পরিত্যক্ত ইটভাটা যেভাবে হয়ে উঠল ফুলের বাগান

পরিত্যক্ত ইটভাটায় গড়ে উঠেছে ফুলের বাগান। সম্প্রতি খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার মুড়াপাড়া থেকে তোলাছবি: প্রথম আলো

একসময় পোড়ামাটির গন্ধ আর কালো ধোঁয়ায় ভারী ছিল বাতাস, আজ সেখানে ফুলের সুবাস। খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার মুড়াপাড়ায় পরিত্যক্ত একটি ইটভাটাকে ফুলের বাগানে রূপান্তর করে নতুন এক স্বপ্নের গল্প লিখেছেন তরুণ উদ্যোক্তা খালেদ মাসুদ সাগর। তাঁর গড়ে তোলা ‘স্বপ্নবিলাস ফ্লাওয়ার ভিলেজ’ এখন শুধু একটি ফুলের বাগান নয়, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টিরও দৃষ্টান্ত।

খাগড়াছড়ি শহর থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কের পাশে দুই একর জায়গায় গড়ে উঠেছে স্বপ্নবিলাস ফ্লাওয়ার ভিলেজ। সেখানে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সারি সারি রঙিন ফুলের বাগান, পরিকল্পিত হাঁটার পথ আর বিশ্রামের বেঞ্চ। ভিলেজে প্রচুর দর্শনার্থী আসেন। ঘুরে দেখেন টিকিটের বিনিময়ে। ৩০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলেই মনে হয়—সবুজ পাহাড়ের বুকে যেন কেউ যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছে এক টুকরা স্বপ্ন।

কথা হয় উদ্যোক্তা খালেদ মাসুদ সাগরের সঙ্গে। তিনি বলেন, আইন বিষয়ে চট্টগ্রাম থেকে পড়াশোনা শেষ করলেও প্রচলিত চাকরি কিংবা আইন পেশার নিরাপদ গণ্ডিতে নিজেকে আটকে রাখতে চাননি। কৃষির প্রতি আগ্রহ আর নতুন কিছু করার তাড়নাই তাঁকে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে নিয়ে আসে।

খালেদ মাসুদ বলেন, ‘সব সময় ভাবতাম এমন কিছু করব, যেখানে নিজের আয়ের পাশাপাশি অন্যদেরও কাজের সুযোগ হবে। মহালছড়িতে বাড়ি হওয়ায় খাগড়াছড়ি যাতায়াতের পথে এই পরিত্যক্ত ইটভাটাটি চোখে পড়ত। ছোটবেলা থেকেই ফুলের প্রতি আলাদা একটা টান ছিল। সেই টান আর সাহস করেই ২০২৩ সালের শেষ দিকে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে ইটভাটাসহ আশপাশের দুই একর খালি জায়গা ইজারা নিই।’

বর্তমানে স্বপ্নবিলাস ফ্লাওয়ার ভিলেজে প্রায় ২০০ ধরনের ফুলের চার শতাধিক প্রজাতির চাষ হচ্ছে। গাঁদা, গোলাপ, জবা, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, সূর্যমুখী, অর্কিড, শিউলি, হাসনাহেনা, কাঠগোলাপ, অপরাজিতা, দোলনচাঁপাসহ নানা রং ও ঘ্রাণের ফুলে ভরে থাকে বাগান। পাহাড়ি এলাকার মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই হওয়ায় এসব ফুল সারা বছরই ফোটে, তবে শীত মৌসুমে বাগানের সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়।

এরপর শুরু হয় দীর্ঘ সংস্কারপ্রক্রিয়া। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে, মাটি ঠিক করে ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ফুলের চাষ। শুরুতে শতাধিক প্রজাতির দেশি ও বিদেশি ফুল দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও অল্প সময়েই সেই পরিসর বিস্তৃত হয় বহুগুণ।

বর্তমানে স্বপ্নবিলাস ফ্লাওয়ার ভিলেজে প্রায় ২০০ ধরনের ফুলের চার শতাধিক প্রজাতির চাষ হচ্ছে। গাঁদা, গোলাপ, জবা, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, সূর্যমুখী, অর্কিড, শিউলি, হাসনাহেনা, কাঠগোলাপ, অপরাজিতা, দোলনচাঁপাসহ নানা রং ও ঘ্রাণের ফুলে ভরে থাকে বাগান। পাহাড়ি এলাকার মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই হওয়ায় এসব ফুল সারা বছরই ফোটে, তবে শীত মৌসুমে বাগানের সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়।

