‘পানি মেপে মেপে খাই, অনেক সময় তেষ্টা থেকে যায়’
সকালের আলো তখন পুরোপুরি ছড়ায়নি। খুলনার কয়রা উপজেলার সাতহালিয়া গ্রামের সরকারি পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে দেখা গেল ব্যস্ততা। পুকুর থেকে প্লাস্টিকের ড্রামে পানি তুলছেন ইয়াসিন আলী। পাশে ভ্যানে সেই ড্রামগুলো তুলছেন কামরুল গাজী। কিছুক্ষণ পর ভ্যানটি ভরে গেল পানিভর্তি ড্রামে। দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হলো। তারপরই রওনা দেওয়ার প্রস্তুতি।
এ ঘটনা আজ শুক্রবার সকালের। কাছে গিয়ে জানতে চাইলে কামরুল গাজী বললেন, ‘এই পানি আশপাশের গ্রামে বিক্রি করি। মানুষ এই পুকুরের পানিই খায়। অন্য উপায় নেই। ৩০ লিটারের একেকটা ড্রাম ১০ টাকায় বিক্রি করি, দূরে নিলে আরও বেশি দাম নিতে হয়।’
ইয়াসিন আলী বলেন, ‘সাত বছর ধইরে এই কাজ করতিছি। ভোরে উঠি পুকর থেইকে পানি তুলি, তারপর ভ্যানে কইরে বাড়ি বাড়ি পৌঁছাই দিই। পানি বিক্রির সময় পাইলে যাত্রীও টানি। এলাকায় পানির কষ্ট আগে থেইকেই ছিল, তবে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেইকে সমস্যা আরও বাড়িছে।’
ইয়াসিন আলী ও কামরুল গাজী এলাকায় এখন পানির ফেরিওয়ালা হিসেবে পরিচিত। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন ভোরে তাঁরা সাতহালিয়ার সরকারি পুকুরে এসে ড্রাম ভর্তি করেন। এরপর ভ্যান ঠেলে পার্শ্ববর্তী চৌকুনি, বগা, কালিকাপুর, বাবুরাবাদসহ আশপাশের গ্রামে যান। প্রথমে গ্রামের দোকানগুলোয় পানি সরবরাহ করেন, পরে বাড়ি বাড়ি। প্রতিবার ভ্যানে সাতটি ড্রাম নেওয়া যায়। দিন শেষে আয় হয় প্রায় ৫০০ টাকা।
পুকুরপাড় থেকে একটু এগোতেই দেখা গেল, এক নারী কলসি হাতে হেঁটে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘সকাল-বিকেল পানি আনতি হয়। এলাকায় কোনো নলকূপে মিষ্টিপানি ওঠে না, সব নোনা। তাই বাধ্য হয়ে পুকুরের পানি খাই। যেদিন আনতি পারিনে, সেদিন কিনতি হয়। একে তো পুকুরের পানি, তাও কিনি খাতি হয়।’
২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে সুপেয় পানির সংকট বেড়েই চলেছে। অধিকাংশ এলাকায় সুপেয় পানি মানেই পুকুরের পানি, যা কখনো নিজের কাঁধে বয়ে আনতে হয়, আবার কখনো কিনে খেতে হয়।
সাতহালিয়া থেকে পূর্ব দিকে সুন্দরবনসংলগ্ন নয়ানী গ্রামেও একই চিত্র। গ্রামের শেফালী মণ্ডল নামের এক নারী তাঁদের সুপেয় পানির কষ্ট দেখানোর জন্য সড়কের ওপর থেকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে যান প্রতিবেদককে। শেফালী মণ্ডলের ঘরে ঢুকে বোঝা যায় পানির সমস্যা তাঁদের কতটা সংকটে রেখেছে। ঘরের ভেতরে কলসি, ড্রাম, এমনকি গামলায়ও পানি সংরক্ষণ করা হয়েছে।
শেফালী মণ্ডল বলেন, ‘ঘরে এক বেলা খাবার জোগাড়ের চেয়েও মিষ্টিপানি জোগাড় বেশি কঠিন। একফোঁটা পানির দাম এখানে অনেক। কখনো হেঁটে, কখনো ভ্যানে করে আনতে হয়। ৩০ লিটার পানির জন্য ১৫ টাকা দিতে হয়। এ জন্য পানি মেপে মেপে খাই। অনেক সময় তেষ্টা থেকে যায়। পরিবারের আয়ের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ শুধু পানির পেছনে চলে যাচ্ছে।’
একই গ্রামের গৃহবধূ লাকি মণ্ডল বলেন, ‘দু-তিন মাইল দূর থেকে পানি আনতে হয়। বৃষ্টি না হলে কষ্ট কমে না। বাড়িতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ট্যাংক থাকলেও পানি শেষ হয়ে গেছে।’
স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়রা উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় নলকূপে মিঠাপানি পাওয়া যায় না। ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত হওয়ায় পুকুরই একমাত্র ভরসা। তবে অনেক পুকুর শুকিয়ে গেছে, আবার যেগুলো আছে, সেগুলোর পানিও নিরাপদ নয়। কোথাও কোথাও আগে স্থাপিত পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ) এখন অকেজো।
কয়রার শাকবাড়িয়া নদীর তীরের এক দোকানি শশাঙ্ক শেখর চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘দোকানের জন্য প্রতিদিন পানি কিনতে হয়। ৩০ লিটার পানির দাম ১২ টাকা হলেও পরিবহন খরচে তা দ্বিগুণ হয়ে যায়। স্থায়ী সমাধান হিসেবে পুকুর খনন, ফিল্টার বসানো এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ জরুরি।’
কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি বিদেশ রঞ্জন মৃধা বলেন, ‘২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে সুপেয় পানির সংকট বেড়েই চলেছে। অধিকাংশ এলাকায় সুপেয় পানি মানেই পুকুরের পানি, যা কখনো নিজের কাঁধে বয়ে আনতে হয়, আবার কখনো কিনে খেতে হয়। পানির এই সংকট এখানে এক দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট। শুষ্ক মৌসুম এলেই সংকট তীব্র হয়ে ওঠে।’
তবে কয়রা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, ‘সমাধানের চেষ্টা চলছে। লবণাক্ততার কারণে অধিকাংশ জায়গায় গভীর নলকূপ কার্যকর নয়। তাই পুকুর খনন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং পানির ট্যাংক বিতরণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৫৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে সুপেয় পানি পাচ্ছে।’