গাছে ডাব পাচ্ছেন না, শাপলা বেচে দিন চলছে নিতাইয়ের
৯ বছর ধরে ডাবের ব্যবসা করেন নিতাই হালদার। গ্রাম থেকে ডাব কিনে পাইকারদের কাছে বিক্রি করতেন। আয়–রোজগারও তাতে মন্দ ছিল না। দিনে কম করে এক হাজার টাকা, কখনো বা দুই হাজার টাকা পকেটে ঢুকত তাঁর। ছোটবেলা থেকেই অভাবের সঙ্গে সংগ্রাম করা নিতাইয়ের অবস্থারও পরিবর্তন ঘটায় ডাবের ব্যবসা। ব্যবসার টাকা দিয়ে গরু কিনেছেন, মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন, ছেলেকে পড়াচ্ছেন কলেজে। তবে কিছুদিন ধরে নিতাইয়ের সুখের গল্পে যেন ছেদ পড়েছে। এলাকার গাছে ডাব নেই। ব্যবসাটা তাই মাস দুয়েক ধরে বন্ধ। জীবিকার চাকা সচল রাখতে নিতাই এখন গ্রামের বিল থেকে শাপলা-কলমি তুলে শহরে এনে বিক্রি করছেন।
আজ বুধবার সকালে খুলনা শহরের সাউথ সেন্ট্রাল রোডের চৌরাস্তা মোড়ে ভ্যানে করে শাপলা বিক্রি করছিলেন নিতাই হালদার। ভোরে রাস্তায় হাঁটা শেষে ঘরে ফেরা লোকজন তাঁর কাছ থেকে শাপলা আর কলমি শাক কিনছিলেন। বেচাবিক্রির ফাঁকে কথায় কথায় তিনি বলেন, ‘গাছে ডাব নেই বলে তো আর পেট থেমে নেই! ডাবের ব্যবসা ভালো চলত। এখন মোটামুটি খাইয়েদাইয়ে আছি।’
পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার দীর্ঘা গ্রামে নিতাইদের বাড়ি ছিল। বয়সের হিসাব তাঁর জানা নেই। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী হিসেবে মায়ের কোলে চড়ে ভারতে গিয়েছিলেন, এটুকু মায়ের কাছে শুনেছেন। খুব ছোটবেলায়ই বাবা মারা যান। মাকে নিয়ে তাঁর ছোটবেলাটা কেটেছে অভাবে। নিতাইয়ের বয়স যখন ২০ বছর, তখন বিয়ে করে চলে আসেন তেরখাদা উপজেলার অজগড়া গ্রামে। শ্বশুরবাড়ির দিকের এক আত্মীয়ের বাড়িতে ঘর তুলে থাকেন।
নিতাই বলেন, তেরখাদা আসার কিছুদিন পর গাছে চড়ে ডাব ও সুপারি পাড়াকে পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। প্রায় ২০ বছর ওই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। এরপর ডাবের ব্যবসা শুরু করেন।
নিতাই বলেন, ‘ডাবের ব্যবসায় খুব ভালো ছিলাম। প্রতি ডাবে ১০ থেকে ১৫ টাকা লাভ হতো। এখন ডাব নেই এলাকায়। আগে কখনো এ রকম হয়নি। আমি সব সময় শীতকালেও ডাব বিক্রি করি। এই প্রথম এই রকম হলো। কোনো গাছেই ডাব নেই।’ ডাব কি শুধু ওই গ্রামেই নেই?—এমন প্রশ্নের উত্তরে নিতাই বলেন, ‘আমি ফকিরহাট, ফলতিতা, সাচিয়াদহসহ তেরখাদার কোনো গ্রামই বাদ দিই না। সব জায়গায় ঘুরি। ডাব মিলছে না। দুয়েকটা গাছে খুবই কম পরিমাণ ডাব আছে। তাঁরা আবার বিক্রি করতে চান না, চাইলেও মাত্রাতিরিক্ত দাম হাঁকান।’
ডাব না থাকায় এলাকার বাঁশোখালি বিল থেকে শাপলা, কলমি তুলে বিক্রি শুরু করেছেন নিতাই। বিলের শাপলাও কমে গেছে। বড় হওয়ার আগেই মানুষ তা তুলে ফেলছে মন্তব্য করে নিতাই বলেন, ‘শাপলা-কলমি বিক্রি করে দিনে ৮০০-৯০০ টাকা হয়। এক দিন পরপর আসতে হয়। ধরেন, আজ বিক্রি শেষে বাড়ি যাব। এরপর রাত সাড়ে তিনটা-চারটার দিকে বিলে যাব। ওই রাতে না গেলে অন্য মানুষ সব তুলে নিয়ে যাবে। শাপলা তুলে ফিরতে প্রায় দুপুর হয়ে যাবে। ফিরে গুছিয়ে আঁটি বাঁধতে হয়। পরের দিন ফজরের আজানের আগে এগুলো নিয়ে জেলখানা ফেরিঘাটে এসে পারের অপেক্ষায় থাকি।’
সবকিছুর দাম বাড়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে জানিয়ে নিতাই বলেন, ‘খরচ বেড়েছে। আগে ফেরি পারে ভরা ভ্যান ২০ টাকা লাগত। এখন ৪০ টাকা নিচ্ছে। মাঝেমধ্যে ফেরি না থাকলে ট্রলারে ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয়। তখন আবার লাগে ৬০ টাকা। কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমাদেরও কায়দা করে চলতে হচ্ছে। শাকের আঁটি আগের চেয়ে ছোট হয়ে গেছে, চাপায়ে দিচ্ছি।’ কিছু করার নেই বলেই হেসে দেন তিনি।
নিতাইয়ের ইচ্ছা, নিজের জায়গায় একটা বাড়ি করার। ভেতরে ভেতরে ইচ্ছাটাকে বড় করছেন। তবে সে ইচ্ছা পূরণ হবে কি না জানেন না তিনি।