স্বপ্নবিলাস ফ্লাওয়ার ভিলেজে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সারি সারি রঙিন ফুলের বাগান, পরিকল্পিত হাঁটার পথ আর বিশ্রামের বেঞ্চ। সম্প্রতি তোলা
ছবি: প্রথম আলো

এই ফুলের গ্রাম শুধু সৌন্দর্যের স্থান নয়, স্থানীয় মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে আয়ের উৎসও। বর্তমানে এখানে ১৫ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন এবং অস্থায়ীভাবে আরও পাঁচজনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আশপাশের মানুষদের ফুল চাষ ও গাছ লাগানোর প্রতিও আগ্রহী করে তুলছে এই উদ্যোগ।

স্বপ্নবিলাস ফ্লাওয়ার ভিলেজ এখন খাগড়াছড়ির ফুল ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে নতুন পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন বিকেলে স্থানীয়দের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এখানে ভিড় করেন। অ্যাগ্রো-ইকো ট্যুরিজম ধারণাকে সামনে রেখে বাগানের এক পাশে গড়ে তোলা হয়েছে ছোট একটি কফি কর্নার ও রেস্টুরেন্ট। রয়েছে নান্দনিক ফটো বুথ, যেখানে পাহাড় আর ফুলের মাঝে স্মৃতি বন্দী করছেন দর্শনার্থীরা।

মহালছড়িতে বাড়ি হওয়ায় খাগড়াছড়ি যাতায়াতের পথে এই পরিত্যক্ত ইটভাটাটি চোখে পড়ত। ছোটবেলা থেকেই ফুলের প্রতি আলাদা একটা টান ছিল। সেই টান আর সাহস করেই ২০২৩ সালের শেষ দিকে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে ইটভাটাসহ আশপাশের দুই একর খালি জায়গা ইজারা নিই।
খালেদ মাসুদ সাগর, উদ্যোক্তা, স্বপ্নবিলাস ফ্লাওয়ার ভিলেজ

কফি কর্নার চালুর পেছনের কারণ জানিয়ে খালেদ মাসুদ সাগর বলেন, ‘অনেকে বাইরে থেকে খাবার নিয়ে এসে বাগানের পরিবেশ নষ্ট করতেন। আশপাশে খাবারের দোকানও ছিল না। তা ছাড়া বাগানে সব সময় পাহারা দেওয়ার প্রয়োজন হয়। এসব বিষয় বিবেচনা করেই কফি কর্নার চালু করি।’ তিনি জানান, ফুল ছেঁড়া বা বাগানের ক্ষতি করলে জরিমানার বিষয়টি প্রবেশপথেই জানিয়ে দেওয়া হয়।

রাঙামাটির নানিয়ারচর থেকে আসা দর্শনার্থী অরুণ চাকমা বলেন, এক জায়গায় এত ধরনের ফুল দেখার সুযোগ পার্বত্য তিন জেলার আর কোথাও নেই। শিশুদের জন্য এটি যেমন আনন্দের, তেমনি শিক্ষণীয়।

মহালছড়ির সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক পিপুল রাখাইন বলেন, ‘এই উপজেলায় বিনোদনের সুযোগ কম। স্বপ্নবিলাস ফ্লাওয়ার ভিলেজ আমাদের মানসিক প্রশান্তির জায়গা হয়ে উঠেছে। সময় পেলেই পরিবার নিয়ে এখানে আসি অথবা দূর থেকে কোনো অতিথি এলেও স্বপ্নবিলাসে ফুল দেখাতে নিয়ে আসি।’

খাগড়াছড়ি শহরের বাসিন্দা মো. সবুজ বলেন, দাম কম হওয়ায় নিয়মিত এখান থেকে ফুলের চারা কিনে নেন তিনি। পাহাড়ে ফুল চাষের সম্ভাবনাকে এই বাগান নতুনভাবে তুলে ধরেছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হচ্ছেন খালেদ মাসুদ সাগর। তিনি জানান, ফুলের মৌসুমে সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় হয়। অন্য সময় আয় কিছুটা কম হলেও বাগানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী। ফুল চাষের পাশাপাশি তিনি মাছ চাষও করছেন এখন।