রান্ত রোগীরা সুস্থ হয়ে উঠতে থাকে। এভাবে যুবক গ্রামের পর গ্রাম প্লুং বাজিয়ে কলেরার মহামারি দূর করেন। এভাবে কলেরা তাড়াতে প্লুং বাঁশি বাজানো রীতি হয়ে দাঁড়ায় ম্রোদের মধ্যে।

ম্রো ভাষার লেখক ইয়াংঙান ম্রোর লেখা ‘ম্রো রূপকথা’ নামের সংকলনে প্লুং বাঁশি নিয়ে এমন কাহিনির উল্লেখ পাওয়া যায়। লাউয়ের খোল আর চিকন বাঁশ দিয়ে তৈরি প্লুং বাঁশি একসময় মহামারি তাড়াতে বাজানো হতো। এখন উৎসব-পার্বণের অন্যতম অনুষঙ্গ এই বাঁশি। বলা যায়, এটি এখন ম্রোদের সংস্কৃতি পরিচয়ের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল ম্রো জনগোষ্ঠীর মধ্যে নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামেরই অন্যতম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে এই বাঁশি।

বান্দরবান পার্বত্য জেলায় সাতটি উপজেলার দুর্গম পাহাড়ে ম্রো জনগোষ্ঠীর বসবাস। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী ম্রোদের জনসংখ্যা ৫১ হাজার ৪৪৮ জন। দুর্গম এলাকায় চিকিৎসাসুবিধা না থাকায় একসময় কলেরা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ত ম্রো পাড়ায়। এই নিয়ে ম্রোদের বহু বিয়োগান্ত কাহিনি আছে। আর এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্লুং বাঁশিরও নানা গল্প।

রিনা প্লুং একসময় ছোট আকারের বাঁশি ছিল। পরে এই বাঁশি থেকে বড় আকারের নানা ধরনের নাচের বাঁশির উদ্ভব হয়েছে। নিচু ও উঁচু লয়ে একসঙ্গে অনেকগুলো প্লুং যখন বেজে ওঠে, তখন একটা ঐকতান তৈরি হয়। সুরের মূর্ছনায় শিহরণ তোলে শ্রোতাদের হৃদয়ে। ম্রো তরুণ-তরুণীদের কাছে রিনা প্লুং এখন ভালোবাসার বাঁশি হিসেবে পরিচিত।

ম্রো জনগোষ্ঠীর প্লুং বাঁশির নানা রকমভেদ আছে। তবে সব বাঁশিরই উদ্ভব রিনা প্লুং। রিনা অর্থ কলেরা আর প্লুং অর্থ বাঁশি। অর্থাৎ একসময় যে এটি কলেরা তাড়ানোর বাঁশি ছিল, সেটি এর নাম থেকেই বোঝা যায়। রিনা প্লুং থেকে এসেছে নানা ধরনের প্লাই প্লুং। প্লাই প্লুং হলো নাচের বাঁশি। যেকোনো অনুষ্ঠানে বা উৎসবে প্লাই প্লুং বাজিয়ে নাচ করেন ম্রো নারী–পুরুষেরা।

ম্রো প্লুং বাদকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রিনা প্লুং একসময় ছোট আকারের বাঁশি ছিল। পরে এই বাঁশি থেকে বড় আকারের নানা ধরনের নাচের বাঁশির উদ্ভব হয়েছে। নিচু ও উঁচু লয়ে একসঙ্গে অনেকগুলো প্লুং যখন বেজে ওঠে, তখন একটা ঐকতান তৈরি হয়। সুরের মূর্ছনায় শিহরণ তোলে শ্রোতাদের হৃদয়ে। ম্রো তরুণ-তরুণীদের কাছে রিনা প্লুং এখন ভালোবাসার বাঁশি হিসেবে পরিচিত।

নানা ধরনের প্লুং বাঁশি
প্রথম আলো

জুম খেতে উৎপাদিত ছোট লাউয়ের খোল ও বনের চিকন বাঁশ— এসব সাধারণ উপকরণ দিয়ে প্লুং তৈরি করা হয়। চিম্বুক পাহাড়ের রামরিপাড়ার প্লুং কারিগর চিংতুই ম্রো জানালেন, ছোট আকৃতির ডলু বাঁশের নলে খুব সূক্ষ্ম পরিমাপে ছিদ্র করা হয়। তারপর সাঙ্কু ( পামজাতীয় একধরনের গাছ) গাছের শুকনা ছাল অতি নিপুণ হাতে শাণিত ছুরি দিয়ে কেটে হারমোনিয়ামের রিডের মতো রিড তৈরি করা হয়। রিডগুলো ছিদ্র করা বাঁশের পাইপে স্থাপন করা হয়। প্রকারভেদে প্লুং নানা আকারের হয়ে থাকে।

লেখক সিংয়ং ম্রো তাঁর লেখা ‘ম্রো জনগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতি’ গ্রন্থে লিখেছেন, রিনা প্লুং থেকে প্লাই প্লুং বা নাচের বাঁশি ও অন্যান্য বাঁশি হয়েছে। রিনা প্লুং উদ্ভবের আগে ম্রোদের কোনো বাঁশি ছিল না। ম্রো গানের শিল্পীরা রিনা প্লুং বাজিয়ে গান গেয়ে থাকেন। এই গানে ম্রো জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা জীবন্ত হয়ে ওঠে।

বান্দরবানের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক নুক্রাচিং মারমা বলেছেন, ম্রো জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়েছে প্লুং। আবার ম্রো পরিচয়ের প্রতীকও হয়ে উঠেছে এই বাঁশি।