জ্যৈষ্ঠের ভরদুপুর। রোদে পুড়ছে চারদিক। যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার চতুরবাড়িয়া-খাজুরা সড়কের আরামবাগ মোড়ে বটগাছের নিচে একটি পুরোনো বাইসাইকেল এসে থামল। বাইসাইকেলের পেছনে দুই দিকে দুটি বাঁশের ঝুড়িভরা ডিম। রডে শক্ত করে বাঁধা ছাতা। সামনের হ্যান্ডেলে ঝুলছে একটি থলে। থলের মধ্যে পানির বোতল, কিছু ওষুধ ও প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস। ঘামে ভেজা চালক বাইসাইকেল থেকে নেমে দাঁড়ালেন। মাথায় ক্যাপ। বটগাছের নিচে কিছুটা সময় জিরিয়ে নিলেন।
৪ জুন বৃহস্পতিবার দুপুরে কথা হয় ওই ডিম বিক্রেতার সঙ্গে। তাঁর নাম লাল মিয়া (৫৪)। তিনি মাগুরার শালিখা উপজেলার ছোট আমিয়ান গ্রামের বাসিন্দা। ৩২ বছর ধরে প্রতিদিন প্রায় ৫০ কিলোমিটার বাইসাইকেল চালিয়ে ঘুরে ঘুরে ডিম কিনে সেই ডিম বিক্রি করে তিনি সংসার চালান। তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলে। ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে আলামিন গাজী (২৬) ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। তিনি পরিবার নিয়ে সেখানেই থাকেন। বাড়িতে থাকেন লাল মিয়া ও তাঁর স্ত্রী চম্পা বেগম (৪৪)।
গল্পে গল্পে লাল মিয়া বলেন, দিনবদলের আশায় তিনি একসময় বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। দালালদের খপ্পরে পড়ে হারিয়েছেন জীবনের সঞ্চয়। বিক্রি করতে হয়েছে জমিজমা ও বসতভিটা। কিন্তু জীবনের কাছে হার মানেননি। প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করে বাইসাইকেল চালিয়ে ঘুরে ঘুরে ডিম কিনে তা বিক্রি করে তিনি সংসারের হাল ধরে রেখেছেন। বিদেশ যাওয়ার জন্য মাঠের চার বিঘা ও সাড়ে ১২ শতক বসতভিটা বিক্রি করে দালালের হাতে চারবার প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকা তুলে দেন। কিন্তু তিনি বিদেশ যেতে পারেননি। টাকাও ফেরত পাননি। এখন পরের জায়গায় ঘর তুলে সেখানে থাকেন। তাঁর বাইসাইকেলে বাঁধা একটি ঝুড়িতে ৫০০টি হাঁসের ডিম, অপরটিতে ৩০০টি মুরগির ডিম রয়েছে বলে তিনি জানান।
লাল মিয়া বলেন, ‘২০০২ সালে প্রথমবার সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য দালালকে দিয়েছিলাম এক লাখ ৩০ হাজার টাকা; কিন্তু যেতে পারিনি। এরপর মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য ২০০৬ সালে দিলাম আড়াই লাখ টাকা, চার বছর পর ২০১০ সালে আবারও মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য তিন লাখ টাকা দিয়েছি। সবশেষ ২০১২ সালে দুবাই নিয়ে যাবে বলে এক দালাল আমাকে ভুলিয়েভালিয়ে নেয় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। তারা এমনভাবে বলে, আমি বিশ্বাস করতে বাধ্য হই। কিন্তু বিদেশ আর যেতে পারি না। টাকাও ফেরত পাই না।’
সপ্তাহে এক দিন পরপর বাইসাইকেলে ঘুরে ঘুরে ডিম কেনেন। বাকি তিন দিন ওই ডিম বিক্রি করেন। যেদিন ডিম কেনেন, সেদিন আর বিক্রি করার সময় থাকে না। শুক্রবার বাড়িতে থাকেন। মাগুরার শালিখা উপজেলার ধনেশ্বরগাতী, সিংড়া, তিলখড়ি, দেবিলা, ধাউখালী, বগুড়া, কোটভাগ, মশাখালী, শ্রীফলতলা এবং ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার পান্তাডাঙি, কামালপুর, বিনোদপুর, মল্লিকপুর, তালা, তেঘোর, দামোদরপুর, মির্জাপুর, নাকড়াসহ প্রায় ৫০টি গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডিম সংগ্রহ করেন। আবার কখনো ব্যাপারীদের কাছ থেকে হাঁস ও মুরগির ডিম কেনেন। হাঁস ও মুরগির ডিম ৫০ টাকা করে হালি কিনে ৬০ টাকায় বিক্রি করেন। ব্যাপারীদের কাছ থেকে কিনলে ডিমের দাম একটু বেশি পড়ে, লাভও হয় কম। প্রতি মাসে তাঁর গড়ে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা আয় হয়।
প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে নাশতা সেরে বাইসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন লাল মিয়া। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ঘুরে ঘুরে ডিম সংগ্রহ করেন। ডিম সংগ্রহ করতে করতে কখনো সন্ধ্যা আবার কখনো রাত হয়ে যায়। বাজারের দোকানে পাইকারি ও চলতি পথে মানুষের কাছে খুচরা দামে ডিম বিক্রি করেন লাল মিয়া। রোদ, বৃষ্টি বা শীত যা–ই হোক, তাঁকে কাজে যেতেই হয়। তিনি বলেন, ‘আগে ডিমের দাম বেশ কম ছিল, লাভ হতো বেশি। এখন ডিমের দাম বেশি, কিন্তু লাভ খুব কম। বাজারে সবকিছুর দাম অনেক বেশি। অনেক কষ্ট করে আমার সংসার চালাতে হচ্ছে। ডিম বিক্রি করে আর সংসার চলছে না।’