কখনো চা-বাগান, কখনো এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম, আবার কখনো হাট-বাজারে সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা নিজের স্কুটিতে চড়ে গণসংযোগ করছেন। প্রচারপত্র বিলি, পথসভা—সব মিলিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মৌলভীবাজার জেলার একমাত্র নারী প্রার্থী সাদিয়া নোশিন তাসনিম চৌধুরী।
মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া উপজেলা) আসনে বাসদ (মার্ক্সবাদী) মনোনীত ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট-সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে সাদিয়া নোশিন কাঁচি প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁর বাড়ি কুলাউড়া উপজেলার লস্করপুর এলাকায়। সিলেটের মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ থেকে ২০১৭ সালে গণিত বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি।
গত শুক্রবার বিকেলে সাদিয়া নোশিন কুলাউড়া উপজেলার জয়চণ্ডী ইউনিয়নের পুষাইনগর এবং কাদিপুর ইউনিয়নের চুনঘর এলাকায় গণসংযোগ ও প্রচারপত্র বিলি করেন। সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাজার এলাকায় এক পথসভায় বক্তব্য দেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। কর্মসূচি চলাকালে নির্বাচনী ব্যয় মেটাতে কাগজের বাক্সে করে গণচাঁদাও সংগ্রহ করা হয়।
প্রচারণায় বেরোনোর আগে প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে সাদিয়া নোশিন বলেন, এমসি কলেজে পড়াশোনার সময় তিনি ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন। বাসদের ছাত্রসংগঠন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের কলেজ শাখার আহ্বায়ক এবং পরে সিলেট নগর শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পড়াশোনা শেষে ছাত্ররাজনীতি ছেড়ে মূল সংগঠনে যুক্ত হন। বর্তমানে তিনি বাসদের কেন্দ্রীয় নারী সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক।
নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সাদিয়া নোশিন বলেন, ‘বাসদ (মার্ক্সবাদী) আগে নিবন্ধিত দল ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিবন্ধন পাওয়ায় এবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। সংগঠন আমাকে প্রার্থী করেছে। তবে নির্বাচনে অংশ নেওয়াই আমাদের প্রধান লক্ষ্য নয়। নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের নীতি-আদর্শ ও ইশতেহার জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য।’
প্রচারের বিষয়ে এই প্রার্থী বলেন, ‘এ পর্যন্ত ১০-১২টি চা-বাগানে গিয়েছি। বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রচারপত্র বিতরণ করেছি। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে প্রতিদিন কথা হচ্ছে। অনেকেই বলেন, মেয়ে হয়ে সাহস করে দাঁড়ানোই বড় কথা। এসব কথায় শক্তি ও সাহস পাই।’
প্রচারণায় গিয়ে নানা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়ার কথাও জানান সাদিয়া নোশিন। তিনি বলেন, ‘অনেকে নির্বাচনকে টাকার ব্যাপার মনে করেন। কেউ কেউ সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত কাজে আর্থিক সহায়তা চান। তাঁদের বুঝিয়ে বলি, আমরা গণচাঁদা ও সংগঠনের কর্মী, আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় নির্বাচনী তহবিল চালাচ্ছি। কেউ বোঝেন, কেউ বোঝেন না। এসব পরিস্থিতি বিব্রতকর। অথচ নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের টাকা বিলির দৃশ্য নতুন কিছু নয়। এই অবস্থা বদল না হলে নির্বাচন অর্থবহ হবে না।’
এলাকার বিভিন্ন সমস্যার কথাও তুলে ধরে সাদিয়া নোশিন বলেন, ‘চা-শ্রমিক, খাসিয়া ও গারো জনগোষ্ঠী দেশের নাগরিক হয়েও ভূমির মালিকানার অধিকার থেকে বঞ্চিত। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভবন থাকলেও চিকিৎসক ও পরীক্ষার যন্ত্রপাতির সংকট দীর্ঘদিনের। মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না। অনেক জায়গায় রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ। রেলযোগাযোগেও অব্যবস্থাপনা রয়েছে। কয়েকটি রেলস্টেশন ও লোকাল ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। তাঁদের পেছনে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। চা-শ্রমিকদের ভূমির অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ও নারীর উন্নয়ন—এ দাবিগুলো নিয়েই আমরা লড়ছি। জয়-পরাজয় বড় বিষয় নয়।’
উপজেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারের চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে সাদিয়া নোশিনই একমাত্র নারী প্রার্থী। মৌলভীবাজার-২ আসনে তিনি ছাড়াও আরও সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁরা হলেন বিএনপির শওকতুল ইসলাম (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মো. সায়েদ আলী (দাঁড়িপাল্লা), স্বতন্ত্র প্রার্থী নওয়াব আলী আব্বাস খান (ফুটবল), ফজলুল হক খান (কাপ-পিরিচ), জাতীয় পার্টির আবদুল মালিক (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবদুল কুদ্দুস (হাতপাখা) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী এম জিমিউর রহমান চৌধুরী (ঘোড়া)।