কারা পাখির জন্য জুমখেতে ফসল ফলাচ্ছেন, কী কী ফলছে সেখানে

পাখিদের জন্য জুমচাষ করা হয়েছে। সেই জুমে ফসল আসতে শুরু করায় ভালো ফলন ও পাখি–বন্যপ্রাণীর মঙ্গল কামনায় আবংমাহ (লক্ষ্মী) পূজার আয়োজন করা হয়েছেছবি: গ্রিন মিলিউ ইয়ুথ অর্গানাইজেশন।

জুমখেতের ধান, ভুট্টা, মারফা, চিনার (জুমের বাঙ্গি), তিল-তিসি, মরিচসহ নানা ফসল ফলেছে। বাতাসে দুলছে ধান আর কাউনের শিষ। তবে সেসব ফসল কাটার কোনো তাড়া নেই। পরিশ্রম করে এসব ফসল ফলানো হলেও, তা মানুষের জন্য নয়। কেবল পাখির জন্য। পাখির পাশাপাশি বন্য প্রাণীও খাবে সেই ফসল।

গ্রিন মিলিউ ইয়ুথ অর্গানাইজেশন নামে একটি সংগঠনের সদস্য একদল তরুণ-তরুণী এই জুমচাষ করেছেন। বনের ঝোপঝাড় কেটে পরিষ্কার করা, ধান ও ফসলের বীজ বপন ও আগাছা দমন—সবকিছু তাঁরা নিজেরাই করেন। কারও আর্থিক অনুদান নেন না। তাঁদের এই জুমখেতের নাম পাখির জুম। এ বছরই প্রথমবারের মতো এমন উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁরা।

বান্দরবান জেলা শহরের নীলাচল পর্যটনকেন্দ্র–সংলগ্ন টাইগারপাড়া এলাকায় ‘পাখির জুমের’ অবস্থান। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এলাকাটি। চারদিক সুনসান। জুমের আশপাশে ফলদ-বনজ বাগান, বনের ঝোপঝাড় রয়েছে। হরেক রকমের পাখপাখালির আনাগোনা রয়েছে। শিষ বের হওয়া ধানের খেত কয়েক দিনের মধ্যে সোনালি রঙের হয়ে উঠবে। ভুট্টাগাছে ফুল এসেছে। পাখির খাবার হবে ধান, ভুট্টা। বরবটি, শিম, ঢ্যাঁড়স খাবে কাঠবিড়ালি, ইঁদুর। মারফা, চিনার, আলু প্রভৃতি ফসল বনের স্তন্যপায়ী প্রাণী খাবে।

পাহাড়ি ৬০ শতক জমিতে গড়ে উঠেছে এই পাখির জুম। এখন সেই খেতে ফলন আসতে শুরু করেছে। ধানগাছে শিষ বের হয়েছে, কাউনের‍ ছড়া এসেছে, অন্যান্য ফসলও ফলন দিতে শুরু করেছে। তাই জুমের ভালো ফলন ও বরকত কামনায় গত বুধবার মারমাদের ঐতিহ্য অনুসরণে ‘আবংমাহ (লক্ষ্মী) পূজা’ করেছেন স্বেচ্ছাসেবী তরুণ–তরুণীরা। তরুণ-তরুণীরা একজন পুরোহিত নিয়ে জুমের মাঝখানে বাঁশের খুঁটির ওপর মাচাংয়ের বেদি তৈরি করে পূজার আয়োজন করেছেন। বেদিতে ফল-ফুল, মুড়িমুড়কি, মিষ্টান্ন সাজিয়ে পুরোহিতের মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে ভালো ফলন, পাখি ও বন্য প্রাণীর মঙ্গল কামনা করা হয়।

আবংমাহ পূজার পুরোহিত মংচিং মারমা জানিয়েছেন, ধনের দেবীকে মারমারা বলেন আবংমাহ। মারমাদের বিশ্বাস, তাঁর পূজা করলে জুমের ফসলের ফলন ভালো ও বরকত হয়। এটি শুধু বিশ্বাস নয়, প্রকৃতিঘনিষ্ঠ জীবনব্যবস্থার একটি অংশ। পাহাড়ের মানুষ গাছ, পাথর ও নদীর পূজা করে। কারণ, এগুলো জীবনের অংশ।

বান্দরবান জেলা শহরের নীলাচল পর্যটনকেন্দ্র সংলগ্ন টাইগারপাড়া এলাকায় ‘পাখির জুমের’ অবস্থান
ছবি: প্রথম আলো

বান্দরবান জেলা শহরের নীলাচল পর্যটনকেন্দ্র–সংলগ্ন টাইগারপাড়া এলাকায় ‘পাখির জুমের’ অবস্থান। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এলাকাটি। চারদিক সুনসান। জুমের আশপাশে ফলদ-বনজ বাগান, বনের ঝোপঝাড় রয়েছে। হরেক রকমের পাখপাখালির আনাগোনা রয়েছে। শিষ বের হওয়া ধানের খেত কয়েক দিনের মধ্যে সোনালি রঙের হয়ে উঠবে। ভুট্টাগাছে ফুল এসেছে। পাখির খাবার হবে ধান, ভুট্টা। বরবটি, শিম, ঢ্যাঁড়স খাবে কাঠবিড়ালি, ইঁদুর। মারফা, চিনার, আলু প্রভৃতি ফসল বনের স্তন্যপায়ী প্রাণী খাবে। জুমে প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে পাখি এসে ভিড় করে বলে জানালেন গ্রিন মিলিউ তরুণ-তরুণীরা।

গ্রিন মিলিউ ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের সাধারণ সম্পাদক পুসাইনু মারমা জানালেন, তাঁরা বাইয়োডাইভারসিটি কনজারভেশন নামে এক কর্মসূচি হাতে নেওয়ার মাধ্যমে প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ-প্রতিবেশ নিয়ে জনসচেতনতামূলক কাজ করেন। তারই অংশ হিসেবে পাখির জুম নামে পাখি ও বন্য প্রাণীর জন্য জুমচাষ করছেন। জুমের ফসল শুধু পাখিরা নয়, একেক প্রজাতির বন্য প্রাণী একেক ধরনের ফসল খাবে। উৎপাদিত কোনো ফসল আহরণ করা হবে না; অর্থাৎ উৎপাদিত সবকিছুর মালিক পাখি ও বন্য প্রাণী এবং সবকিছু খাবেও তারা।

চসিংপ্রু মারমা ওরফে চোপ্রু পাখির জুমের একজন সমন্বয়কারী। জানালেন, প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে, এর সঙ্গে পাখি ও বন্য প্রাণীর খাবারে সংকট প্রকট হচ্ছে। এর ফলে বন্য প্রাণীরা খাবারের সংকটে হয় অন্যত্র চলে যাচ্ছে, নয়তো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। জেলা ও উপজেলা শহরের আশপাশে এই সংকট আরও বেশি। এ জন্য প্রাণীদের খাবারের সংকটে সহমর্মী হয়ে সহযোগী হওয়ার জন্য পাখির জুম করা হয়েছে।