ছুটির দিনে বইয়ের টানে স্কুলে ভিড়

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রথমা ও সিলভার বেলস কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড গার্লস হাইস্কুলের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত বই উৎসবে পাঠকদের ভিড়। আজ বেলা একটায় চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় অবস্থিত সিলভার বেলস কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড গার্লস হাইস্কুলেছবি: সৌরভ দাশ

শনিবার সকাল। সাপ্তাহিক ছুটি। ক্লাস–পরীক্ষার ব্যস্ততা নেই। তবু বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সকাল থেকে শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। তাদের এই ভিড় বইয়ের স্টল ঘিরে। কারও হাতে গল্পের বই, কারও হাতে ছিল কিশোর উপন্যাস। কেউ পছন্দের বইটি হাতে নিয়ে মলাট দেখছে, কেউ স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে বই কেনার জন্য। অভিভাবকেরাও মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে ব্যস্ত বই বাছাইয়ে।

প্রিয় লেখকের বই কেনার অপেক্ষায় থাকা শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাসে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণটি মুখর হয়ে উঠেছিল। এমন দৃশ্য দেখা যায় চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের সিলভার বেলস কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড গার্লস হাইস্কুলে। সকাল থেকেই শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ।

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রথমা প্রকাশন ও সিলভার বেলস কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড গার্লস হাইস্কুল যৌথভাবে এই বই উৎসবের আয়োজন করে। সহযোগিতায় ছিল উৎসব সুপারমার্কেট।

সকালে বই উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিভা ইন্দু। প্রধান অতিথি ছিলেন লেখক ও প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক বিশ্বজিৎ চৌধুরী। বই উৎসবে অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে ছিল শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে গান, কবিতা ও নৃত্য পরিবেশনা।

মেলায় ছিল একটিমাত্র বইয়ের স্টল। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে থেকে সেটির সামনে ছিল নানা বয়সী শিক্ষার্থীর ভিড়। কেউ বইয়ের মলাট দেখছে, কেউ কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে দেখছে। পছন্দের বই হাতে পেয়ে কারও মুখে হাসি। আবার কেউ একাধিক বইয়ের মধ্যে কোনটি কিনবে, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেছে।

বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইপ্সিতা জান্নাতুল ফেরদৌস বাবা ও ছোট বোনকে নিয়ে এসেছিল বই উৎসবে। তার পছন্দ গল্প ও কিশোর উপন্যাস। তার কথা, ‘বই পড়লে নিজের মতো করে একটা জগৎ কল্পনা করা যায়। তাই গল্পের বই পড়তে আমার ভালো লাগে। আজ পছন্দের কয়েকটা বই কিনেছি।’

তার মতো অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই বই উৎসব ছিল শুধু বই কেনার সুযোগ নয়, প্রিয় লেখকদের বই একসঙ্গে দেখার আনন্দও। বন্ধুদের সঙ্গে বই নিয়ে আলোচনা, একে অপরকে পছন্দের বই দেখানো—সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে স্কুলজুড়ে।

সদ্য এসএসসি উত্তীর্ণ মাওয়া সিদ্দিকী কিনেছিল বিশ্বজিৎ চৌধুরীর দুটি উপন্যাস। স্টলের পাশেই ছিলেন লেখক। তাই অটোগ্রাফ নেওয়ার সুযোগ হারায়নি সে। পছন্দের বই সংগ্রহ করে উচ্ছ্বসিত মাওয়া সিদ্দিকী বলে, তাদের বিদ্যালয়ে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গল্প–উপন্যাস, কবিতা–ছড়া পড়ার প্রতি জোর দেওয়া হতো। বিদ্যালয়ে এই ধরনের বই উৎসবের আয়োজন করায় পছন্দের বই কেনা সহজ হয়েছে।

উৎসবে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। সন্তানের পছন্দের বই খুঁজে দিতে স্টলে ভিড় করছিলেন তাঁরা। কেউ বই কিনে দিচ্ছেন, কেউ আবার সন্তানকে বই বেছে নিতে উৎসাহ দিচ্ছেন। তেমনই একজন অভিভাবক হাসান ফরহাদ। তৃতীয় শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে আলিজা হাসানকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন উৎসবে। তিনি বলেন, ‘এখন বাচ্চাদের হাতে সব সময় মোবাইল বা অন্য কোনো ডিভাইস থাকে। বই পড়ার কথা বললে অনেক সময় আগ্রহ দেখায় না। কিন্তু এমন আয়োজন হলে তারা নিজেরাই বই দেখতে আসে, পছন্দ করে, কিনতে চায়। এটা আমাদের জন্য খুব আনন্দের।’

প্রথম শ্রেণি পড়ুয়া অনসূয়া নন্দিনীর পিতা অনুপম শীল বলেন, শুধু পরীক্ষার বই পড়লেই তো হবে না। গল্প, উপন্যাস, বিজ্ঞান, ইতিহাস—বিভিন্ন ধরনের বই পড়লে বাচ্চাদের চিন্তাভাবনার পরিধি বাড়ে। তাই এমন আয়োজন আরও হওয়া দরকার। তারেক আহমেদ নূরী নামের আরেক অভিভাবক মেয়ের জন্য কয়েকটি বই কিনছিলেন। তিনি বলেন, ‘বাচ্চাদের বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করিয়ে দেওয়ার জন্য স্কুলের এমন আয়োজন খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখানে এসে নিজের পছন্দের বই হাতে নেওয়ার মধ্যে আলাদা আনন্দ আছে।’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে লেখক ও প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সময়ে বই পড়ার আগ্রহ কমে গেছে। এ জন্য শিশু–কিশোরদের দায় করে লাভ নেই। তারা যদি বাসায় মা–বাবাসহ পরিবারের বড়দের বই পড়তে না দেখে, তাহলে এ অভ্যাস হবে না। কেননা, শিশু–কিশোরেরা অনুসরণ করতে পছন্দ করে। তিনি বলেন, আজকের উৎসবে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি মন ভালো করে দেওয়ার মতো। একটি বই মানুষের জীবনের চিন্তাভাবনা ও মূল্যবোধও পাল্টে দিতে পারে।

কবি ও সাংবাদিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, ছোটবেলায় বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হলে সেটি অনেক দূর পর্যন্ত যায়। বই উৎসবের মতো আয়োজন শিক্ষার্থীদের সেই অভ্যাস তৈরিতে উৎসাহিত করে। আজ যে শিক্ষার্থী একটি বই কিনল, হয়তো কাল সে আরও কয়েকটি বই খুঁজবে।

সিলভার বেলস কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড গার্লস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক বিভা ইন্দু বলেন, এ ধরনের বই উৎসব আয়োজনে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদেরও প্রচুর উৎসাহ–উদ্দীপনা ছিল। তার প্রমাণ হচ্ছে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। তারা এখানে নিজের পছন্দে বই দেখছে, লেখকদের সঙ্গে কথা বলছে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করছে। ফলে বইয়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্কটা শুধু পড়াশোনার মধ্যে আটকে থাকছে না। এই উৎসবের কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা সহজে পছন্দের বই কিনতে পারবেন। কেননা, দূরত্বের কারণে চট্টগ্রাম ও ঢাকার বইমেলায় যাওয়া সম্ভব হয় না।

বই উৎসবের সহযোগিতায় থাকা উৎসব সুপারমার্কেটের সমন্বয়ক আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, সৃষ্টিশীল, সৃজনশীল ও মননশীল উৎসব আয়োজনে তাঁদের সহযোগিতা রয়েছে। এই বই উৎসব শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাড়া মুগ্ধ করেছে।