রাতের আঁধারে শতবর্ষী পুকুর ভরাট, খবর পেয়ে মাটি বিক্রি করে দিল প্রশাসন
কুমিল্লার লাকসাম পৌর এলাকায় রাতের আঁধারে একটি শতবর্ষী পুকুরের বেশির ভাগ অংশ ভরাটের ঘটনা ঘটেছে। পরে সেখানে অভিযান চালিয়ে পুকুর ভরাটের মাটি প্রকাশ্য নিলামে বিক্রি করে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। আজ সোমবার দুপুরে এ নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এতে চারজন অংশ নেন। এর আগে গতকাল রোববার সন্ধ্যায় অভিযান চালিয়ে ভরাট করা বালু-মাটি নিলামে বিক্রির আদেশ দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।
ঘটনাটি ঘটেছে লাকসাম-শ্রীয়াং সড়কের পশ্চিমগাঁও এলাকায়। শতবর্ষী পুকুরটি জোড়পুকুর নামে পরিচিত। এটির আয়তন ১ দশমিক ০৬ একর। এরই মধ্যে পুকুরের দুই-তৃতীয়াংশ ভরাট করা হয়েছিল। শতবর্ষী বিশাল আয়তনের পুকুর ভরাটের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
বাপ-দাদার আমল থেকে এই বিশাল পুকুরটি দেখে আসছি। এলাকার পরিবেশ রক্ষায় ও পানি ব্যবহারের জন্য এটি খুবই দরকারি ছিল। প্রভাবশালীরা আমাদের চোখের সামনে এটাকে মরুভূমি বানিয়ে দিচ্ছিল। প্রশাসনের এই উদ্যোগে আমরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি।শামছুল আলম, স্থানীয় বাসিন্দা
স্থানীয় বাসিন্দা ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, লাকসাম-শ্রীয়াং সড়কের পশ্চিমগাঁও এলাকায় পুকুরটি কয়েক দিন ধরে রাতের আঁধারে বালু আর মাটি দিয়ে ভরাট করছিল একটি প্রভাবশালী চক্র। রোববার সন্ধ্যায় গোপন সংবাদ পেয়ে সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করেন ইউএনও নার্গিস সুলতানা। অভিযানে ভরাটকারীদের কাউকে ঘটনাস্থলে পাওয়া না গেলেও পুকুর ভরাটের সত্যতা পাওয়া যায়। তখন ৪ লাখ ১৪ হাজার ৩৬০ বর্গফুট বালু-মাটি জব্দ করে নিলামের ঘোষণা দেওয়া হয়।
আজ দুপুরে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে এই নিলাম অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মিলন চাকমা, উপজেলা প্রকৌশলী সাদিকুল জাহান (রিদান), উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আহমেদ উল্লাহ (সবুজ) এবং লাকসাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী কামরুন্নাহার লাইলী। নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে মিজানুর রহমান ২ লাখ ৭৪ হাজার টাকায় ওই মাটি কিনে নেন।
পুকুরটি ভরাটের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় ষাটোর্ধ্ব শামছুল আলম বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকে এই বিশাল পুকুরটি দেখে আসছি। এলাকার পরিবেশ রক্ষায় ও পানি ব্যবহারের জন্য এটি খুবই দরকারি ছিল। প্রভাবশালীরা আমাদের চোখের সামনে এটাকে মরুভূমি বানিয়ে দিচ্ছিল। প্রশাসনের এই উদ্যোগে আমরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি।’
স্থানীয় আরেক যুবক মানিক মিয়া বলেন, ‘রাতের অন্ধকারে ট্রাকে ও ট্রাক্টরে করে বালু আর মাটি এনে টুপটুপ করে পুকুরটি ভরাট করা হয়েছে। চার–পাঁচ দিন ধরে রাত হলেই ট্রাক আর ট্রাক্টরের শব্দে মানুষ ঘুমাতে পারত না। আমরা চেয়েছিলাম পুকুরটি যেন আগের অবস্থায় ফিরে আসে। এই পুকুরে আমাদের অনেক স্মৃতি। যাক অবশেষে পুকুরটা রক্ষা পাচ্ছে—এটাই আমাদের জন্য আনন্দের।’
স্থানীয় লোকজন জানায়, একই এলাকায় পাশাপাশি আরেকটি পুকুর রয়েছে। এ জন্য ভরাট হওয়া পুকুরটি জোড়পুকুর নামে পরিচিত। এই পুকুরটি এলাকাকে জলাবদ্ধতামুক্ত রাখতে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি আশপাশের মানুষজন পুকুরের পানি তাঁদের প্রতিদিনের কাজে ব্যবহার করেন। পুকুরটি যেন পুনরায় ভরাট না হয়—সেদিকে প্রশাসনকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সবাই।
আজ সন্ধ্যায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিলন চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, নিলামের টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া শেষে ওয়ার্ক অর্ডারের মাধ্যমে পুকুর থেকে মাটি ও বালু উত্তোলন করে সরিয়ে নেওয়া হবে। পুকুরটি যেন কেউ পুনরায় ভরাটের চেষ্টা করতে না পারে, সেদিকে নজর রাখা হবে।
যাঁরা ভরাটের চেষ্টা করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে মিলন চাকমা বলেন, ‘পুকুরের দুই-তৃতীয়াংশ ভরাট করা হয়ে গিয়েছিল। এ কারণে আমরা খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালতে অভিযান পরিচালনা করেছি। শিগগিরই পুকুরের যাঁরা মালিক, তাঁদেরকে নোটিশ দেওয়া হবে। তাঁদের কাছ থেকে বিস্তারিত জেনে পরবর্তী সময়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নার্গিস সুলতানা জানান, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পুকুর, ডোবা ও জলাশয় ভরাটের বিরুদ্ধে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। জনস্বার্থ ও পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ বিষয়ে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি জানান।